সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন নির্ধারণ শুরু, যেসব তথ্য লাগবে
নতুন বেতনকাঠামো অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণের (পে ফিক্সেশন) কাজ শুরু হচ্ছে আগামীকাল সোমবার। নতুন মূল বেতন নির্ধারণের পর প্রায় তিন মাসের বকেয়া বা এরিয়ার একসঙ্গে পাবেন সরকারি চাকরিজীবীরা। তবে কে কত টাকা বকেয়া পাবেন, তা নির্ভর করবে নতুন বেতন নির্ধারণের ওপর।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ জানিয়েছে, আগামী ২০ অক্টোবরের মধ্যে সরকারি চাকরিজীবীদের পে ফিক্সেশনের কাজ শেষ করতে হবে। অর্থ বিভাগ সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
নতুন বেতন নির্ধারণ করা হবে সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনার অনলাইন প্ল্যাটফর্ম আইবাস প্লাস প্লাসের পে ফিক্সেশন মডিউলে। সংশ্লিষ্ট চাকরিজীবীদের ওই পোর্টালে প্রবেশ করে নিজেদের চাকরি ও বেতনসংক্রান্ত তথ্য দিতে হবে।
প্রথম ধাপে জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) তথ্য, জন্মতারিখ, বর্তমান পদ ও গ্রেড, চাকরিতে যোগদানের তারিখ এবং বর্তমান মূল বেতনসহ পরিচয় ও চাকরিসংক্রান্ত তথ্য দিতে হবে। পাশাপাশি আগের বেতন নির্ধারণের তথ্যও যাচাই করে নিতে হবে।
নতুন কাঠামোয় একজন চাকরিজীবীর মূল বেতন কত হবে, সেটিই পে ফিক্সেশনের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে। এরপর নতুন ও আগের মূল বেতনের পার্থক্য এবং বেতন কার্যকর হওয়ার তারিখ বিবেচনায় নিয়ে বকেয়া অর্থের হিসাব করা হবে।
অর্থ বিভাগের সূত্র বলছে, পে ফিক্সেশন শেষ হওয়ার পর সরকারি চাকরিজীবীদের প্রায় তিন মাসের বকেয়া বেতন একসঙ্গে পরিশোধ করা হবে। তবে সবার বকেয়ার পরিমাণ এক হবে না। সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর গ্রেড, বর্তমান মূল বেতন, নতুন কাঠামোয় নির্ধারিত বেতন এবং নতুন বেতন কার্যকরের তারিখের ওপর বকেয়ার পরিমাণ নির্ভর করবে।
পে ফিক্সেশনের সময় কারও পদোন্নতি, বদলি, টাইম স্কেল, সিলেকশন গ্রেড কিংবা উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার তথ্য থাকলে সেগুলোও দিতে হবে। এসব তথ্যের সমর্থনে থাকা অফিস আদেশ ও প্রয়োজনীয় নথি আগে থেকেই প্রস্তুত রাখতে বলা হয়েছে।
বিশেষ করে নাম, এনআইডি, জন্মতারিখ, পদবি, গ্রেড ও বেতনসংক্রান্ত তথ্য ভালোভাবে যাচাই করতে হবে। তথ্য ভুল বা অসম্পূর্ণ থাকলে বেতন নির্ধারণে জটিলতা তৈরি হতে পারে। আইবাস প্লাস প্লাসে নিবন্ধিত মুঠোফোন নম্বরও প্রয়োজন হবে।
কোনো চাকরিজীবীর এনআইডি না থাকলে চাকরির নথিতে থাকা জন্মতারিখসহ প্রয়োজনীয় তথ্য হালনাগাদ করে আবেদন করতে হবে।
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য ১১ বছর পর গত ১৯ সেপ্টেম্বর নতুন জাতীয় বেতনকাঠামো বাস্তবায়নে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এতে সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
নতুন কাঠামোর বেতন-ভাতা ২০২৬–২৭ ও ২০২৭–২৮ অর্থবছরে ধাপে ধাপে কার্যকর হবে। ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রথম ধাপ, ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত দ্বিতীয় ধাপ এবং ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত তৃতীয় ধাপে মূল বেতন কার্যকর হবে। আর নতুন কাঠামোর ভাতা কার্যকর হবে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে একজন চাকরিজীবীর যে মূল বেতন ছিল, সেটির ভিত্তিতে নতুন কাঠামোয় বেতন নির্ধারণ করা হবে।
নতুন ও পুরোনো মূল বেতনের পার্থক্যের ৪০ শতাংশ চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেওয়া হবে। এরপর ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত দেওয়া হবে ওই পার্থক্যের ৭০ শতাংশ। ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে পুরো নতুন মূল বেতন কার্যকর হবে। অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরে দুই দফায় মূল বেতনের ৭০ শতাংশ দেওয়ার জন্য ৩৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
চাকরিজীবীরা আইবাস প্লাস প্লাসে তথ্য দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ কার্যালয় তা যাচাই করবে। অনলাইনে দেওয়া তথ্যের সঙ্গে জমা দেওয়া নথির কোনো অসংগতি পাওয়া গেলে তা সংশোধন করতে হতে পারে। অর্থাৎ, শুধু অনলাইনে তথ্য পূরণ করলেই পে ফিক্সেশনের কাজ শেষ হবে না। আগের চাকরির ইতিহাস, পদোন্নতি ও বেতন নির্ধারণের তথ্যের সঙ্গে নতুন তথ্যের সামঞ্জস্য থাকতে হবে।
অনলাইনে তথ্য দিতে কোনো সমস্যা হলে সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার কাছ থেকে সহায়তা নেওয়ার সুযোগ থাকবে। পে ফিক্সেশন চূড়ান্ত হওয়ার পর নতুন মূল বেতনের ভিত্তিতে বেতন বিল তৈরি করা হবে। একই সঙ্গে চাকরিজীবীর বকেয়া পাওনার হিসাবও চূড়ান্ত করা হবে।
পে ফিক্সেশনের কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনলাইন প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
অর্থ বিভাগের ‘সেবা দেওয়া সক্ষম করতে সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা শক্তিশালীকরণ কর্মসূচি’ (এসপিএফএমএস) এর আওতায় আইবাস প্লাস প্লাস এই প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। এতে প্রধান হিসাব ও অর্থ কর্মকর্তা (সিএএফও), বিভাগীয় হিসাব নিয়ন্ত্রক (ডিসিএ), জেলা হিসাব ও অর্থ কর্মকর্তা (ডিএএফও) এবং উপজেলা হিসাব কর্মকর্তা (ইউএও) কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অংশ নিচ্ছেন।
নতুন বেতন আদেশ অনুযায়ী, কোনো স্থায়ী কর্মচারী পদোন্নতি ছাড়াই একই পদে আট বছর পূর্ণ করলে এবং চাকরি সন্তোষজনক হলে পরবর্তী উচ্চতর গ্রেড পাবেন। প্রথম উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার পর একই পদে আরও ছয় বছর চাকরি করলে দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তবে আগের বেতনকাঠামোয় টাইম স্কেল, সিলেকশন গ্রেড কিংবা উচ্চতর গ্রেড পাওয়া কর্মচারীদের ক্ষেত্রে নতুন কাঠামোয় বেতন নির্ধারণে কিছু জটিলতা দেখা দিয়েছে। অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এসব বিষয় সমাধানের কাজ চলছে।
অর্থ বিভাগের আদেশ অনুযায়ী, আগের বেতনকাঠামোয় একই পদে দুই বা ততোধিক সিলেকশন গ্রেড, টাইম স্কেল বা উচ্চতর গ্রেড পেয়ে থাকলে নতুন কাঠামোয় ওই পদে আর উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ থাকবে না।
তবে ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত একই পদে একটিমাত্র উচ্চতর স্কেল বা গ্রেড পাওয়া থাকলে পরবর্তী ছয় বছর পূর্ণ হওয়ার পর দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
অর্থ বিভাগের সূত্রগুলো বলছে, ৫ থেকে ২০ অক্টোবরের মধ্যে পে ফিক্সেশনের সময় শুধু বর্তমান বেতন নয়, আগের পদোন্নতি, উচ্চতর গ্রেড এবং বেতন নির্ধারণের ইতিহাসও যথাযথভাবে যাচাই করতে হবে। এসব তথ্য সঠিক থাকলেই নতুন মূল বেতন ও বকেয়া পাওনার হিসাব নির্ভুলভাবে করা সম্ভব হবে।
