রবিবার, ৩ মে, ২০২৬, ৫:৪৫ অপরাহ্ণ

লোভনীয় অ্যাপের ফাঁদে নিঃস্ব মানুষ, কয়েক মিনিটেই শূন্য ব্যাংক অ্যাকাউন্ট

মোবাইল ফোনের ব্যাংকিং অ্যাপে হানা দিচ্ছে হ্যাকাররা, তাও আবার আরেকটি ফ্রি অ্যাপের মাধ্যমে। একটি এসএমএস আসার পর হঠাৎ ফোনের স্ক্রিন ব্ল্যাক হয়ে যাচ্ছে, ফলে ব্যবহারকারী ফোনের নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছেন এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্টের টাকা উধাও হয়ে যাচ্ছে। গোয়েন্দা পুলিশের সাইবার ইউনিটে এক মাসেই এমন অন্তত ৩০টি অভিযোগ এসেছে। সাইবার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেকোনো অ্যাপ ইন্সটল করার আগে অবশ্যই সচেতন থাকতে হবে।

কেউ না কেউ আপনাকে নজরদারি করছে, দরকারি গোপন তথ্য হাতিয়ে নিচ্ছে এবং স্মার্টফোনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিচ্ছে। এরপর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে সব টাকা লোপাট করা হচ্ছে। বিভিন্ন সিনেমায় এমন ঘটনা দেখা গেলেও এখন তা বাংলাদেশেও ঘটছে।

২৭ মার্চ খেলা দেখার জন্য ‘এনবি’ নামের একটি অ্যাপ ডাউনলোড করেন পিংকি। মুহূর্তেই তার মোবাইল স্ক্রিন ব্ল্যাক হয়ে যায় এবং ফোনের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় হ্যাকারদের হাতে। এরপর শুরু হয় ব্যাংক অ্যাপ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া।

ভুক্তভোগী পিংকি বলেন, একটি বিজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল যে এই অ্যাপের মাধ্যমে বিশ্বের সব চ্যানেল দেখা যাবে। সেই লোভে তিনি অ্যাপটি ইন্সটল করেন। ইন্সটল করার পর ফোনটি হ্যাং হয়ে যায় এবং পরে আনইনস্টল করার চেষ্টা করলে ফোন সম্পূর্ণ ব্ল্যাক হয়ে যায় এবং বারবার রিস্টার্ট হতে থাকে। এরপর তার ফোনে একটি মেসেজ আসে যে তার অ্যাকাউন্ট থেকে ১৮ হাজার টাকা কেটে নেয়া হয়েছে। পরে তিনি ব্যাংক অ্যাপ চেক করে দেখেন ব্যালেন্স ঠিক আছে। কিন্তু তিন-চার মিনিট পর একের পর এক মেসেজ আসতে থাকে প্রথমে ৩ লাখ, পরে আবার ২ লাখ টাকা ট্রান্সফার হয়ে যায় এবং পুরো লিমিট অনুযায়ী টাকা তুলে নেয়া হয়।

একই দিনে একই কৌশলে আরেকজন ভুক্তভোগী হন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী সৌম্য কান্তি দাশ। মাত্র ৫ থেকে ৭ মিনিটের মধ্যে তার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খালি হয়ে যায়।

সৌম্য কান্তি দাশ বলেন, তিনি স্কাই ব্যাংকিং অ্যাপে ঢুকে বিষয়টি নিশ্চিত করতে চাইছিলেন। কিন্তু ঢোকার ৩০ সেকেন্ডের মধ্যেই ফোন ব্ল্যাক স্ক্রিন হয়ে যায় এবং ‘সিস্টেম আপডেটিং’ লেখা দেখায়, ফলে কোনো বাটন চাপতে পারেননি। কিছুক্ষণ পরই দুটি মেসেজ আসে একটি ‘ওটিপি’ এবং আরেকটি ৩ লাখ টাকা অন্য অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার হওয়ার। তিনি বুঝতে পারেন এটি কোনো সিস্টেম আপডেট নয়, বরং ম্যালওয়্যারের মাধ্যমে ফোনের রিমোট কন্ট্রোল নেয়া হয়েছে। একই ধরনের অভিযোগ তাদের কাছে ৩০টিরও বেশি এসেছে।

ডিএমপির সাইবার ইউনিট বলছে, প্রতিদিনই এ ধরনের সাইবার প্রতারণার শিকার হচ্ছেন অসংখ্য মানুষ। গত এক মাসে অন্তত ৩০টি অভিযোগ এসেছে।

ডিএমপির সাইবার ইউনিটের যুগ্ম পুলিশ কমিশনার সৈয়দ হারুন অর রশীদ বলেন, হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে ফোনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ব্যবহারকারীর মতো করেই হ্যাকাররা টাকা ট্রান্সফার করছে। তদন্তে দেখা যাচ্ছে, টাকা দেশের বিভিন্ন ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে ঘুরে অন্য অ্যাকাউন্টে যাচ্ছে, যেগুলোর অনেকই প্রতারক চক্রের নিয়ন্ত্রিত। কিছু ক্ষেত্রে দেশের বাইরেও, বিশেষ করে চীন থেকে এসব কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বলে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে।

সাইবার বিশেষজ্ঞ মুশফিকুর রহমান বলেন, বিভিন্ন ভুয়া অ্যাপ ছড়িয়ে আছে। তাই শুধুমাত্র অফিসিয়াল প্লে স্টোর বা অ্যাপ স্টোর ছাড়া অন্য কোনো উৎস থেকে অ্যাপ ডাউনলোড করা উচিত নয়। বিশেষ করে ফ্রি অ্যাপ বা ফ্রি গেম ডাউনলোড করা থেকে বিরত থাকতে হবে, যেসব ডিভাইসে ব্যাংকিং বা আর্থিক অ্যাপ ব্যবহার করা হয়।

তিনি আরও বলেন, যেকোনো অপরিচিত লিংক বা লোভনীয় অফারে যাচাই ছাড়া ক্লিক করা উচিত নয়। ভুলবশত এমন কিছু করলে সঙ্গে সঙ্গে ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দেয়া উচিত।

আরো