তামাকের মোড়কে স্বাস্থ্য সতর্কবার্তায় আইন মানছে না অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান
বিডি মেইল ডেস্ক:
নিজস্ব প্রতিবেদক: তামাকজাত পণ্যের মোড়কে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী দেওয়ার হার বাড়লেও আইন অনুযায়ী নির্ধারিত আকার ও অন্যান্য শর্ত মানছে না অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান। গত বছরের তুলনায় সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী দেওয়ার হার ৩ শতাংশ বেড়ে ৮৮ শতাংশে দাঁড়ালেও আইন অনুযায়ী মোড়কের ৫০ শতাংশ স্থানজুড়ে সতর্কবাণী রয়েছে মাত্র ৩৭ শতাংশ পণ্যের মোড়কে। এছাড়া ৭৩ শতাংশ মোড়কের উভয় পাশে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী পাওয়া যায়নি।
টোব্যাকো কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চ সেল (টিসিআরসি), ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।
রোববার (৯ আগস্ট) রাজধানীর একটি সম্মেলন কক্ষে ‘আইন অনুযায়ী তামাকজাত দ্রব্যের মোড়কে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী বাস্তবায়ন: বর্তমান অবস্থা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। বাংলাদেশ তামাকবিরোধী জোট ও টিসিআরসি যৌথভাবে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে।
গবেষণায় ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, সিলেট, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগীয় শহরের ৩৯৪টি তামাকজাত পণ্যের মোড়ক পর্যবেক্ষণ করা হয়। ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫-এর ধারা ১০ এবং পণ্য মোড়কজাতকরণ বিধিমালা, ২০২১-এর সংশ্লিষ্ট বিধানকে গবেষণার সূচক হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
গবেষণায় দেখা যায়, ৩৯৪টি মোড়কের ৮৮ শতাংশে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী থাকলেও মাত্র ৩৭ শতাংশ মোড়কে আইন অনুযায়ী নির্ধারিত ৫০ শতাংশ স্থানজুড়ে তা মুদ্রিত রয়েছে। বিশেষ করে জর্দা, গুল ও বিড়ির ক্ষেত্রে পরিস্থিতি বেশি উদ্বেগজনক। ২৯৭টি জর্দার মোড়কের মাত্র ২৮ শতাংশে নির্ধারিত ৫০ শতাংশ স্থানজুড়ে সতর্কবাণী পাওয়া গেছে। ২০টি গুলের মোড়কের কোনোটিতেই নির্ধারিত ৫০ শতাংশ স্থানজুড়ে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী পাওয়া যায়নি।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ৭৩ শতাংশ মোড়কের উভয় পাশে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী নেই। একই সঙ্গে তামাকজাত পণ্যের মোড়কে বাধ্যতামূলক তথ্য প্রদানের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। ৩৯৪টি মোড়কের মাত্র ১৬ শতাংশে সর্বোচ্চ খুচরা বিক্রয়মূল্য (এমআরপি) এবং ৫৫ শতাংশে উৎপাদনের তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া ৮০ শতাংশ মোড়কে ট্রেড লাইসেন্স নম্বর পাওয়া যায়নি।
মোড়কে ব্র্যান্ডের নাম বা স্ট্যাম্প দিয়ে স্বাস্থ্য সতর্কবাণী আংশিকভাবে ঢেকে রাখা, খোলা তামাক ও খুচরা শলাকা বিক্রি এবং নিম্নমানের মোড়ক ব্যবহারের মতো অনিয়মও গবেষণায় উঠে এসেছে। স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত তদারকি ও আইন প্রয়োগের দুর্বলতাকে এসব অনিয়মের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে টিসিআরসির প্রকল্প কর্মকর্তা বিভূতী ভূষণ মাহাতো বলেন, তামাকজাত পণ্যের মোড়কে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা আইন অনুযায়ী নির্ধারিত আকার ও অন্যান্য শর্ত মেনে দেওয়া হচ্ছে না। বিশেষ করে ধোঁয়াবিহীন তামাকজাত পণ্যের ক্ষেত্রে আইন বাস্তবায়নের ঘাটতি বেশি।
আইনজীবী ও নীতি বিশ্লেষক অ্যাডভোকেট সৈয়দ মাহবুবুল আলম বলেন, টিসিআরসি ২০১৬ সাল থেকে প্রতিবছর এ ধরনের গবেষণা পরিচালনা করছে। গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে তামাক কোম্পানিগুলোর বিভিন্ন অনিয়ম বন্ধে পরিবর্তন এসেছে। নতুন বিধিমালা প্রণয়নেও এ গবেষণার ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশ তামাকবিরোধী জোটের সদস্য ও ‘সেতু’র প্রকল্প পরিচালক শাগুফকা সুলতানা বলেন, নতুন সংশোধিত আইনের বিধিমালা দ্রুত প্রণয়ন করে ৭৫ শতাংশ স্বাস্থ্য সতর্কবাণী ও স্ট্যান্ডার্ড প্যাকেজিং বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে আইন অনুযায়ী মোড়কের নির্ধারিত স্থানে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী মুদ্রণ নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
ডাব্লিউবিবি ট্রাস্টের পরিচালক গাউস পিয়ারী বলেন, ধোঁয়াবিহীন তামাকজাত পণ্যের মোড়কে আইন বাস্তবায়নের ঘাটতি সবচেয়ে বেশি উদ্বেগজনক। জর্দা ও গুলসহ এসব পণ্যের উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ কার্যকর নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনতে হবে।
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল বলেন, তামাকের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়নের অনিয়মগুলো গণমাধ্যমে আরও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরতে হবে।
কালের কণ্ঠের সিনিয়র সাংবাদিক নিখিল ভদ্র বলেন, তামাক নিয়ন্ত্রণে গবেষণালব্ধ তথ্য নীতিনির্ধারণ, আইন বাস্তবায়ন ও জনসচেতনতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তামাকজাত পণ্যের মোড়কে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী প্রদানের ক্ষেত্রে অগ্রগতি হলেও আইন নির্ধারিত আকার, অবস্থান ও অন্যান্য বাধ্যতামূলক শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না।
গবেষণায় তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের ধারা ১০ কার্যকর বাস্তবায়নে বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ২০২৬ সালের সংশোধিত আইনের বিধিমালা দ্রুত প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন, স্ট্যান্ডার্ড প্যাকেজিং চালু, খুচরা শলাকা ও খোলা তামাক বিক্রি বন্ধ, নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা, আইন লঙ্ঘনকারী তামাকপণ্য জব্দ ও ধ্বংস এবং সব তামাক কোম্পানিকে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের অধীনে নিবন্ধনের আওতায় আনা।
এছাড়া তামাকজাত পণ্যের মোড়কে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের নাম-ঠিকানা, উৎপাদনের তারিখ, সর্বোচ্চ খুচরা বিক্রয়মূল্য (এমআরপি) ও অন্যান্য বাধ্যতামূলক তথ্য সঠিকভাবে মুদ্রণ নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে বিভিন্ন তামাকবিরোধী সংগঠন, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।