‘আগে বাঁচতে হবে, তারপর টাকা’: সাবেক প্রেসিডেন্ট
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবে পৃথিবী যে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে তা তুলে ধরতে গিয়ে মালদ্বীপের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদ বলেছেন, পৃথিবীর সবকিছুই টাকার ওপর নির্ভর করে। কিন্তু সেই টাকাকে ব্যবহার করতে হলে তো আগে আমাদের বেঁচে থাকতে হবে।
সোমবার (৫ অক্টোবর) রাজধানীর একটি হোটেলে বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন-২০২৬-এর সমাপনী দিনে দেওয়া বক্তব্যে এ কথা বলেন তিনি।
মোহাম্মদ নাশিদ বলেন, আমি সমৃদ্ধি বুঝি, আমি বাণিজ্য বুঝি, আমি ফাইন্যান্স বুঝি। আমি জানি, পৃথিবীর সবকিছুই টাকার ওপর নির্ভর করে। কিন্তু সেই টাকাকে ব্যবহার করতে হলে আগে তো আমাদের বেঁচে থাকতে হবে। আমাদের এমন একটি উন্নয়ন কৌশল দরকার, যা আপনাকে সমমানের অর্থনৈতিক ফলাফল দেবে, কিন্তু আমাদের গ্রহ বা পরিবেশের ক্ষতি অনেক কম করবে।
তিনি বলেন, আমাদের গ্রহটি যখন বদলে যাচ্ছে, তখন আমাদের উচিত নিজেদের অভ্যাসগুলো পরিবর্তন করার। কিন্তু আমি আমাদের মানুষকে দরিদ্র হয়ে থাকতে বলতে পারি না, কেবল এই জন্য যে আমরা গ্রহকে বাঁচাতে কৃচ্ছ্রসাধন করতে চাই। আমরা তা করতে পারি না। এমন কিছু দেশ রয়েছে যারা এই গ্রহের সম্পদ নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে ধনী হয়েছে—যা করা হয়েছে আমাদের বিনিময়ে।
মালদ্বীপের সাবেক প্রেসিডেন্ট বলেন, নেপালের মানুষ এমন কিছুই করেনি, যার কারণে দেশটি ভয়াবহ বন্যা ডেকে আনতে পারে। কিংবা আমরা মালদ্বীপবাসী এমন কিছুই করিনি যার জন্য সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা এই পরিমাণে বৃদ্ধি পেতে পারে। সুতরাং এর খেসারত কাউকেই না কাউকেই তো দিতে হবে। আমরা এখনও কেবল নিজেদের বেঁচে থাকার তাগিদেই এই গ্রহকে ইকোসিস্টেমের সেবা দিয়ে যাচ্ছি।
তিনি বলেন, আমরা এই গ্রহকে একটি পরিবেশগত সেবা দিচ্ছি। আর তাই আমরা আশা করতেই পারি যে, এর বিনিময়ে আমাদের মূল্য দেওয়া হবে। তবে আমরা কোনো দান-খয়রাত চাইছি না। আমরা কোনো অনুদান বা সাহায্য প্রার্থনা করছি না। আমরা কেবল একটি ন্যায্য বা সঠিক পাওনা চাইছি। কারণ আমরা এই গ্রহকে একটি পরিবেশগত সেবা দিচ্ছি।
মোহাম্মদ নাশিদ বলেন, বলেন, আপনি যদি প্রকৃতিকে রক্ষা না করেন, তবে আপনি নিজে বেঁচে থাকতে পারবেন না। এখন আমাদের সামনে প্রশ্ন হলো যখন একটি রাষ্ট্র জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তলিয়ে যায়, তখন কী ঘটে? মানুষ হয়তো বেঁচে থাকবে, ধরা যাক আমরা বেঁচে গেলাম কিন্তু দেশটি তো হারিয়ে গেল। সমুদ্র আইন অনুযায়ী, আমাদের উপকূল থেকে ১২ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত রাজনৈতিক সীমানা নির্ধারিত হয়। এখন যদি আমার উপকূলের লাইন তটরেখা তলিয়ে যায় তবে কি আমি আমার এই জায়গা বা সীমানা হারিয়ে ফেলছি?
তিনি বলেন, আমাদের ২০০০ নটিক্যাল মাইলের একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল রয়েছে এবং ৩৫০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত আমরা সম্পদ ব্যবহার করতে পারি।
এই সব হিসাব কিন্তু করা হয় উপকূলের লাইন বা তটরেখা থেকে। এখন যদি সমুদ্রের পানি বেড়ে উপকূলটি তলিয়ে যায়, তবে কী ঘটবে? আমাদের কারণে নয় বরং আপনারা যা করেছেন তার কারণে আমরা কিন্তু আমাদের দেশকে হারিয়ে ফেলতে পারি না। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আমরা যে ধরনের ভবিষ্যৎ বা পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছি, এটি তারই একটি বাস্তব রূপ।
মালদ্বীপের সাবেক প্রেসিডেন্ট বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনকে শুধুমাত্র অন্যদের সমস্যা মনে করাটা এক ধরনের ভুল বা প্রচলিত অন্ধ বিশ্বাস, যা আমি সব জায়গা থেকেই শুনে আসছি। অনেকে বলেন, মালদ্বীপ হারিয়ে যাবে। আমি বলব, মালদ্বীপ গায়েব হওয়ার আগে আপনার ভূখণ্ড বা আপনার দেশ হারিয়ে যাবে। এটি সবার সঙ্গেই ঘটছে। তাই দয়া করে জেগে উঠুন। এতটা নির্বোধ হবেন না, এতটা অজ্ঞ হবেন না। আসুন আমরা পুনর্বিবেচনা করি। সমুদ্র আইন সংক্রান্ত সংস্থাগুলোকে বলুন যেন তারা কোনো রাষ্ট্রের বা সমুদ্রের সীমানার সংজ্ঞা নতুন করে বিবেচনা করে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) তিন দিনব্যাপী এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করে।
