মঙ্গলবার, ১০ মার্চ, ২০২৬, ৬:৩৪ অপরাহ্ণ

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অবহেলায় বিপর্যস্ত জনজীবন, ঝুঁকিতে ফায়ার সার্ভিস ও অ্যাম্বুলেন্স চলাচল

নিজস্ব প্রতিবেদক:

রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র ঘিরে গড়ে ওঠা গাবতলী থেকে সদরঘাট পর্যন্ত বেড়িবাঁধ সড়কটি শুধু একটি পথ নয়—এটি রাজধানী ঢাকার পশ্চিম ও দক্ষিণাঞ্চলকে সংযুক্ত রাখার একমাত্র ‘নাগরিক লাইফলাইন’। প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষ ও হাজার হাজার যানবাহন এই সড়ক ব্যবহার করে কর্মস্থল, বাজার ও চিকিৎসাকেন্দ্রে যাতায়াত করেন। কিন্তু আজ এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি পরিণত হয়েছে দুর্ভোগ ও ঝুঁকির প্রতীকে।

বসিলা থেকে বাবুবাজার পর্যন্ত রাস্তায় খানা-খন্দকের রাজত্ব:
বসিলা মোড় পার হয়ে রায়েরবাজার, হাজারীবাগ, কামরাঙ্গীরচর, সোয়ারিঘাট ও বাবুবাজার পর্যন্ত প্রায় ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কটি এখন কার্যত চলাচলের অনুপযোগী। বৃষ্টিতে তৈরি বিশাল গর্ত, ভাঙা পিচঢালা রাস্তা, অপরিকল্পিত খোঁড়াখুঁড়ি এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অচলাবস্থায় এই পথ এখন ‘মৃত্যুফাঁদে’ পরিণত হয়েছে।

হাজারীবাগ ফায়ার স্টেশন-এর সিনিয়র স্টেশন অফিসার সুবাষ বলেন—
রাস্তায় বড় বড় গর্ত আর খানা-খন্দকের কারণে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি স্টেশন থেকে বের হতে বেগ পেতে হয়। কোনো আগুন লাগলে ঘটনাস্থলে দ্রুত পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি যদি দ্রুত রাস্তাটি মেরামতের কাজ শেষ করতো, তাহলে নাগরিক সেবা আরও সহজলভ্য হতো।

মানুষের ভোগান্তি ও জীবনের ঝুঁকি—
সড়কের ভাঙাচোরা অবস্থার কারণে শুধুমাত্র যাত্রীবাহী গাড়িই নয়, বরং গুরুত্বপূর্ণ এম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের গাড়িও নিয়মিতভাবে আটকে পড়ছে তীব্র যানজটে।

একজন স্থানীয় বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন—
একজন রোগীকে এম্বুলেন্সে করে নিয়ে যাচ্ছিলাম। হাজারীবাগে জ্যামে আটকে থেকে প্রায় আধঘণ্টা লেগে যায় রায়েরবাজার পৌঁছাতে। রোগীটির শ্বাসকষ্ট বেড়ে গিয়েছিল—যেকোনো সময় মৃত্যুও হতে পারতো।
নাগরিকরা বলছেন, রাস্তার মাঝখানে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বড় গর্ত তৈরি করে তা মাসের পর মাস ভরাট না করায় ও পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় বৃষ্টির সময় পুরো রাস্তাটি জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে। এতে পরিবহন ও জনজীবন দুটোই স্থবির হয়ে যাচ্ছে।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দায় এড়ানো—
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের নিয়ন্ত্রণাধীন ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড এই রাস্তা সংস্কারের দায়িত্বে রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রকল্প সাইনবোর্ডে প্রকল্প শুরুর ও শেষের তারিখ উল্লেখ না থাকায় এলাকাবাসী বিভ্রান্ত।
প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তাকে যখন কাজের সময়সূচি সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন—
আমি নতুন এসেছি, বিষয়টা আমার জানা নেই।

কয়েকজন ব্যবসায়ী বলেন—
আমরা সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে পারছি না। গর্তে আটকে ট্রাক উল্টে যাচ্ছে, শ্রমিকরা ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছে। সরকারের নজরদারি না থাকলে এই সড়ক ধীরে ধীরে অচল হয়ে পড়বে।

পরিবেশ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি—
সড়কের পাশে গড়ে ওঠা ভাঙারির দোকান ও বর্জ্য ফেলার স্থানগুলো এখন দুর্গন্ধের কেন্দ্রবিন্দু। খোলা জায়গায় ময়লা-আবর্জনা ফেলে রাখা হচ্ছে, যা শুধু যান চলাচল বাধাগ্রস্ত করছে না, বরং স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিও তৈরি করছে।

নগর উন্নয়ন বিশ্লেষক বলেন—
এই সড়কটি ঢাকার বিকল্প রোড নেটওয়ার্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখানে প্রতিটি মিনিটের যানজটের অর্থনৈতিক ক্ষতি কোটি টাকায় গোনা যায়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও তত্ত্বাবধায়ক সংস্থা যদি সময়মতো প্রকল্প সম্পন্ন না করে, তাহলে শুধু নাগরিক ভোগান্তি নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

এলাকাবাসীর দাবি ও আহ্বান—
অবস্থা দ্রুত পরিবর্তনের জন্য এলাকাবাসী সিটি কর্পোরেশন ও সড়ক ও জনপদ অধিদপ্তর, এবং সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টা মণ্ডলীর প্রতি আবেদন জানিয়েছেন—
১️. অবিলম্বে রাস্তার গর্ত ও খানা-খন্দক ভরাট করতে হবে।
২️. ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজের সময়সূচি ও অগ্রগতি প্রকাশ করতে হবে।
৩. বিকল্প পথ নিশ্চিত না করা পর্যন্ত ভারী যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
৪. বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কঠোর নজরদারি আরোপ করতে হবে।

গাবতলী থেকে সদরঘাট পর্যন্ত বেড়িবাঁধ সড়কটি আজ এক সংকটের প্রতিচ্ছবি—যেখানে জনজীবনের চাহিদা, প্রশাসনিক অব্যবস্থা ও ঠিকাদারি দুর্নীতির ছাপ স্পষ্ট।নাগরিক সেবা ব্যাহত হচ্ছে, জীবন ঝুঁকিতে পড়ছে, অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।এই সড়ক শুধু একটি রাস্তা নয়—এটি ঢাকার হৃদপিণ্ড। আর সেই হৃদপিণ্ড আজ ধুকপুকানি হারাতে বসেছে।

আরো