মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল, ২০২৬, ৫:৩১ অপরাহ্ণ

শব্দ দূষণ: এখনই প্রতিরোধ জরুরি

লেখক: মো: বাবুল মিয়া, পরিবেশ উন্নয়নকর্মী

শব্দদূষণ একটি নীরব ঘাতক। যার ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে আমাদের শারীরিক ও মানসিক মানসিক স্বাস্থ্যে। শিক্ষা এমনকি আচরণগত ক্ষেত্রেও বড়ো সমস্যা তৈরি করতে পারে এই শব্দ দূষণ। অতিরিক্ত মাত্রার শব্দ মনঃসংযোগ নষ্ট করে। এমনকি বাড়ির ছোট ছোট শিশুরাও শব্দ দূষণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বাধাগ্রস্ত হচ্ছে তাদের মানসিক বিকাশ। শব্দের কারণে মানুষ বধির হয়ে যাচ্ছে। শব্দ দূষণ মানুষিক চাপ, শ্রবণশক্তি হ্রাস এবং হৃদরোগের অন্যতম কারণ। শুধু এই ঢাকা শহরে নয়, শহরের বাহিরেও এই শব্দ দূষণের মাত্রা দিনে দিনে বৃদ্ধি পাচ্ছে যা উদ্বেগজনক।

সম্প্রতি ডাব্লিউবিবি ট্রাস্টের উদ্যোগে ০৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০ মার্চ ২০২৫, ঢাকা শহরের ২০ টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পরিবেশ অধিদপ্তর কর্তৃক প্রদত্ত মানদন্ড অনুসারে শব্দ পরিমাপক মিটারের সাহায্যে শব্দের মান মাত্রা পরিমাপ করা হয়। শব্দদূষণ পরিমাপ কালে দেখা যায় যে বেশিরভাগ স্থানে শব্দের কারণ বিভিন্ন গাড়ির হর্ন, অ্যাম্বুলেন্স ও ইটভাঙ্গা মেশিনের আওয়াজ। সম্প্রতি ডাব্লিউবিবি ট্রাস্ট এর উদ্যোগে ০৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০ মার্চ ২০২৫, ঢাকা শহরের ২০ টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পরিবেশ অধিদপ্তর কর্তৃক প্রদত্ত মানদন্ড অনুসারে শব্দ পরিমাপক মিটারের সাহায্যে শব্দের মান মাত্রা পরিমাপ করা হয়। শব্দ পরিমাপক মিটারের সাহায্যে বিভিন্ন ট্র্যাফিক সিগনাল মোড়ে শব্দের মাত্রা পরিমাপ করা হয়। শব্দদূষণ পরিমাপ কালে দেখা যায় যে বেশিরভাগ স্থানে শব্দের কারণ বিভিন্ন গাড়ির হর্ন, অ্যাম্বুলেন্স ও ইটভাঙ্গা মেশিনের শব্দ। উল্লেখিত ২০টি স্থানে ট্রাফিক সিগনাল মোড়ে শব্দ পরিমাপক মিটারের সাহায্যে শব্দ পরিমাপের মাধ্যমে আমরা দেখতে পাই, মগবাজার এলাকায় সর্বোচ্চ ডেসিবেল সকালে ১৩০ এবং সর্বোচ্চ বিকালে কারওয়ান বাজারে ১২৭ ডেসিবেল শব্দের মাত্রা। ২০টি স্থানের মধ্যে আমরা ধানমন্ডি এলাকায় সর্বোনিম্ন সকালে ৫৯ ডেসিবেল এবং বিকাল ৫২ ডেসিবেল শব্দের মাত্রা দেখতে পাই। যা শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা ২০০৬ এর মানমাত্রা ডেসিবেলের চেয়ে অনেক বেশি।

বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা ২০০৬ তৈরি হয়। বিধিমালা অনুযায়ী কোন এলাকার কত ডেসিবেল শব্দের মানমাত্রা হবে তা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। নীরব এলাকায় দিনের বেলায় শব্দের মানমাত্রা হবে ৫০ ডেসিবেল, রাতের বেলায় ৪০ ডেসিবেল। আবাসিক এলাকায় দিনের বেলায় ৫৫ ডেসিবেল, রাতের বেলায় ৫৫ ডেসিবেল, মিশ্র এলাকায় দিনের বেলায় ৬০ ডেসিবেল, রাতের বেলায় ৫ ডেসিবেল, বাণিজ্যিক এলাকায় দিনে ৭০ ডেসিবেল, রাতে ৬০ ডেসিবেল, এবং শিল্প এলাকায় দিনের বেলায় ৭৫ ডেসিবেল, রাতে ৭০ ডেসিবেলের মধ্যে থাকতে হবে।

পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, সরকারি অফিসের ১০০ মিটারের মধ্যে নীরব এলাকা ঘোষিত হয়। এলাকা এবং গুরুত্ব বিবেচনা করে দিন এবং রাত ভেদে নীরব, আবাসিক, বাণিজ্যিক, শিল্প ও মিশ্র এলাকায় শব্দের মাত্রা সহনীয় মাত্রা নির্ধারণ করা হয়। মানমাত্রা অতিক্রমকারী হর্ন ব্যবহার নিষিদ্ধ বা দণ্ডনীয় অপরাধ। এই আইনে আরো উল্লেখ্য যে, প্রথম অপরাধের জন্য অনধিক ০১(এক) মাস কারাদণ্ড বা অনধিক ০৫ (পাঁচ) হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয়দণ্ড। পরবর্তী অপরাধের জন্য অনধিক ০৬ (ছয়) মাস কারাদণ্ড বা অনধিক ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয়দণ্ড। এত দিন পরিবেশ অধিদপ্তরের ভ্রাম্যমাণ আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে আইন কার্যকর করতেন। পূর্বের বিধিমালায় কেবল ম্যাজিস্ট্রেটদের ক্ষমতা সীমাবদ্ধ থাকায় কাঙ্খিত সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হয়নি। এজন্য নতুন বিধিমালায় ম্যাজিস্ট্রেটদের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়েছে।

শব্দদূষণের ভয়াবহতা বিবেচনায় নিয়ে দূষণ নিয়ন্ত্রণে আনতে, বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা ২০০৬ সংশোধন করে শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা ২০২৫ করা হয়। এই বিধিমালায় শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ আনতে জরিমানা আরোপ করা হয়। শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা ২০২৫ এ বলা হয়েছে যদি কোনো ব্যক্তি ট্র্যাফিক বিভাগের সার্জেন্ট পদমর্যাদার নিম্নে নন এমন কোনো পুলিশ কর্মকর্তার সম্মুখে বিধি ৬ এর উপ-বিধি অনুসারে কোনো ব্যক্তি মোটরযান বা নৌযানে অননুমোদিত শব্দের মানমাত্রা অতিক্রমকারী হর্ন স্থাপন ও ব্যবহার করতে পারিবে না। নীরব এলাকায় যানবাহনে কোনো প্রকার হর্ন বাজানো যাইবে না। আবাসিক এলাকায় রাতে (রাত ০৯ ঘটিকা হতে সকাল ০৬ ঘটিকা পর্যন্ত) হর্ন বাজানো (২), (৩) বা (৪) এর অধীন কোনো অপরাধ সংঘটন করেন, তাহা হইলে উক্ত কর্মকর্তা ঘটনাস্থলেই, তাকে জরিমানা আরোপ করিতে পারবেন; তবে উক্ত জরিমানা বিধি ১৯ এর টেবিলের ক্রমিক নং (২) এ উল্লিখিত অর্থদণ্ডের অধিক হইবে না। জরিমানা বিধি ১৯ এর টেবিলের ক্রমিক নং (২) উল্লেখ আছে, প্রতিবার অপরাধের ক্ষেত্রে অনধিক ৩ (তিন) মাস কারাদণ্ড বা অনধিক ১০ (দশ) হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড; এবং চালকের ক্ষেত্রে, অতিরিক্ত হিসাবে দোষ সূচক ১ (এক) পয়েন্ট কর্তন হইবে। এই বিধিমালার জরিমানা আরোপ অংশে কর্তৃত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার ক্ষমতার পরিধি বৃদ্ধি করা হয়েছে যা শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক ফলাফল বয়ে আনবে।

শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের উদ্যোগে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা এবং পরিবেশবাদী বেসরকারি সংগঠনগুলোকে মনিটরিং কর্মসূচিতে সম্পৃক্ত করা জরুরি। পাশাপাশি শব্দ দূষণকারীর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সব ধরনের গাড়ি চালকদেরকে বিনা প্রয়োজনে হর্ন বাজানো থেকে কীভাবে বিরত রাখা যায় সে বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন। সেইসাথে বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন সংশোধন, শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা ২০২৫ বাস্তবায়ন এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি। বিশেষ করে সব সিটি সার্ভিস হতে হাইড্রোলিক হর্ন অপসারণ করা গেলে শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণের সুফল পাওয়া যাবে।

আরো