জাতীয় জাদুঘর মিলনায়তনে বর্ণাঢ্য উদ্বোধন ২৪তম ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র পুরস্কার ও উৎসব ২০২৬
শহিদুল ইসলাম খোকন
বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তনে উৎসবমুখর, বর্ণাঢ্য ও নান্দনিক আয়োজনে উদ্বোধন হয়ে গেল ২৪তম ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র পুরস্কার ও উৎসব ২০২৬। দেশি-বিদেশি চলচ্চিত্র নির্মাতা, কূটনৈতিক প্রতিনিধি, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, গবেষক, সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে মিলনায়তনটি রূপ নেয় এক আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক মিলনমেলায়।
দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ধারাবাহিকভাবে আয়োজিত এই উৎসব বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনে যে আন্তর্জাতিক মর্যাদা, নান্দনিক উৎকর্ষ ও মানবিক দায়বদ্ধতার শক্ত ভিত্তি নির্মাণ করেছে—তারই পরিণত রূপ যেন এবারের ২৪তম আসর। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দর্শক ও অতিথিদের প্রাণবন্ত অংশগ্রহণ প্রমাণ করে, এই উৎসব এখন কেবল একটি আয়োজন নয়—এটি বাংলাদেশের স্বাধীন চলচ্চিত্র আন্দোলনের এক অবিচ্ছেদ্য সাংস্কৃতিক অধ্যায়।
চলচ্চিত্র যখন প্রতিবাদ, সংলাপ ও মানবিক ভাষা
ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র পুরস্কার ও উৎসব কেবল পুরস্কার প্রদানের আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি এক ধরনের চিন্তাশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলন, যেখানে চলচ্চিত্র হয়ে ওঠে সমাজ, রাষ্ট্র ও মানুষের মুখোমুখি দাঁড়ানোর সাহসী ভাষা। ২৪তম আসর আবারও স্পষ্ট করে দিয়েছে—বিশ্ব চলচ্চিত্র মানচিত্রে বাংলাদেশের অবস্থান ধীরে ধীরে আরও দৃঢ়, গভীর ও সম্মানজনক হয়ে উঠছে।
*পটভূমি ও উৎসবের দর্শন:* চলচ্চিত্র মানেই মানবিক দায়
২০০০ দশকের শুরুতে যাত্রা শুরু করা এই আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের মূল দর্শন হলো—
চলচ্চিত্রকে কেবল বিনোদনের পণ্য হিসেবে না দেখে, বরং মানবিক বোধ, সামাজিক দায়বদ্ধতা, প্রতিবাদী চিন্তা ও বিকল্প সাংস্কৃতিক ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
*এই উৎসবের মাধ্যমে এমন সব চলচ্চিত্রকে সামনে আনা হয়—*
যেগুলো বাণিজ্যিক মূলধারার বাইরে থেকে মানুষের জীবনসংগ্রাম, বৈষম্য, যুদ্ধ, নারীর অধিকার, পরিবেশ সংকট, অভিবাসন, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন এবং মানবিক সম্পর্কের সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলো গভীর শিল্পবোধে তুলে ধরে।
উৎসবের প্রধান উদ্দেশ্য
স্বাধীন ও বিকল্প ধারার চলচ্চিত্র নির্মাতাদের জন্য আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী ও মূল্যায়নের মঞ্চ তৈরি
মানবিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিষয়ভিত্তিক চলচ্চিত্র বিশ্বদর্শকের সামনে তুলে ধরা
নবীন ও উদীয়মান নির্মাতা ও প্রযোজকদের উৎসাহ ও স্বীকৃতি প্রদান
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতিকে শক্তভাবে উপস্থাপন
এই ধারাবাহিকতায় ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র পুরস্কার ও উৎসব আজ একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক চলচ্চিত্র প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে।
*আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণ ও বৈশ্বিক বৈচিত্র্য*
২৪তম আসরে অংশ নিচ্ছে এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন দেশের চলচ্চিত্র নির্মাতারা। এবছর উৎসবে জমা পড়েছে শতাধিক চলচ্চিত্র, যার মধ্য থেকে বাছাই করা হয়েছে—
পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনিচিত্র
স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র
প্রামাণ্যচিত্র
পরীক্ষামূলক ও আর্ট ফিল্ম
বিভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক বাস্তবতার প্রতিনিধিত্বকারী এসব চলচ্চিত্রের সম্মিলিত প্রদর্শনী উৎসবটিকে রূপ দিয়েছে এক বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক সংলাপে, যেখানে দর্শক একইসঙ্গে আফ্রিকার বাস্তবতা, লাতিন আমেরিকার সংগ্রাম, ইউরোপের নান্দনিকতা ও এশিয়ার মানবিক বোধের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
*বিচার প্রক্রিয়া ও পুরস্কার:* নান্দনিকতা ও মানবিকতার মেলবন্ধন
দেশি-বিদেশি খ্যাতনামা চলচ্চিত্র নির্মাতা, গবেষক ও সমালোচকদের সমন্বয়ে গঠিত একটি আন্তর্জাতিক জুরি বোর্ড চলচ্চিত্রগুলো মূল্যায়ন করবেন।
যে বিভাগগুলোতে পুরস্কার প্রদান করা হবে—
সেরা পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র
সেরা স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র
সেরা প্রামাণ্যচিত্র
সেরা পরিচালক
মানবিক ও সামাজিক মূল্যবোধে বিশেষ পুরস্কার
মূল্যায়নের ক্ষেত্রে কেবল কারিগরি দক্ষতাই নয়; গল্পের গভীরতা, সামাজিক প্রাসঙ্গিকতা, নান্দনিক সৌন্দর্য ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়—যা এই উৎসবকে অন্যান্য অনেক আন্তর্জাতিক উৎসব থেকে আলাদা করেছে।
*উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন—*
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান
তিনি বলেন,
*চলচ্চিত্র একটি জাতির আত্মপরিচয়, ইতিহাস ও মানবিক মূল্যবোধ বহন করে। ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব সেই আত্মপরিচয়কে আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।*
বিশেষ অতিথিদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন—
ক্রোয়েশিয়ান-যুক্তরাজ্য ভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাতা আলেকজান্দ্রা মার্কোভিচ,
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সাংবাদিক ও নির্মাতা *এডিথা কাদুয়ায়া* (ফিলিপিন),
বাংলাদেশে নিযুক্ত চীন দূতাবাসের কালচারাল কাউন্সিলর লি শিওপেং,
*অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন-*
এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান ও উৎসব কমিটির নির্বাহী সদস্য
জালাল আহমেদ
*বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের জন্য আন্তর্জাতিক জানালা*
বক্তারা একযোগে বলেন,
এই উৎসব বাংলাদেশি নির্মাতাদের জন্য একটি আন্তর্জাতিক জানালা। এখান থেকে বহু চলচ্চিত্র বিশ্বব্যাপী অন্যান্য উৎসবে অংশগ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে, বিদেশি প্রযোজক ও পরিবেশকদের নজর কাড়ছে এবং যৌথ প্রযোজনার নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।
চলচ্চিত্র বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের ধারাবাহিক আন্তর্জাতিক উদ্যোগ না থাকলে বাংলাদেশের স্বাধীন চলচ্চিত্র আন্দোলন আজকের এই অবস্থানে পৌঁছানো সম্ভব হতো না।
*সাংস্কৃতিক কূটনীতি ও সফট পাওয়ার*
ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র পুরস্কার ও উৎসব কেবল একটি সাংস্কৃতিক আয়োজন নয়; এটি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক কূটনীতি ও সফট পাওয়ারের একটি কার্যকর মাধ্যম। চলচ্চিত্রের ভাষার মাধ্যমে এই উৎসব বিশ্বদর্শকের সামনে তুলে ধরছে বাংলাদেশের সমাজ, মানুষ, ইতিহাস, সংগ্রাম ও মানবিক মূল্যবোধ।
*২৪তম ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র পুরস্কার ও উৎসব ২০২৬ আবারও প্রমাণ করেছে—*
চলচ্চিত্র শুধু বিনোদন নয়; এটি প্রতিবাদ, দর্শন, মানবিক সংলাপ ও সংস্কৃতির এক শক্তিশালী বাহন।
এই উৎসবের ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আরও দৃঢ়, মর্যাদাপূর্ণ ও প্রভাবশালী অবস্থানে পৌঁছাবে—এমনটাই প্রত্যাশা চলচ্চিত্র বিশেষজ্ঞ, নির্মাতা ও সংস্কৃতিপ্রেমীদের।