মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৬, ৯:৪১ অপরাহ্ণ

রাজস্ব প্রশাসনে বিনিয়োগ ব্যয় নয়, সর্বোচ্চ প্রতিদান: এনবিআর চেয়ারম্যান

রাজস্ব প্রশাসনে করা বিনিয়োগ কোনো ধরনের ব্যয় নয়, বরং সর্বোচ্চ প্রতিদান দিতে পারে এমন একটি বিনিয়োগ বলে মনে করেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব।

মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত ‘রাজস্ব সম্মেলন-২০২৬’-এ তিনি এসব কথা বলেন।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর উপস্থিত ছিলেন।

​এনবিআরের কর্মকর্তাদের সীমিত লজিস্টিকস নিয়ে আহসান হাবিব বলেন, রাজস্ব প্রশাসনে বিনিয়োগ প্রকৃত অর্থে রাষ্ট্রের ব্যয় নয়; এটি সর্বোচ্চ প্রতিদান দিতে পারে এমন একটি বিনিয়োগ। এনবিআরের দৃষ্টিতে সব করদাতা সমান। করসেবা গ্রহণ সহজ করা হবে। আইনের পরিবর্তন হবে পূর্বানুমানযোগ্য এবং অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। সামগ্রিক অটোমেশনের মাধ্যমে আইনের প্রতিপালন নিশ্চিত করা হবে এবং রাজস্ব প্রশাসনকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করা হবে।

ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এনবিআরের ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রায় ৪৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন। এটি বড় চ্যালেঞ্জ হলেও দেশের প্রয়োজনেই এ চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছে এনবিআর।

আহসান হাবিব বলেন, ক্ষমতায় আসার পরপরই সরকার রাজস্ব আহরণ বাড়াতে এনবিআরে তিনটি টাস্কফোর্স গঠন করেছে। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ চার মাস বর্তমান সরকারের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়েছে। এ সময়ে এনবিআর এ যাবৎকালের শেষ প্রান্তিকে সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায় করেছে। গত পাঁচ দশকে দেশের রাজস্ব প্রায় আড়াই হাজার গুণ বেড়েছে। একই সময়ে রাজস্ব আহরণের কাঠামোতেও বড় ধরনের রূপান্তর ঘটেছে। ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে আমদানি শুল্ক থেকে মোট রাজস্বের ৫৫ শতাংশ আসতো। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে ২৭ শতাংশে নেমেছে। এর অর্থ হচ্ছে, বাংলাদেশ উৎপাদনমুখী শিল্পযাত্রায় এগিয়ে যাচ্ছে।

বর্তমানে আয়কর ও ভ্যাট মিলে মোট রাজস্বের ৭৩ শতাংশ জোগান দিচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, অভ্যন্তরীণ সম্পদনির্ভর অর্থনীতির দিকে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে।২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে ১২ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। আগের অর্থবছরে এ প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ২ দশমিক ৫ শতাংশ। প্রবৃদ্ধির মন্থরতা কাটিয়ে এটি রাজস্ব আহরণে একটি সুস্পষ্ট পুনরুদ্ধার।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে উৎসে আয়কর কর্তনকে মূল এনবিআর চালিকাশক্তি হিসেবে দেখছে বলে জানান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান।

তিনি আরও বলেন, নতুন খাতসহ উৎসে কর কর্তনে মাঠপর্যায়ে কঠোর মনিটরিং, সঠিক নীতির সময়বদ্ধ বাস্তবায়ন এবং নিয়মিত তদারকি করা হবে। পণ্য রপ্তানি, খুচরা বিক্রেতার কাছে পণ্য বিক্রি, জুয়েলারি ব্যবসা, সম্পত্তি হস্তান্তর ও লভ্যাংশ আয়ের মতো খাতে রাজস্ব বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।

অগ্রিম ও বকেয়া কর আদায়ে কর অঞ্চলগুলোতে মাসভিত্তিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে নিয়মিত মনিটরিং করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, কর ফাঁকি শনাক্তে ‘ট্র্যাক অ্যান্ড ট্রেস’ কৌশল ব্যবহার করা হবে। অনিবাসী করদাতাদের কর ফাঁকিও তদারকি করা হবে। এ ছাড়া বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) দ্রুত সম্পন্ন, আদালতে বিচারাধীন উচ্চ রাজস্বের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি এবং অডিট নিষ্পত্তির গতি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

ভ্যাট খাতে ভ্যাট জাল বাড়ানো, নিয়মিত রিটার্ন দাখিলের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং নতুন ভ্যাটদাতা শনাক্ত করার পরিকল্পনা তুলে ধরে আহসান হাবিব বলেন, সিগারেট ও তামাকজাত পণ্যে ট্র্যাক অ্যান্ড ট্রেস পদ্ধতি গ্রহণ করা হবে। একই সঙ্গে ভ্যাটসংক্রান্ত মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হবে। শুল্ক খাতে যথাযথ শুল্কায়ন ও পণ্য দ্রুত খালাস, বকেয়া আদায় ও মামলা নিষ্পত্তি, বন্ডের অপব্যবহার রোধ এবং সব ধরনের চোরাচালান প্রতিরোধে গোয়েন্দা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করা হবে। পাশাপাশি নিলাম কার্যক্রমের গতি বাড়ানো হবে।

ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, দেশের অর্থনীতির বড় অংশ এখনো নগদনির্ভর ও অনানুষ্ঠানিক। ব্যবসায়িক লেনদেনেরও বড় অংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক। সাপ্লাই চেইনের অপর্যাপ্ত ডিজিটাইজেশন এবং বিভিন্ন ব্যবস্থার মধ্যে আন্তঃসংযোগের ঘাটতি রয়েছে। একই সঙ্গে এনবিআরের অটোমেশনও এখনো পূর্ণতা পায়নি।

‘কর-জিডিপি অনুপাত কম, বিনিয়োগও কম’

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে এনবিআর সদস্য (ভ্যাট বাস্তবায়ন ও আইটি বিভাগ) সৈয়দ মুসফিকুর রহমান বলেন, গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতি ব্যাপক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। অর্থনীতি আগের তুলনায় অনেক বড় ও বহুমাত্রিক হয়েছে। টেকসই উন্নয়নের জন্য শুধু পুঁজি বা প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানও গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত বিশ্বের সর্বনিম্নগুলোর একটি। এটি স্পষ্ট করে যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে এখনো ব্যর্থতা রয়েছে। রাজস্ব প্রশাসনকে একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার চেষ্টা চলছে। ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশনের মাধ্যমে করদাতাদের অধিকাংশ সেবা অনলাইনে নিয়ে আসা হয়েছে।

সৈয়দ মুসফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত যেমন কম, তেমনি কর আদায়ে বিনিয়োগের পরিমাণও আঞ্চলিক দেশগুলোর তুলনায় কম। প্রতি ১০০ টাকা রাজস্ব আদায়ে এনবিআর মাত্র ২১ পয়সা খরচ করে। রাজস্ব বোর্ডের কার্যক্রম উন্নয়নে প্রয়োজনীয় ব্যয় ভালো বিনিয়োগ।

আরো