শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২৬, ১১:১৫ অপরাহ্ণ

বৈশাখ হোক সবার: ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির বন্ধনে

প্রফেসর ড. ফরিদ আহমদ সোবহানী উপাচার্য, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি, ঢাকা

ছোটবেলায় বাপ-চাচাদের প্রায়ই পান্তা ভাত খেতে দেখেছি। সেকালের প্রত্যুষে আমিও বহুবার পান্তা ভাত খেয়েছি। তখন পান্তা ভাত ছিল অধিকাংশ কৃষক-শ্রমিকের সকালের সহজলভ্য খাবার। তবে পান্তার সঙ্গে ইলিশ মাছ নয়, বরং গুড়, চিনি, কলা, ডিমভাজি বা তরি-তরকারি—এমনকি কেবল লবণ-মরিচ দিয়েও খাওয়া হতো।

বৈশাখে সারাদেশে বিভিন্ন এলাকায় বৈশাখী মেলা বসত, যেখানে জিলাপি, মুড়ি, বাতাসা, মিষ্টি, পিঠা, পায়েসসহ নানা ধরনের খাবার বিক্রি হতো। মাটির তৈরি পুতুল, হাঁড়ি-পাতিল, কাগজের ঘুড়ি, বেতের বাঁশি এবং বিভিন্ন কারুশিল্প ও আসবাবপত্র প্রদর্শিত হতো। ছোটদের আনন্দের জন্য চরকির ব্যবস্থাও থাকত। বৈশাখ মাসের শুরুতে ব্যবসায়ীরা ‘হালখাতা’ আয়োজন করতেন, যা ছিল এক সামাজিক ও অর্থনৈতিক ঐতিহ্য।

এসব কার্যক্রম সাধারণত মানুষের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের অংশ হিসেবে বিবেচিত হতো এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে ধর্মীয় চর্চার সঙ্গে সরাসরি কোনো বিরোধ সৃষ্টি করত না। তবে কিছু মেলায় নাচ-গান বা জুয়ার মতো কার্যক্রমও দেখা যেত, যা অনেকের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য ছিল না। ফলে সমাজের সচেতন অংশ, বিশেষ করে আলেম সমাজ, এসব বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিতেন। পরবর্তীতে অনেক স্থানে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত কার্যক্রম হ্রাস পেয়েছে।

আমাদের বৈশাখী সংস্কৃতির বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঐতিহ্যের মূল উপাদানগুলো হলো—পান্তা ভাত, নবান্ন উৎসব, বাঙালিয়ানা পোশাক, হালখাতা, বিভিন্ন পিঠা-পায়েস, আতিথেয়তা এবং আনন্দঘন শোভাযাত্রা।
নব্বইয়ের দশক থেকে বৈশাখী উদযাপনে কিছু নতুন উপাদান যুক্ত হয়েছে—যেমন পান্তার সঙ্গে ইলিশ মাছের সংযোজন বা শোভাযাত্রার নতুন রূপায়ণ। মঙ্গল শোভাযাত্রায় নানান প্রতীকী উপস্থাপনা, মুখোশ ও শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হয়। এসব উপাদানকে কেউ কেউ ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ধারার বহুমাত্রিক প্রকাশ হিসেবে দেখেন, আবার অন্যরা তাদের নিজ নিজ ধর্মীয় বিশ্বাসের আলোকে ভিন্নভাবে মূল্যায়ন করেন।

এই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির প্রেক্ষিতে বলা যায়, পহেলা বৈশাখকে এমনভাবে উদযাপন করা গুরুত্বপূর্ণ, যাতে এটি কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় পরিচয়ের সঙ্গে সীমাবদ্ধ না হয়ে সকলের জন্য উন্মুক্ত ও গ্রহণযোগ্য থাকে। আয়োজকদেরও সচেতন থাকতে হবে, যাতে অনুষ্ঠানমালা এমন হয় যা সকল সম্প্রদায়ের মানুষের অনুভূতিকে সম্মান করে।
পাশাপাশি, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে মানুষ তাদের নিজস্ব বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের আলোকে সাংস্কৃতিক চর্চা করে থাকে—এটাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশেও আমাদের নিজস্ব ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ভিত্তিতে বৈশাখ উদযাপনকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমন্বিত করা সময়ের দাবি।

আমরা যদি আমাদের ঐতিহ্যের মূল সুরে ফিরে যেতে পারি, তবে দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাংলা নববর্ষকে আরও আনন্দময় ও সর্বজনগ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারবো। তাই নববর্ষ উদযাপন হোক আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং সম্প্রীতির চর্চার মধ্য দিয়ে—যা সমাজে শান্তি ও সৌহার্দ্য বয়ে আনবে।

আরো