কাগজে আলু রপ্তানি, বাস্তবে শূন্য: প্রণোদনা লুটের বিস্ফোরক তথ্য
২০২১ সালের মে মাসে সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর গ্রাহক প্রতিষ্ঠান জিলানী ট্রেডের ব্যাংক হিসাবে নগদ সহায়তা হিসেবে জমা হয় ৬ লাখ ৮৮ হাজার ৫০০ টাকা। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির ৮১টি বিল অব এক্সপোর্টের বিপরীতে তিনটি ব্যাংকের মাধ্যমে অগ্রিম হিসেবে দেশে আসে ৩৬ লাখ ৫১ হাজার ৮৪৭ দশমিক ৮৯ মার্কিন ডলার। এছাড়া রপ্তানি প্রণোদনা হিসেবে নগদ ছাড় দেওয়া হয় মোট ৫ কোটি ৫৭ লাখ ৫ হাজার ৫৮২ টাকা।
তবে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, জিলানী গ্লোবাল ট্রেডসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আলু রপ্তানির নামে পরিকল্পিতভাবে কোটি কোটি টাকার জালিয়াতি করেছে। নথিপত্রে দেখা যায়, ২১১টি বিল অব এক্সপোর্ট দাখিল করা হলেও বাস্তবে কোনো পণ্যই বন্দরে প্রবেশ করেনি কিংবা জাহাজে ওঠেনি। অফ-ডক, শিপিং এজেন্ট ও বন্দর কর্তৃপক্ষের কোনো নথিতেই এসব রপ্তানির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
কাগজে আলু, বাস্তবে নেই পণ্য
পুরো প্রক্রিয়া বাহ্যিকভাবে স্বাভাবিক মনে হলেও প্রশ্ন উঠেছে— আদৌ কি কোনো আলু রপ্তানি হয়েছে? অনুসন্ধানে দেখা যায়, আলুর উৎপাদন, ক্রয়, সংরক্ষণ, প্যাকেটজাতকরণ ও জাহাজিকরণ— কোনো ধাপই বাস্তবে সম্পন্ন হয়নি। অথচ পণ্যের মূল্য দেখিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা দেশে এসেছে, যা পুরো ঘটনাকে আরও রহস্যজনক করে তুলেছে।
ব্যাংকভিত্তিক বিল অব এক্সপোর্ট
তথ্য অনুযায়ী, জিলানী গ্লোবাল ট্রেডের ৮১টি বিল অব এক্সপোর্টের মধ্যে—
উত্তরা ব্যাংক: ৫২টি
অগ্রণী ব্যাংক: ২৮টি
সিটি ব্যাংক: ১টি
অফ-ডকে পণ্যের কোনো রেকর্ড নেই
নথি পর্যালোচনায় চারটি অফ-ডক প্রতিষ্ঠানের নাম পাওয়া যায়
মেসার্স শফি মটরস লিমিটেড
ভারটেক্স অফ-ডক লজিস্টিক সার্ভিসেস লিমিটেড
কে অ্যান্ড টি লজিস্টিকস লিমিটেড
ইনকন্ট্রেড লিমিটেড
বিল অব লেডিং অনুযায়ী ২০১৯ ও ২০২০ সালে এসব ডিপোর মাধ্যমে পণ্য রপ্তানির কথা বলা হলেও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো কাস্টমসকে জানিয়েছে, তারা কোনো রপ্তানি পণ্য গ্রহণ করেনি। এমনকি ব্যাংকে দাখিল করা বিল অব এক্সপোর্টে থাকা সিল ও রেজিস্টার নম্বরের সঙ্গে ডিপোর সংরক্ষিত তথ্যের কোনো মিল পাওয়া যায়নি।
অস্তিত্বহীন শিপিং এজেন্ট
৮১টি চালানের বিপরীতে শিপিং এজেন্ট হিসেবে দেখানো হয়েছে ‘ওয়ান কার্গো লিমিটেড’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। তবে বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাফফা) ও বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশন— উভয়ই নিশ্চিত করেছে, এই নামে তাদের কোনো সদস্য নেই।
বন্দরে ওঠেনি কোনো পণ্য
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট কন্টেইনারগুলো শিপ অন বোর্ড হয়েছে— এমন কোনো প্রমাণ নেই। কাস্টমস তদন্তেও শিপমেন্ট তারিখ ও বিল অব এক্সপোর্টের তারিখের মধ্যে অসামঞ্জস্য পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, ভুয়া কন্টেইনার নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে।
সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের দাবি, কাস্টমসের অবস্থান কঠোর
সংশ্লিষ্ট সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট জাহিন এন্টারপ্রাইজের মালিক লিখিত বক্তব্যে দাবি করেছেন, একটি চক্র তাদের পাসওয়ার্ড হ্যাক করে অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করেছে।
তবে কাস্টমসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, লাইসেন্সিং রুলস অনুযায়ী সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট কোনোভাবেই দায় এড়াতে পারেন না।
রপ্তানিকারকের কার্যালয়ের অস্তিত্ব নেই
ঘোষিত ঠিকানায় সরেজমিনে গিয়ে জিলানী গ্লোবাল ট্রেডের কোনো কার্যালয়ের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। তবে ফোনে প্রতিষ্ঠানটির মালিক দাবি করেন, বৈধ কাগজপত্র জমা দিয়েই প্রণোদনা নেওয়া হয়েছে এবং রপ্তানি হয়েছে বলেই বৈদেশিক মুদ্রা দেশে এসেছে।
পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের দাবি
পুরো ঘটনায় আলুর ডিপোতে প্রবেশ থেকে শুরু করে রপ্তানি কার্যক্রম ও প্রণোদনা প্রদানের প্রতিটি ধাপ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্তের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।