বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৬, ৫:০০ অপরাহ্ণ

লেক ঠিক না হলে দেশ ঠিক করব কীভাবে: গৃহায়নমন্ত্রী

গুলশান-বারিধারার মতো একটি বিশিষ্ট এলাকার লেকের পানি যদি আমরা ঠিক করতে না পারি, তাহলে সারা বাংলাদেশ কীভাবে ঠিক করব বলে মন্তব্য করেছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের।

তিনি বলেন, দুঃখজনক হলেও সত্য, শুধু গুলশান, বনানী, বারিধারা লেক এবং হাতিরঝিল নিয়ে প্রধানমন্ত্রী আমাদের সঙ্গে প্রায় ছয়বার বৈঠক করেছেন।

গণপূর্ত মন্ত্রী বলেন, কীভাবে এসব এলাকার পরিবেশ ঠিক করা যায়, তা নিয়ে কাজ হচ্ছে। গুলশান-বনানী-বারিধারা এলাকায় প্রায় ৪ হাজার ৩০০টি বাড়িঘর আছে। এর মধ্যে বোধহয় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ ভবনে নিয়ম অনুযায়ী সেপটিক ট্যাংক বা সুয়েজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (এসটিপি) থাকার কথা থাকলেও তা করা হয়নি।

বুধবার (৭ অক্টোবর) রাজধানীর শেরাটন হোটেলের গ্র্যান্ড বলরুমে বণিক বার্তা আয়োজিত ‘স্মার্ট আবাসন, টেকসই নগরায়ণ ও ভবিষ্যতের বাংলাদেশ’ শীর্ষক স্মার্ট সিটি কনক্লেভে এ কথা বলেন তিনি।

জাকারিয়া তাহের বলেন, রাজধানীতে নামিদামি ডেভেলপাররা ভবন করেছেন, কিন্তু এসটিপি করে যাননি। ফলে স্যুয়ারেজের পানি স্টর্ম ওয়াটারের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। আমরা সবাইকে সচেতন করার চেষ্টা করছি। এ বিষয়ে গুলশান, বনানী ও বারিধারা সোসাইটির সঙ্গে তিন-চারবার বৈঠক হয়েছে। আমাদের চেয়ারম্যান, প্রতিমন্ত্রী, স্থানীয় সরকার বিভাগের সংশ্লিষ্টরা এবং ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালকও এসব বৈঠকে ছিলেন। আমি নিজেও সচেতনতা তৈরির জন্য কাজ করেছি। এটি আমাদের সবার দায়িত্ব। শুধু গুলশান-বারিধারার মতো একটি বিশিষ্ট এলাকার লেকের পানি যদি আমরা ঠিক করতে না পারি, তাহলে সারা বাংলাদেশ কীভাবে ঠিক করব?

তিনি বলেন, প্রথমবারের মতো আমরা প্রায় ১০ বছর মেয়াদি একটি পরিকল্পনা নিয়েছি। প্রথমে দেশের মেট্রোপলিটন সিটিগুলো নিয়ে কাজ করছি। পরে বড় শহরগুলো এবং পর্যায়ক্রমে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত সারাদেশকে এই পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত করে একটি প্রকৃত মাস্টারপ্ল্যান করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেখানে জোনিং করা হবে, কোথায় কী হওয়া উচিত। আমরা সুনির্দিষ্টভাবে কাজ করতে চাই। সেই কারণেই নগর উন্নয়ন অধিদপ্তরকে (ইউডিডি) শক্তিশালী করছি এবং এই বিভাগকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছি। আরেকটি বিষয় হলো পর্যাপ্ত ও সঠিক তথ্য-উপাত্ত থাকলেই পরিকল্পনা যথাযথভাবে করা সম্ভব। সর্বশেষ যে আদমশুমারি হয়েছে, সেটিও অনেকদিন আগের। আমি বিশ্বাস করি, আমাদের আরেকটি সঠিক আদমশুমারি করা উচিত, যাতে এর ভিত্তিতে আমরা পরিকল্পনা করতে পারি।

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী বলেন, এর মধ্যে আমরা বেশ কিছু কাজ হাতে নিয়েছি। যেমন বাংলাদেশ বিল্ডিং রেগুলেটরি অথরিটি (বিবিআরএ)। আগে শুধু একজন আর্কিটেক্টের মাধ্যমে একটি প্ল্যান পাস হতো। এখন আমরা চেষ্টা করছি, আর্কিটেকচার, স্ট্রাকচারাল, ইলেকট্রিক্যাল, প্লাম্বিং— সবকিছু সমন্বয় করে যেন প্ল্যান জমা দেওয়া হয়। অনুমোদনের পর যে ভবনটি তৈরি হবে, সেটির অকুপেন্সি সার্টিফিকেট পাওয়ার ক্ষেত্রেও যারা ডিজাইন করেছেন, তাদেরই সার্টিফাই করতে হবে যে ভবনটি যথাযথভাবে নির্মাণ করা হয়েছে। বাস্তবতা হলো, শুধু ঢাকা শহরের কথা বললে— রাজউকের আওতাধীন এলাকা এবং গণপূর্তের আওতাধীন ধানমন্ডির মতো এলাকাগুলোতে প্ল্যান পাস হচ্ছে। এর বাইরে পর্যাপ্ত অনুমোদন ছাড়া অনেক ভবন রয়েছে। আমরা এখন এগুলো শনাক্ত করছি।

তিনি বলেন, গত সাত মাসের মধ্যে বেশ কিছু কাজ হয়েছে। আপনারা জেনে খুশি হবেন, রাজউকের মতো আরও ছয়টি ডেভেলপমেন্ট অথরিটি আমরা করেছি। এগুলো হলো ময়মনসিংহ, সিলেট, কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ, রংপুর ও বরিশাল। এর আগে আরও চারটি ছিল। পর্যায়ক্রমে আগামী সেশনে বগুড়া নিয়েও কাজ করছি। অনেক শহরে ডেভেলপমেন্ট অথরিটি না থাকায় সিটি করপোরেশন ও ডেভেলপমেন্ট অথরিটি একইসঙ্গে পরিকল্পনা অনুমোদনসহ বিভিন্ন কাজ করছে। ফলে চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স থাকে না।

মন্ত্রী বলেন, যারা এরইমধ্যে প্ল্যান ছাড়া ভবন নির্মাণ করেছেন অথবা অনুমোদিত প্ল্যানে বিচ্যুতি ঘটিয়েছেন, তাদের জন্য একটি বিধিমালা তৈরি করা হচ্ছে। এ নিয়ে কাজ চলছে। আগামী এক মাসের মধ্যে হয়তো এটি মন্ত্রিসভায় উঠবে। এটি পাস হলে আমরা সংশ্লিষ্ট আইনকে আরও শক্তিশালী করতে পারব। এক্ষেত্রে সুপারভিশন আইনও গুরুত্বপূর্ণ।

গৃহায়ন মন্ত্রী বলেন, বর্তমান ঢাকা শহরের অবস্থা দুঃখজনক। ১৭৩টি শহরের মধ্যে আমরা ১৭১তম অবস্থানে আছি। আমাদের সর্বাত্মক চেষ্টা থাকবে পরিস্থিতির উন্নতি করার। তবে এটাও বাস্তবতা যে, আমরা অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ একটি শহরের মধ্যে আছি। সঠিক পরিকল্পনা এবং সব সেক্টরের সম্মিলিত অবদান ছাড়া এটিকে সফল করা খুবই কঠিন। বলা সহজ, কিন্তু বাস্তবায়ন কঠিন। সরকারের পক্ষ থেকে আমাদের সর্বাত্মক চেষ্টা থাকবে, যাতে আমরা আরও সুস্থ পরিবেশ, পরিবেশ রক্ষা এবং সঠিক আবাসন নীতিমালা তৈরি করতে পারি এবং জনগণকে আরও ভালো সুযোগ দিতে পারি। এ বিষয়ে আপনাদের সহযোগিতা কামনা করি।

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেন, রাজধানীর জনসংখ্যা, আবাসন, যোগাযোগ, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যবস্থাকে সমন্বিতভাবে পরিকল্পনার আওতায় না আনলে বাসযোগ্য ঢাকা তৈরি সম্ভব নয়। ঢাকায় প্রতিদিন মানুষ আসছে, কিন্তু জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ বা বস্তি উচ্ছেদ করে সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। দেশের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে হবে।

টোকিওর উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, জাপান কয়েক দশক ধরে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে, আমাদেরও পাঁচ বছরের পরিকল্পনা করে ২৫-৩০ বছর ধরে বাস্তবায়ন করার প্রবণতা থেকে বের হতে হবে।

মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেন, রাজধানীর দুরবস্থার অন্যতম কারণ আইন না মানার প্রবণতা। রাজউকের অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী ভবন নির্মাণের দায়িত্ব ভবন মালিক ও ডেভেলপারদের। রাজউক নকশা অনুমোদন করে, প্রতিটি বাড়ি কীভাবে নির্মিত হচ্ছে তা নিয়মিত পুলিশিংয়ের মতো করে নজরদারি করা সম্ভব নয়। মাত্র প্রায় ১ হাজার ২০০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং শতাধিক পরিদর্শক দিয়ে পুরো ঢাকার ভবন পর্যবেক্ষণ করা বাস্তবসম্মত নয়। তাই সবাইকে নিজ নিজ দায়িত্ব থেকে আইন মানতে হবে। একইসঙ্গে রাজধানীর পরিবহন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অন্যান্য সেবাদাতা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জরুরি।

তিনি বলেন, গ্রিন বিল্ডিংয়ে ৫ শতাংশ প্রণোদনা, অন্তর্ভুক্তিমূলক, আবাসনে অতিরিক্ত ফ্লোর স্পেস, ভবনের নকশায় সৌরবিদ্যুৎ অন্তর্ভুক্ত করা এবং এক বিঘা জমিতে বাধ্যতামূলকভাবে ১০ শতাংশ গাছ লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারি ভবনে পোড়ানো ইটের ব্যবহার কমিয়ে ব্লক ব্যবহারের দিকেও যাওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ভূমিকম্প ঝুঁকি মোকাবিলায় আর্থকোয়েক সেফটি ও গবেষণার জন্য জায়গা ও অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগ সফল করতে শুধু সরকার বা রাজউক নয়, ডেভেলপার, ভবন মালিক, প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

কনক্লেভে আরও বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. ইশতিয়াক আহমেদ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান, এবিসি রিয়েল এস্টেট লিমিটেডের এমডি শ্রাবন্তী দত্ত, স্পেসজিরো লিমিটেডের এমডি মোহাম্মদ ফয়েজ উল্লাহ, ডিবিএইচ ফাইন্যান্স পিএলসির এমডি ও সিইও নাসিমুল বাতেন, ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরি, ক্রাউন সিমেন্ট পিএলসি ও জিপিএইচ গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, নাসির সিনট্যাক্স গ্রুপের এমডি নাসিম বিশ্বাস এবং জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোসা. ফেরদৌসী বেগম।

আরো