মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৯:১৪ পূর্বাহ্ণ

সরল জীবনের প্রতীক ‘ভাইরাল মিজান’ এখন ভূমিদস্যুতার শিকার

ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় মানবিকতার এক সংগ্রামী মুখ

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ‘গরিবের বুফে’র উদ্যোক্তা মিজান—যাঁকে মানুষ চেনে ‘ভাইরাল মিজান’ নামে—আজ আর শুধু মানবিকতার প্রতীক নন। তিনি এখন ভূমিদস্যুতার শিকার এক নির্যাতিত নাগরিক, যিনি নিজের পৈতৃক ভিটেমাটি ফিরে পেতে বছরের পর বছর ধরে আইনের দরজায় ঘুরছেন, কিন্তু পাচ্ছেন না ন্যায়বিচার।

ঢাকার আগারগাঁও এলাকায় ফুটপাতে মাত্র ১০০ টাকায় পেটভরে খাবার খাইয়ে যিনি অসংখ্য দরিদ্র মানুষের মুখে হাসি ফোটান, সেই মিজানুর রহমান আজ নিজ জেলা চাঁদপুরে পৈতৃক বসতভিটা ও জমি উদ্ধারে চরম আইনি জটিলতায় পড়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

পৈতৃক পরিচয় ও সম্পত্তির বাস্তবতা
ভাইরাল মিজানের পৈতৃক বাড়ি চাঁদপুর জেলার পুরাণবাজার এলাকার পূর্ব শ্রীরামদী গ্রামে। তাঁর পিতা মরহুম মোঃ আলী হোসেন এবং মাতা তাসলিমা বেগম । পারিবারিক সূত্রে প্রাপ্ত বসতভিটা ও জমিজমা দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহল জোরপূর্বক দখল করে রেখেছে—এমন অভিযোগ তাঁর।

মিজানের দাবি অনুযায়ী, দখলকৃত পৈতৃক সম্পত্তির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় দেড় কোটি টাকা। এই সম্পত্তিই ছিল তাঁর পরিবারের শেষ সম্বল।
আইনের আশ্রয় নিয়েও বিচারহীনতা ন্যায্য অধিকার ফিরে পেতে মিজান প্রথমে চাঁদপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে স্মারকলিপি প্রদান করেন। পরবর্তীতে তিনি সংশ্লিষ্ট থানায় ফৌজদারি মামলা দায়ের করেন, যা বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে।

কিন্তু অভিযোগের কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও মামলার দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তিনি।
মিজান বলেন,আমি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল মানুষ। অন্যায়ের পথ কখনোই বেছে নিইনি। মামলা করেছি অনেক আগেই, কিন্তু মাসের পর মাস শুধু ‘আইনি জটিলতা’র কথা শুনছি। আজ পর্যন্ত কোনো কার্যকর বিচার পাইনি।
তিনি আরও বলেন ,আমি শুধু চাই—আইন তার স্বাভাবিক গতিতে চলুক, দ্রুত তদন্ত হোক এবং আমার ন্যায্য অধিকারের পক্ষে দ্রুত রায় দেওয়া হোক।

মানববন্ধনেও ন্যায়বিচারের আকুতি
পৈতৃক সম্পত্তি উদ্ধারে প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণের লক্ষ্যে মিজান নিজ জেলা চাঁদপুরে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন। মানববন্ধনে তাঁর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন তার স্ত্রী ও তিন কন্যাসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা। সেখানে তিনি জানান,চাঁদপুরের হাইমচর উপজেলার দক্ষিণ আলগী ইউনিয়নের গন্ডামারা এলাকায় আমাদের পৈতৃক সম্পত্তি একটি প্রভাবশালী চক্র জোর করে দখল করে রেখেছে। প্রশাসনের হস্তক্ষেপ ছাড়া আমার পক্ষে এই সম্পত্তি উদ্ধার সম্ভব নয়।

মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীরাও দ্রুত প্রশাসনিক ও আইনি পদক্ষেপের দাবি জানান।
ভাইরাল হওয়ার পেছনের মানবিক গল্প রাজধানী ঢাকার আগারগাঁও এলাকায় ফুটপাতে মাত্র ১০০ টাকায় বুফে খাবার বিক্রি করে সারা দেশে আলোচনায় আসেন মিজান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর সরল জীবনযাপন, মানবিক উদ্যোগ এবং পরিশ্রমী মানসিকতা ব্যাপক প্রশংসা কুড়ায়।
অনেকেই তাঁকে বলেছেন—
মানবিকতার জীবন্ত উদাহরণ।

কিন্তু পরিহাসের বিষয় হলো—যে মানুষটি প্রতিদিন অসহায় মানুষের ক্ষুধা মেটাতে লড়ছেন, সেই মানুষটিই আজ নিজের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে একা ও অসহায়।

বড় প্রশ্ন, যা এড়িয়ে যাওয়ার নয় একজন সামাজিকভাবে স্বীকৃত, মানবিক উদ্যোগে প্রশংসিত সাধারণ নাগরিকের পৈতৃক ভিটেমাটি যদি বছরের পর বছর প্রভাবশালীদের দখলে থাকে, তবে সাধারণ মানুষের সম্পত্তির নিরাপত্তা কোথায়?

আইনের আশ্রয় নিয়েও যদি বিচার পেতে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়, তবে ন্যায়বিচারের পথ কি সত্যিই সবার জন্য সমান ও সহজ? ভাইরাল মিজানের একটাই আবেদন সব অভিযোগ, আইনি লড়াই ও প্রতীক্ষার শেষে মিজানের আবেদন খুব সাধারণ—
আমি শুধু আমার ন্যায্য অধিকার চাই। দ্রুত, নিরপেক্ষ ও কার্যকর বিচার চাই।

মানবিকতার প্রতীক হয়ে ওঠা একজন সাধারণ মানুষের এই আর্তি আজ শুধু তাঁর ব্যক্তিগত নয়— এটি হয়ে উঠেছে দেশের অসংখ্য নির্যাতিত নাগরিকের নীরব আর্তনাদ।

আরো