নতুন সরকারকে অভিনন্দন জানিয়ে স্বাধীন সাংবাদিকতা রক্ষার জোরালো আহ্বান
দেশের নবগঠিত সরকারকে আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানিয়েছে ঢাকা প্রেস ক্লাব। গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা বজায় রেখে শান্তিপূর্ণভাবে সরকার গঠিত হওয়াকে ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করে সংগঠনটি আশা প্রকাশ করেছে—নতুন সরকারের নেতৃত্বে দেশ উন্নয়ন, সুশাসন ও আইনের শাসনের পথে আরও এগিয়ে যাবে।
ক্লাবের সভাপতি আওরঙ্গজেব কামাল ও সাধারণ সম্পাদক মো. দেলোয়ার হোসেন স্বাক্ষরিত এক যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, গণতন্ত্রের চারটি স্তম্ভের মধ্যে গণমাধ্যম অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা, জনমত প্রতিফলন, অনিয়ম-দুর্নীতি উন্মোচন এবং নীতি-নির্ধারণে জনস্বার্থের প্রশ্ন তুলে ধরার ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকা অপরিসীম। তাই গণমাধ্যমকে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদান এবং এর স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা নতুন সরকারের জন্য সময়োপযোগী ও জরুরি পদক্ষেপ হবে।
বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ বলেন, দায়িত্বশীল, বস্তুনিষ্ঠ ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা একটি রাষ্ট্রের সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠায় কার্যকর ভূমিকা রাখে। মুক্ত ও স্বাধীন গণমাধ্যম ছাড়া গণতন্ত্র কখনোই পরিপূর্ণতা পায় না। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার এবং সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কেবল সাংবাদিক সমাজের দাবি নয়—এটি সংবিধানসম্মত নাগরিক অধিকার রক্ষারও অংশ।
তারা আরও বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন পর্যায়ে সাংবাদিক নির্যাতন, হয়রানি ও মামলার ঘটনা উদ্বেগজনক। বিশেষ করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কর্মরত সাংবাদিকরা নানা চাপ, সীমাবদ্ধতা ও ঝুঁকির মধ্যে দায়িত্ব পালন করেন। স্থানীয় পর্যায়ে দুর্নীতি ও অনিয়ম নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করতে গিয়ে অনেক সাংবাদিককে হামলা, মামলা বা সামাজিকভাবে হেনস্তার শিকার হতে হয়। এসব পরিস্থিতির অবসানে দ্রুত বিচার, আইনগত সুরক্ষা এবং প্রশাসনিক সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।
সরকারের প্রতি ২১ দফা দাবি
ঢাকা প্রেস ক্লাব নতুন সরকারের কাছে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো বিশেষভাবে বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে—
সংবাদকর্মীদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি চালু
সাংবাদিক নির্যাতন বন্ধে বিশেষ সেল/টাস্কফোর্স গঠন
গণমাধ্যমবান্ধব আইনগত পরিবেশ সৃষ্টি ও বিদ্যমান আইন পুনঃপর্যালোচনা
জেলা-উপজেলা সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যবীমা ও সহায়তা তহবিল
পেশাজীবী সাংবাদিকদের জন্য সরকারি কল্যাণ তহবিল ও ভাতা
সরকারি হাসপাতাল ও প্রতিষ্ঠানে সাংবাদিক সহায়তা ডেস্ক
তথ্য অধিকার আইন কার্যকর বাস্তবায়ন
গণমাধ্যম-সংক্রান্ত আইন প্রণয়নে সাংবাদিকদের মতামত বাধ্যতামূলক গ্রহণ
সব সাংবাদিকের জন্য স্বাস্থ্য ও জীবন বীমা
মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার রোধে প্রেস কার্ডের আইনি মর্যাদা
তথ্য প্রাপ্তির স্বচ্ছ ও দ্রুত প্রক্রিয়া নিশ্চিতকরণ
সাংবাদিক নিয়োগে স্বচ্ছ নীতিমালা ও নৈতিক মানদণ্ড
ডিজিটাল সাংবাদিকদের সমান স্বীকৃতি ও সুযোগ
নির্যাতনের ঘটনায় দ্রুত তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি
সাংবাদিক সুরক্ষা আইন প্রণয়ন
দায়িত্ব পালনকালে হামলা ও হয়রানি বন্ধে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা
ন্যূনতম বেতন কাঠামো ও ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়ন
চুক্তিভিত্তিক সাংবাদিকদের চাকরি স্থায়ীকরণ ও সামাজিক নিরাপত্তা
নিহত ও আহত সাংবাদিক পরিবারের পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ
শ্রম আইন লঙ্ঘন বন্ধ ও শ্রম অধিকার নিশ্চিত
কালো আইন ও দমনমূলক ধারা অপব্যবহার বন্ধ
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর এই যুগে ভুয়া খবর, অপতথ্য ও বিভ্রান্তিকর প্রচারণা মোকাবিলায় পেশাদার সাংবাদিকতার মানোন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও নীতিমালা স্পষ্ট করা, অনলাইন হয়রানি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া এবং সাংবাদিকদের ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সময়ের দাবি।
ঢাকা প্রেস ক্লাব মনে করে, রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও গণতন্ত্র সুসংহত করতে সরকার, প্রশাসন ও সাংবাদিক সমাজের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতার সম্পর্ক থাকা প্রয়োজন। গঠনমূলক সমালোচনা গণতন্ত্রের সৌন্দর্য—এটি রাষ্ট্র পরিচালনায় সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে। তাই গণমাধ্যমের স্বাধীন কণ্ঠস্বরকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা এবং সমালোচনাকে গণতান্ত্রিক চর্চার অংশ হিসেবে গ্রহণ করা উচিত।
নেতৃবৃন্দ নতুন সরকারের সার্বিক সফলতা কামনা করে বলেন, সাংবাদিক সমাজ দেশের উন্নয়ন ও গণতন্ত্র রক্ষায় দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে যাবে। একই সঙ্গে স্বাধীন ও নীতিনিষ্ঠ সাংবাদিকতার প্রশ্নে কোনো আপস করা হবে না—এমন দৃঢ় প্রত্যয়ও ব্যক্ত করা হয়।
শেষে সংগঠনটি আশা প্রকাশ করে, নতুন সরকার সাংবাদিক সমাজের আস্থা, মর্যাদা ও অধিকার সমুন্নত রাখবে এবং একটি গণমাধ্যমবান্ধব, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করবে।