Wednesday, 1 July, 2026, 3:55 pm

হলি আর্টিজান হামলার ১০ বছর, কারাগারে ৬ আসামি

রাজধানীর গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে সংঘটিত ভয়াবহ জঙ্গি হামলার ১০ বছর পূর্ণ হলো আজ। ২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে সংঘটিত এই হামলায় দেশি-বিদেশি ২২ জন নিহত হন। দেশের ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস এই হামলার ঘটনায় হাইকোর্টের রায়ে সাত আসামির মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হলেও বর্তমানে জীবিত ছয় আসামি কারাগারে রয়েছেন। তারা হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন করেছেন, যা এখন শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।

২০১৬ সালের ১ জুলাই রাত সোয়া ৯টার দিকে গুলশানের ৭৯ নম্বর সড়কের হোলি আর্টিজান বেকারিতে ‘নব্য জেএমবি’র পাঁচ জঙ্গি হামলা চালিয়ে দেশি-বিদেশি অতিথিদের জিম্মি করে। পরে কুপিয়ে ও গুলি করে ২২ জনকে হত্যা করা হয়। নিহতদের মধ্যে ইতালির নয়জন, জাপানের সাতজন, ভারতের একজন এবং তিনজন বাংলাদেশি নাগরিক ছিলেন।

জিম্মিদের উদ্ধারে অভিযান পরিচালনার সময় বোমা হামলায় নিহত হন বনানী থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সালাহউদ্দিন খান এবং গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার রবিউল ইসলাম।

ঘটনার পর গুলশান থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা হয়। তদন্ত শেষে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট ২০১৮ সালের ১ জুলাই আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে।

বিচার শেষে ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল ‘নব্য জেএমবি’র সাত সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড দেন। পরে ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের আপিলের শুনানি শেষে ২০২৩ সালের ৩০ অক্টোবর বিচারপতি সহিদুল করিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ মৃত্যুদণ্ড বাতিল করে সাত আসামিকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন।

হাইকোর্টের রায়ে আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন রাকিবুল হাসান ওরফে রিগ্যান, মো. জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধী, আসলাম হোসেন ওরফে র‍্যাশ, হাদিসুর রহমান, আবদুস সবুর খান ওরফে সোহেল মাহফুজ, মামুনুর রশীদ ওরফে রিপন এবং শরিফুল ইসলাম খালেদ।

তবে দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে আসলাম হোসেন ওরফে র‍্যাশ ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট কাশিমপুর কারাগার থেকে পালানোর চেষ্টাকালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে নিহত হন। বর্তমানে বাকি ছয় আসামি কারাগারে রয়েছেন।

২০২৪ সালের ১৭ জুন প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ রায়ে হাইকোর্ট বলেন, ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থাকলেও সাত আসামি হামলার ষড়যন্ত্র ও বাস্তবায়নে সহায়তা করেছেন, যা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। তবে সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল আইনের সংশ্লিষ্ট ধারার যথাযথ ব্যাখ্যা না করে তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন, যা আইনগতভাবে সঠিক ছিল না।

রায়ে আরও বলা হয়, সাক্ষ্য-প্রমাণ, আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি এবং উভয় পক্ষের বক্তব্য পর্যালোচনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে তাদের অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে। তবে হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহতা, নৃশংসতা, জঙ্গিদের নিষ্ঠুর আচরণ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার বিষয় বিবেচনায় নিয়ে তাদের প্রত্যেককে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া ন্যায়বিচারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

হাইকোর্ট তাদের প্রত্যেককে আমৃত্যু কারাদণ্ডের পাশাপাশি ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড এবং অর্থদণ্ড অনাদায়ে আরও পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের আদেশ দেন।

এদিকে হাইকোর্টের রায়ে মৃত্যুদণ্ড থেকে আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্ত সাত আসামির মধ্যে জীবিত ছয়জন গত বছরের মে মাসে অভিযোগ থেকে খালাস চেয়ে সর্বোচ্চ আদালতে চারটি আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন করেছেন। বিষয়টি বর্তমানে আপিল বিভাগে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।

উল্লেখ্য, হামলার পরদিন সেনাবাহিনীর কমান্ডো অভিযানে পাঁচ জঙ্গি নিহত হয়। তারা হলেন মীর সামেহ মোবাশ্বের, রোহান ইবনে ইমতিয়াজ ওরফে মামুন, নিবরাস ইসলাম, খায়রুল ইসলাম পায়েল এবং শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল। হোলি আর্টিজান হামলা দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম নৃশংস সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে বিবেচিত হয়।

আরো