মঙ্গলবার, ২ জুন, ২০২৬, ৫:৪৯ অপরাহ্ণ

পাপ থেকে তওবার সুযোগ থাকে কতদিন পর্যন্ত?

ভুলত্রুটি বা গুনাহ মানুষের জীবনেরই অংশ। তবে ভুলের পর একজন প্রকৃত মুমিনের জন্য আল্লাহর দরবারে ক্ষমা চাওয়ার বা অনুতপ্ত হয়ে চোখের জল ফেলার সময় কখনো ফুরিয়ে যায় না। দুনিয়ার মানুষের চোখ ফাঁকি দিয়ে কোনো অপরাধ লুকাতে পারলেও পরকালে মহান আল্লাহর শাস্তি থেকে বাঁচার কোনো উপায় নেই।

তাই অতীতকে পেছনে ফেলে জীবনের একটি নতুন অধ্যায় শুরু করাই বুদ্ধিমানের কাজ। যদি কেউ খাঁটি মনে অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, তবে আল্লাহ তার তওবা কবুল করেন এবং গুনাহ মাফ করে দেন। মন্দ কাজ ছেড়ে নিজের জীবনকে ভালোর দিকে বদলে নেওয়ার পর আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত ও ক্ষমার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তা ইসলামের অন্যতম মৌলিক বিশ্বাস। আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।

পবিত্র কোরআনের বেশ কিছু আয়াতে এই ক্ষমার বাণী স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। সুরা আত-তাওবার ১০৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, তারা কি জানে না যে, আল্লাহ তার বান্দাদের তাওবা কবুল করেন এবং তাদের সদকা গ্রহণ করেন? নিশ্চয়ই আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল ও দয়ালু।

একইভাবে সুরা আজ-জুমারের ৫৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, হে আমার বান্দারা, যারা নিজেদের প্রতি অবিচার করেছ, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করে দেন। তিনি তো পরম ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।

মৃত্যু কখন আমাদের কড়া নাড়বে, তা কেউ জানে না। তাই তওবা করতে দেরি করা মোটেও উচিত নয়, এখনই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। মৃত্যুর যন্ত্রণা শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত তওবার দরজা সবার জন্য খোলা থাকে।

এ প্রসঙ্গে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ বান্দার তওবা ততক্ষণ পর্যন্ত কবুল করেন, যতক্ষণ না তার প্রাণ কণ্ঠাগত হয়। (সুনানে তিরমিজি)

যেহেতু আমাদের জানা নেই কখন মৃত্যু আসবে, তাই তাওবা করার ক্ষেত্রে অলসতা বা অবহেলার কোনো সুযোগ নেই।

ইসলামের দৃষ্টিতে তওবা কবুল হওয়ার জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট শর্ত বা ধাপ রয়েছে, যা পূরণ করা জরুরি:

প্রথমত, অতীতে করা গুনাহের জন্য মনের ভেতর গভীর অনুশোচনা ও লজ্জা থাকতে হবে।
দ্বিতীয়ত, সেই গুনাহের কাজ থেকে সম্পূর্ণভাবে নিজেকে সরিয়ে নিতে হবে এবং যেসব পরিবেশ বা কারণে সেই পাপ সংঘটিত হয়েছিল, তা পুরোপুরি বর্জন করতে হবে।
তৃতীয়ত, ভবিষ্যতে আর কখনো সেই পাপে লিপ্ত না হওয়ার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করতে হবে। সেই সঙ্গে অতীতের পাপ ধুয়ে মুছে ফেলতে বেশি বেশি নেক আমলে মশগুল হতে হবে।
এই শর্তগুলো মূলত আল্লাহর হকের সঙ্গে সম্পৃক্ত গুনাহের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তবে অপরাধ যদি কোনো মানুষের অধিকার বা বান্দার হকের সঙ্গে জড়িত হয়, তাহলে যার ক্ষতি করা হয়েছে তার কাছে ক্ষমা চাওয়া, ক্ষতিপূরণ দেওয়া বা তার পাওনা বুঝিয়ে দেওয়া তওবা কবুল হওয়ার অন্যতম প্রধান শর্ত।

সঠিক নিয়মে তওবা করতে পারলে তা মানুষের পেছনের সব গুনাহ মুছে দেয় এবং আমলনামা একদম পরিষ্কার করে দেয়। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, পাপাচার থেকে খাঁটি মনে তওবাকারী ব্যক্তি সেই মানুষের মতো, যার কোনো গুনাহই নেই। (সুনানে ইবনে মাজাহ)

সুতরাং, গুনাহ হয়ে যাওয়ার পর হতাশায় নিমজ্জিত হওয়া কোনো সমাধান নয় বরং আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা রেখে অনুতপ্ত হৃদয়ে ক্ষমা চাওয়া উচিত।

এর পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নিজের পুরনো পাপের স্মৃতি ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। মানুষ যত বেশি তার পেছনের পাপের কথা রোমন্থন করে, শয়তানের জন্য তাকে আবার সেই পথে টেনে নেওয়ার সুযোগ তত বেড়ে যায়।

আলেমরা এই বিষয়টিকে শিকারি কুকুরের তাড়া খাওয়া হরিণের সঙ্গে তুলনা করেছেন। হরিণ গতিতে কুকুরের চেয়ে অনেক দ্রুত হওয়া সত্ত্বেও বারবার পেছনের দিকে তাকানোর কারণে তার মনোবল ভেঙে যায় এবং সে সহজেই শিকারি কুকুরের হাতে ধরা পড়ে। তাই পেছনের ভুল ভুলে সামনের সুন্দর ও পবিত্র জীবনের দিকে এগিয়ে যাওয়াই মুমিনের লক্ষ্য হওয়া উচিত।

আরো