রবিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৬, ২:৫৫ পূর্বাহ্ণ

মার্কেন্টাইল ব্যাংকে শতকোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ, তদন্তে বাংলাদেশ ব্যাংক

মার্কেন্টাইল ব্যাংক পিএলসিতে শতকোটি টাকার অনিয়ম, জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। ব্যাংকটির কয়েকজন পরিচালক, ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি), উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি), প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা (সিএফও)সহ একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষ পরিদর্শন চালিয়ে একটি প্রতিবেদনও দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন অভিযুক্ত অনিয়মের বিষয়ে ব্যাংকের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সন্তোষজনক ব্যাখ্যা না পাওয়া গেলে বিধিসম্মত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
সম্প্রতি মার্কেন্টাইল ব্যাংকে পাঠানো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নথিপত্র থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২১ সালে পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর মোহাম্মদ আব্দুল আওয়াল ব্যাংকের বিভিন্ন ক্রয় কার্যক্রম ও করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) খাতের অর্থ ব্যবহারে অনিয়ম করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। কম্বল কেনার নামে প্রায় ১১০ কোটি টাকা এবং ব্যবসা উন্নয়ন খাতে ডায়েরি ও ক্যালেন্ডার কেনার নামে ৭৭ কোটি ৩৪ লাখ টাকা ব্যয়সহ মোট প্রায় ১৮৭ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করেছে পরিদর্শক দল।

অন্যদিকে ব্যাংকের সাবেক প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা (সিএফও) তাপস চন্দ্র পালের বিরুদ্ধেও আর্থিক বিবরণীতে কারসাজি ও কর্মীদের বিভিন্ন তহবিল ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পেশাগত সনদ না থাকার পরও দীর্ঘদিন ফিন্যান্সিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ডিভিশন ও সিএফও অফিসে দায়িত্ব পালনের সুযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি আর্থিক বিবরণীতে কারসাজি করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অভিযোগ রয়েছে, কর্মীদের গ্র্যাচুইটি, প্রভিডেন্ট ফান্ড ও কল্যাণ তহবিলের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংরক্ষণ না করেই আর্থিক বিবরণী প্রস্তুত করা হয়েছে। এতে অবসরপ্রাপ্ত ও চাকরি ছেড়ে দেওয়া অনেক কর্মী দীর্ঘদিন ধরে তাদের প্রাপ্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিদর্শন প্রতিবেদনে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, সিএসআর, বিশেষ সিএসআর এবং বিভিন্ন ক্রয় খাতের অর্থ ডায়েরি, ক্যালেন্ডার, কম্বল, ল্যাপটপ, কম্পিউটার, সফটওয়্যার ও আসবাবপত্র কেনার নামে প্রভাবশালী পরিচালক ও রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরোক্ষ আর্থিক সুবিধা দিতে ব্যবহার করা হয়েছে।

কম্বল কেনায় বড় অঙ্কের অনিয়মের অভিযোগ
ব্যাংকের নথি ও পরিদর্শন প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সিএসআর তহবিলের আওতায় প্রায় ১১০ কোটি টাকার কম্বল কেনা দেখানো হয়। এর মধ্যে কমপক্ষে ৮৮ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ব্যাংকের চেয়ারম্যানসহ সাত পরিচালকের সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে।

এ ছাড়া বোর্ড ও নির্বাহী কমিটির সভায় ভুয়া বিলের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এমডি মতিউল হাসানের বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, কোম্পানি সেক্রেটারি মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম শুহিনের সহযোগিতায় প্রতি বোর্ড ও নির্বাহী কমিটির সভায় নির্ধারিত ৮ হাজার টাকার পরিবর্তে ১ লাখ টাকা করে ফি নেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে একটি সাসপেন্স হিসাব ব্যবহারের কথাও নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

টেন্ডার ছাড়াই কার্যাদেশ দেওয়ার অভিযোগ
নিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নয়নের নামে স্বচ্ছ টেন্ডার প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে প্রায় ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকার কার্যাদেশ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এ ঘটনায় এমডি মতিউল হাসানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী প্রকৌশলী মো. রেজা হোসেনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগের বিরোধিতা করায় ব্যাংকের ডিএমডি আদিল রাইহানকে অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। একই ঘটনায় আইটি বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ মাহমুদ হাসানকে ভয়ভীতি দেখিয়ে অনিয়মে সহযোগিতা করতে বাধ্য করার অভিযোগও রয়েছে।

আরেকটি ঘটনায়, ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুসরণ না করে একটি সফটওয়্যার ল্যাবকে ৮ লাখ ৪০ হাজার টাকার কার্যাদেশ দেওয়ার পর পরবর্তী সময়ে রেইনবো অ্যারের অনুকূলে কারওয়ান বাজার শাখার মাধ্যমে ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রেও এমডি মতিউল হাসান ও প্রকৌশলী রেজা হোসেনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।

দ্রুত পদোন্নতির অভিযোগ
তাপস চন্দ্র পাল রূপালী ব্যাংকে কর্মজীবন শুরু করে পরে মার্কেন্টাইল ব্যাংকে জুনিয়র অফিসার হিসেবে যোগ দেন। এরপর ধারাবাহিকভাবে পদোন্নতি পেয়ে ২০১৮ সালে ভাইস প্রেসিডেন্ট (ভিপি), ২০২১ সালে সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট (এসভিপি), ২০২২ সালে এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট (ইভিপি) এবং ২০২৪ সালে সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট (এসইভিপি) হন। ২০২৬ সালে তিনি ডিএমডি পদে পদোন্নতি পান।

অভিযোগ রয়েছে, পরিচালকদের আর্থিক সুবিধা দেওয়ার বিনিময়ে তার পদোন্নতি হয়েছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

যা বলছে মার্কেন্টাইল ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংক
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের মুখপাত্র আশিম কুমার শাহ বলেন, বিষয়গুলো সম্পর্কে তার কাছে তাৎক্ষণিক কোনো তথ্য নেই। ব্যাংকের কোন বিভাগ বিষয়টি দেখছে তা জেনে পরে এ বিষয়ে জানাবেন বলে তিনি জানান।
মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মতিউল হাসানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, পরিদর্শনে কোনো অনিয়ম উঠে এলে নিয়ম অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। মার্কেন্টাইল ব্যাংকের কাছেও ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, সন্তোষজনক ব্যাখ্যা না পাওয়া গেলে বিধিসম্মত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে বিষয়গুলো উঠে আসায় এগুলো এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। ব্যাংকের দেওয়া ব্যাখ্যা পর্যালোচনা করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আরো