বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১০:৫৯ অপরাহ্ণ

PPR সংস্কারে NICTF-এর সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক:

বাংলাদেশের সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতা ও দেশীয় আইসিটি খাতের অংশগ্রহণ বাড়াতে জারি করা ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬’-এ জাতীয়তাবাদী আইসিটি ফোরাম (NICTF)-এর বিভিন্ন সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে সংগঠনটি।

গত ২১ সেপ্টেম্বর ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬’ জারি করা হয়। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এটি ২০২৬ সালের ৩৭ নম্বর অধ্যাদেশ। একই দিনে সরকারি গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় অধ্যাদেশটি প্রকাশিত হয়েছে।

NICTF-এর দাবি, সরকারি ক্রয় ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ, প্রতিযোগিতামূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার লক্ষ্যে তাদের দীর্ঘদিনের গবেষণা, তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ ও নীতিগত সুপারিশের বড় একটি অংশ নতুন অধ্যাদেশে স্থান পেয়েছে।
ফোরামটির মতে, নতুন বিধানের ফলে নতুন আইসিটি প্রতিষ্ঠান, স্টার্টআপ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সরকারি ক্রয়ে অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়বে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, উচ্চ টার্নওভার বা সরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজের অভিজ্ঞতাকে সব ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক যোগ্যতা হিসেবে আরোপের সুযোগ সীমিত করা হয়েছে।

অধ্যাদেশের ধারা ২৫(২)-এ নতুন নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান বা নবীন উদ্যোক্তার অংশগ্রহণ অপ্রয়োজনীয়ভাবে সীমিত করে এমন যোগ্যতার শর্ত না রাখার বিধান করা হয়েছে। ধারা ২৫(৩)-এ দীর্ঘমেয়াদি অভিজ্ঞতা, উচ্চ বার্ষিক টার্নওভার, সরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজের অভিজ্ঞতা কিংবা একক বৃহৎ চুক্তির অভিজ্ঞতাকে বাধ্যতামূলক যোগ্যতা হিসেবে নির্ধারণের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা আনা হয়েছে। তবে প্রকল্পের জটিলতা ও ঝুঁকি বিবেচনায় বিশেষ শর্ত রাখার সুযোগ থাকছে।

নতুন ধারা ২৫ক-এ দেশীয় শিল্পের বিকাশ, স্থানীয় উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকারি ক্রয়ে বাংলাদেশে উৎপাদিত বা প্রস্তুতকৃত পণ্য ও আইসিটি সেবাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।

এ ছাড়া ধারা ২৬, ৩১ক ও ৩৬ক অনুযায়ী নতুন দরপত্রদাতা, অতি ক্ষুদ্র ও ক্ষুদ্র দরপত্রদাতা, নারী দরপত্রদাতা এবং সুযোগবঞ্চিত ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সরকার যোগ্যতার শর্ত শিথিল করতে পারবে। পূর্ববর্তী অনধিক ২০ বছরের মধ্যে বৈধ লাইসেন্স থাকা সত্ত্বেও অনুকূল পরিবেশের অভাবে সরকারি ক্রয়ে অংশ নিতে না পারা ব্যক্তিদের ‘সুযোগবঞ্চিত ব্যক্তি’ হিসেবে স্বীকৃতির বিধানও রাখা হয়েছে।
দরপত্র মূল্যায়নেও আনা হয়েছে নতুন ব্যবস্থা। ধারা ৩১(১)(ঝ) ও ৪৭ অনুযায়ী কারিগরি ও আর্থিক প্রস্তাবের আনুপাতিক মূল্যায়নে ‘সাসটেইনেবিলিটি’ বা টেকসই উপাদান যুক্ত করা হয়েছে। কারিগরি প্রস্তাবের মূল্যায়ন ও অনুমোদন শেষ না হওয়া পর্যন্ত আর্থিক প্রস্তাব নিরাপদ স্থানে সংরক্ষণ করতে হবে। পরবর্তী সময়ে আগ্রহী দরদাতাদের উপস্থিতিতে আর্থিক প্রস্তাব এবং দাপ্তরিক প্রাক্কলিত ব্যয় উন্মুক্ত করে মূল্যায়ন সম্পন্ন করার বিধান করা হয়েছে।

চুক্তি সম্পাদনের পর কৃতকার্য দরপত্রদাতা বা পরামর্শকের প্রকৃত মালিকানা এবং চুক্তিসংক্রান্ত তথ্য প্রকাশের বিধানও যুক্ত হয়েছে। ধারা ৫৩ ও ৬৩ অনুযায়ী এসব তথ্য নোটিশের মাধ্যমে প্রকাশ করতে হবে।

অন্যদিকে কোনো প্রতিষ্ঠানকে নিষিদ্ধ বা ব্ল্যাকলিস্ট করার আগে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়ার বিধান করা হয়েছে। ধারা ৬৪ অনুযায়ী, নিষিদ্ধকরণের প্রক্রিয়া শুরুর আগে অভিযোগের বিবরণ উল্লেখ করে লিখিতভাবে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে যুক্তিসঙ্গতভাবে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে।

নতুন ধারা ৬৬ক-এ বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি (BPPA)-এর প্রশিক্ষণ ও গবেষণার দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আওতায় ক্রয়কারী ও সংশ্লিষ্ট জনবলের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ, কর্মশালা ও সেমিনার আয়োজন এবং সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ার আধুনিকায়নে গবেষণা পরিচালনার কথা বলা হয়েছে।

সরকারি ক্রয়ে প্রতিযোগিতা বাড়ানো ও দেশীয় শিল্পের স্বার্থ সুরক্ষার বিষয়টি নতুন অধ্যাদেশের অন্যতম লক্ষ্য। এর আগে ২০ সেপ্টেম্বর মন্ত্রিসভা অধ্যাদেশটির খসড়ায় নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়। সরকারি সূত্রে বলা হয়, এতে সরকারি ক্রয়ে অধিক প্রতিযোগিতা সৃষ্টি, দেশীয় শিল্পের সুরক্ষা এবং ক্রয় প্রক্রিয়া আধুনিকায়নের বিভিন্ন উদ্যোগ রাখা হয়েছে।

১২ সদস্যের ওয়ার্কিং গ্রুপ
NICTF জানায়, সরকারি প্রকিউরমেন্ট ব্যবস্থায় সংস্কারের লক্ষ্যে তারা ‘PPR Reform Working Group’ গঠন করে। ১২ সদস্যের এই কমিটিতে ছিলেন রাফেল কবির, আব্দুর রাজ্জাক রুপম, মোঃ মামুন অর রশিদ, মিজানুর রহমান, মো. আনোয়ার সাদাত, ইলিয়াস মোল্লাহ, আবু সালেহ মোহাম্মদ জুবায়ের আলম, মোঃ ফারাবী, মাহতাবুর রহমান, সানাউল করিম, সজিব বড়ুয়া ও মিরন খান।
তবে নতুন অধ্যাদেশে কয়েকটি বিষয় এখনও বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে বলে জানিয়েছে NICTF। এর মধ্যে রয়েছে আইসিটি খাতের জন্য পৃথক ‘SLT (Significantly Low-priced Tender) Guideline’ প্রণয়ন, ‘ICT-STD (Standard Tender Document)’ তৈরি, স্বাধীন ‘ICT Specification Review Committee’ গঠন এবং নলেজ ট্রান্সফার ও হ্যান্ডওভার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট বিধান যুক্ত করা।
NICTF জানিয়েছে, এসব সংস্কার বাস্তবায়নে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের সঙ্গে সংলাপ ও নীতিনির্ধারণী গবেষণা অব্যাহত রাখা হবে।

ফোরামের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, “এই অর্জন আমাদের প্রযুক্তি সমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল। আইসিটি খাতের জন্য একটি স্বচ্ছ, প্রতিযোগিতামূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ক্রয় ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে আমরা আমাদের সংলাপ ও গবেষণা অব্যাহত রাখব। বিশেষ করে PPR Reform Working Group-এর সদস্যদের প্রতি আমরা গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।”

আরো