শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৪:১৩ অপরাহ্ণ

যুক্তরাষ্ট্র থেকে স্বর্ণ কেন সরাচ্ছে ইউরোপের দেশগুলো?

উত্তর আমেরিকা থেকে নিজেদের কয়েক টন স্বর্ণ সরিয়ে নিয়েছে নেদারল্যান্ডস। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। তারা বলেছে, এই স্থানন্তরের ফলে ঝুঁকি কমবে। পাশাপাশি কোনো সংকট দেখা দিলে স্বর্ণ দ্রুত কাজে লাগানোও সহজ হবে।

যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় সংরক্ষিত প্রায় ৩১৩ টন স্বর্ণের মধ্যে ৮৬ টন ‘ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে’ লন্ডনে স্থানান্তর করা হয়েছে জানিয়েছে নেদারল্যান্ডনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এরপর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে- ডাচরা কেন এমন করছে? তারা কি সামনে কোনো বড় অর্থনৈতিক ধাক্কার আশঙ্কা করছে?

চলতি বছরের শুরুতে ফ্রান্স ঘোষণা দেয় যে, তারা যুক্তরাষ্ট্র থেকে তাদের স্বর্ণের রিজার্ভ দেশে ফিরিয়ে এনেছে।

এদিকে, জার্মানির বুন্ডেসব্যাংক ২০১৬ সালের মধ্যে বিদেশি সংরক্ষণাগার থেকে ২১৬ টনের বেশি স্বর্ণ স্থানান্তর করে, এর মধ্যে ১১১ টন নিউ ইয়র্ক থেকে এবং ১০৫ টন প্যারিস থেকে আনা হয়। বিশ্বব্যাপী অস্থিরতার সময়ে এর আগেও এমন কৌশল দেখা গেছে।

“শীতল যুদ্ধের সময় কিছু ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের স্বর্ণের একটি অংশ নিউ ইয়র্কে স্থানান্তর করেছিল,” বলছিলেন ।

গোল্ডম্যান স্যাকস-এর গবেষণা বিশ্লেষক লিনা থমাস ও ডান স্ট্রুইভেন বলেন, এই স্থানান্তরের ফলে তারা “গুরুতর সংকটের জন্য আরও ভালোভাবে প্রস্তুত” থাকবে।

ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ বাজার কৌশলবিদ জোসেফ কাভাতোনি বিবিসিকে বলেন, “যুদ্ধ এবং বাণিজ্যগত উত্তেজনা এই সিদ্ধান্তগুলোর কিছু ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলেছে।” মুদ্রাস্ফীতি, সুদের হার এবং দ্রুত লেনদেন করা যায় এমন স্থানে স্বর্ণ রাখা, এসব বিষয়ও ভূমিকা রেখেছে।”

কাভাতোনি বলেন, “আমি মনে করি না যে কোনো আসন্ন বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে। তবে আমি মনে করি, মানুষ এখন তাদের রিজার্ভ সম্পদ কীভাবে পরিচালনা করতে হবে, কীভাবে তা বাড়াতে হবে এবং কীভাবে সেগুলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়, সে বিষয়ে আরো ভালোভাবে অবগত হচ্ছে।”

দে নেদারল্যান্ডসে ব্যাংক জানিয়েছে, এ বছরের মার্চ থেকে আগস্টের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা থেকে সরিয়ে আনা স্বর্ণ এখন ব্যাংক অফ ইংল্যান্ড-এর ভল্টে সংরক্ষিত রয়েছে।

বিশ্বের প্রধান বাণিজ্য কেন্দ্রগুলোর একটি হওয়ায় লন্ডনকে সেরা বিকল্প হিসেবে দেখা হয়েছে। কোনো সংকটের সময় যদি দ্রুত স্বর্ণ কেনাবেচা করতে হয়, তাহলে লন্ডনই সবচেয়ে উপযোগী স্থান। এ কারণেই ব্যাংক অফ ইংল্যান্ড স্বর্ণ সংরক্ষণের জন্য জনপ্রিয় একটি কেন্দ্র।

ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের শিল্পখাতভিত্তিক জরিপ অনুযায়ী, ব্যাংক অফ ইংল্যান্ড এখনো সবচেয়ে জনপ্রিয় ভল্টিং কেন্দ্র। তবে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ক্রমেই মূল্যবান এই ধাতু কোথায় সংরক্ষণ করবে, সে ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য আনছে।

গোল্ডম্যান স্যাকস-এর থমাস ও স্ট্রুইভেনের মতে, কোনো দেশের স্বর্ণ কোথায় সংরক্ষণ করা হবে, তা এখন “রিজার্ভ ব্যবস্থাপকদের ভাবনার কেন্দ্রে ক্রমশ চলে আসছে।

ডাচরা নিউ ইয়র্কে প্রায় ৫৯ টন স্বর্ণ বিক্রি করে লন্ডনে সমপরিমাণ নতুন মজুত কিনেছে। ফলে ওই পরিমাণ স্বর্ণ আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে পরিবহন করার প্রয়োজন পড়েনি। তবে ২৭ টনের বেশি স্বর্ণ যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা থেকে নেদারল্যান্ডসের জাইস্ট শহরে ‘বাহ্যিকভাবে স্থানান্তর’ করা হয়েছে। একই পরিমাণ স্বর্ণ জাইস্ট থেকে লন্ডনেও পাঠানো হয়েছে।

এ ধরনের কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে অভিযান পরিচালনা করে, সে বিষয়ে সাধারণত মুখ খোলে না। তবে, বাস্তব জীবনের ঝুঁকি এড়াতে নিরাপত্তা ও পরিকল্পনার মাত্রা যে ব্যাপক, তা বলাই যায়।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্বর্ণের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর দাম ধারাবাহিকভাবে নতুন রেকর্ড গড়েছে এবং জানুয়ারিতে প্রতি আউন্স পাঁচ হাজার ডলার অতিক্রম করেছে।

দাম বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। তবে প্রধান কারণগুলোর একটি হলো আর্থিক ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে, বিশেষ করে বাণিজ্য ও সামরিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে, স্বর্ণকে একটি তথাকথিত নিরাপদ বিনিয়োগ সম্পদ হিসেবে দেখা হয়। মুদ্রাস্ফীতি এবং সুদের হারও স্বর্ণের জনপ্রিয়তাকে প্রভাবিত করে।

স্বর্ণের সীমিত প্রাপ্যতা এবং হাজার বছরের ইতিহাসজুড়ে এর ওপর আরোপিত মূল্যের কারণে এটি মূল্যস্ফীতির প্রভাবের বিরুদ্ধে তুলনামূলকভাবে প্রতিরোধী। তাই একে ভালো বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বিনিয়োগ ব্যাংক চার্লস শোয়াব-এর মতে, গত অর্ধশতকে স্বর্ণের দাম ভোক্তা মূল্যসূচক (সিপিআই) থেকে অনেক দ্রুত বেড়েছে, যা মুদ্রাস্ফীতির সবচেয়ে বেশি পর্যবেক্ষণ করা সূচক। এ বছরের শুরুতে দেখা রেকর্ড উচ্চতা থেকে স্বর্ণের দাম কমলেও, তা এখনো ঐতিহাসিকভাবে উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।

গোল্ডম্যান স্যাকস-এর গবেষকদের মতে, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ প্রতি ট্রয় আউন্স স্বর্ণের দাম ৪ হাজার ৯০০ ডলারে (৩ হাজার ৬২৪ পাউন্ড) পৌঁছাবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যা আগস্টের দামের চেয়ে ৩০০ ডলার বেশি। থমাস ও স্ট্রুইভেনের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণের চাহিদা বৃদ্ধি দামের ঊর্ধ্বগতির অন্যতম প্রধান কারণ। সূত্র: বিবিসি।

আরো