শনিবার, ২২ আগস্ট, ২০২৬, ৪:৪২ অপরাহ্ণ

মূল্যস্ফীতি-দারিদ্র্যের চাপে অর্থনীতি: ডিসিসিআই

বিডি মেইল ডেস্ক

উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও দারিদ্র্যের চাপের পাশাপাশি বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের ধীরগতি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে বলে মনে করছেন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকিন আহমেদ।

তিনি বলেন, সরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ যেখানে প্রায় ২৬ শতাংশ, সেখানে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি মাত্র ৫ শতাংশ- যা বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে এবং দারিদ্র্যের হার সাড়ে ২১ শতাংশে পৌঁছানোয় অর্থনীতির ওপর বহুমুখী চাপ তৈরি হয়েছে।

শনিবার (২২ আগস্ট) রাজধানীর মতিঝিলের ডিসিসিআই অডিটোরিয়ামে আয়োজিত ‘২০২৬ অর্থবছরের দ্বি-বার্ষিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি: প্রেক্ষিত রাজস্ব ও মুদ্রানীতি এবং বেসরকারিখাতের প্রত্যাশা’ শীর্ষক সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনে তিনি এসব কথা বলেন।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি- অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং বিশেষ অতিথি- পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআই) চেয়ারম্যান ড. জাইদি সাত্তার, ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি) বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান এবং পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ব্র্যাক চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান।

তাসকিন আহমেদ বলেন, ২০২৪ সালের লেবার ফোর্স সার্ভে অনুযায়ী দেশে বেকারত্বের হার ৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ। জুন ২০২৬-এ মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ, যা জুলাই ২০২৬-এ কমে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তবে সরবরাহ চেইনের বিপর্যয় এবং ফ্রেইট পাওয়ার দ্বিগুণ হওয়ার ফলে আমদানিকৃত পণ্যের ব্যয় অত্যধিক বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে স্থানীয় মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ অব্যাহত রয়েছে এবং দেশের বৈশ্বিক শিল্প সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

তিনি বলেন, দেশের দারিদ্র্যের হার ২০২২ সালের ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালে সাড়ে ২১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে ১২ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাওয়ার একটি আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, ২০২৬ সালের জন্য বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ১ শতাংশ প্রজেকশন করা হয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনীতির এ পরিস্থিতির মধ্যেই সরবরাহ চেইনের বিপর্যয় ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও পড়ছে।

ঢাকা চেম্বারের সভাপতি বলেন, ২০২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে ব্যবসা-বাণিজ্য সহযোগীকরণে কিছু প্রশংসনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সম্পূর্ণ ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে একটি নতুন কোম্পানির রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করার সুযোগ রাখা হয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়াই ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত মুনাফা দেশে ফেরত পাঠানোর সুবিধা রাখা হয়েছে। রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে ১০টি নতুন খাতের জন্য নতুন শুল্কমুক্ত বন্ড সুবিধা প্রদান করা হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, বিনিয়োগ ও ব্যবসা সহজীকরণে মোট ১২৫টি সেবাকে ২৮টি ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত করে অনলাইনে নিয়ে আসার জন্য স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর চূড়ান্ত করা হয়েছে। বন্ড সুবিধা চামড়া, জুতা, চাউল ও হোম টেক্সটাইল খাতে তিন বছর পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হয়েছে।

এছাড়া সরকার বাণিজ্য কর ও ডিজিটাল সংস্কারে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। কর প্রশাসনে অনলাইন করপোরেট প্ল্যাটফর্ম, অটোমেটেড ফেসলেস রিফান্ড এবং রিস্ক-বেইজড ডিজিটাল অডিট সিলেকশন চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ডিজিটাল অর্থনীতির জন্য ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান আইডি এবং ওয়ান ডিজিটাল ওয়ালেট চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া এআইভিত্তিক সরকারি সেবা এবং দেশের ৯০ শতাংশ এলাকায় ফাইভ-জি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

এই ব্যবসায়ী নেতা আরো বলেন, ডিরেগুলেশনের মাধ্যমে একদিনের মধ্যে মুনাফা দেশে ফেরত পাঠানো, সাত দিনের মধ্যে ব্যবসার অনুমোদন এবং বিদেশি কোম্পানির ওয়ার্ক পারমিট দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য ৬ থেকে ১২ মাসের প্রফেশনাল অনুমোদনের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

তিনি বলেন, জাতীয় বাজেটের মোট আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা এবং রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকার ঋণ পরিশোধের ক্রমবর্ধমান ব্যয় সরকারকে আর্থিক সক্ষমতার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।

তিনি আরো বলেন, ট্যাক্স ও জিডিপি রেশিও কম হওয়ার কারণে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন আরও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ অবস্থায় ঢাকা চেম্বারের পক্ষ থেকে দেশীয় ব্যাংক ঋণনির্ভরতা কমিয়ে স্বল্প সুদে বৈদেশিক ঋণ ও নন-ব্যাংক ফাইন্যান্সকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ২০৩৫ সালের মধ্যে ট্যাক্স-টু-জিডিপি রেশিও ১৫ শতাংশে উন্নীত করার সুপারিশ করা হয়েছে।

ডিসিসিআই সভাপতি বলেন, বর্তমান মুদ্রানীতিতে পলিসি রেট ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়েছে। সরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি প্রায় ২৬ শতাংশ হলেও বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৫ শতাংশ। বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য এটি উদ্বেগের বিষয়।

তিনি বলেন, বর্তমান মূল্যস্ফীতির হার ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত ৪ শতাংশ স্প্রেড বিশেষ করে সিএসএমই খাতে ঋণ বিতরণে ব্যাংকগুলোর আগ্রহ কমিয়ে দিতে পারে। এ অবস্থায় ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে সরকারি ঋণ গ্রহণ সীমিত করে বেসরকারি খাতের জন্য পর্যাপ্ত ঋণপ্রবাহ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, উচ্চ সুদের হার এবং সরকারের ব্যাংক ঋণের ওপর অধিক নির্ভরশীলতার কারণে বেসরকারি খাতে পর্যাপ্ত ঋণপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পুঁজিবাজারে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও অর্থায়নের বিকল্প উৎস এখনো পর্যাপ্তভাবে গড়ে ওঠেনি। ব্যাংকনির্ভর অর্থায়নের ওপর নির্ভরতা কমাতে করপোরেট বন্ড ও সুকুকের বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো উচিত।

তাসকিন আহমেদ আরো বলেন, বাংলাদেশের লজিস্টিক ব্যয় এখনো জিডিপির ১৫ থেকে ২০ শতাংশ, যেখানে উন্নত অর্থনীতিতে এর হার ৮ থেকে ১০ শতাংশ। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

তিনি মনে করেন, এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশ শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা এবং সহজ শর্তে উন্নয়ন সহায়তা হারাবে। এলডিসি উত্তরণের পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বেসরকারি খাতের ভূমিকা এখনো অস্পষ্ট। এ অবস্থায় এফটিএ ও পিটিএ চুক্তি স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার জরুরি বলে মনে করেন তিনি।

আরো