সোমবার, ২ নভেম্বর, ২০২৬, ১১:১৫ অপরাহ্ণ

ফল খেয়ে জল পান না করা, প্রচলিত ভুল নাকি বৈজ্ঞানিক সত্যতা ?

মেহেদী হাসান কাজল

ফল খাওয়ার পর জল পান করতে নিষেধ করা হয় কিন্তু কেন ? বিষয়টি কেবল প্রচলিত ভুল ধারণা নাকি এর পেছনে বৈজ্ঞানিক সত্যতা আছে। ‘ফল খেয়ে জল খেয়ো না’ প্রচলিত কথাটি আপনিও হয়তো নিশ্চয়ই শুনেছেন। আসুন বিস্তারিত জানার চেষ্টা করি ……

ফল কি ?

উদ্ভিদবিজ্ঞানের ভাষায় ফল বলতে বোঝায়, সপুষ্পক উদ্ভিদের পরিপক্ব ডিম্বাশয়, যার মধ্যে এক বা একাধিক বীজ থাকে।

সাধারণভাবে, ফল হচ্ছে মিষ্টি স্বাদযুক্ত, রসালো মজ্জাময় পরিণত ডিম্বাশয়। যেমন: কাঁঠাল, কলা, আম, পেঁপে, আপেল, কমলা, স্ট্রবেরি, তরমুজ, লেবু, জাম্বুরা, ইত্যাদি।

ফলে উপস্থিত বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান :

অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট( ফ্ল্যাভোনয়েড, পলিফেনল ও ক্যারোটিনয়েড জাতীয় রাসায়নিক উপাদান ), জৈব এসিড( সাইট্রিক এসিড, ম্যালিক এসিড, টারটারিক এসিড ), পানি ( ৮৫ থেকে ৯০%)

ফলে উপস্থিত পুষ্টি উপাদানের মধ্যে রয়েছে :

শর্করা ( গ্লুকোজ, ফ্রুক্টোজ, সুক্রোজ ), খাদ্য আঁশ বা ফাইবার ( পেকটিন ও সেলুলোজ ), ভিটামিন ( ভিটামিন-এ, বি, বি-৬, সি, ই, কে, ইত্যাদি ), খনিজ/মিনারেল (সোডিয়াম, পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ফসফরাস, আয়রন ইত্যাদি ), কিছু ফলে সামান্য মাত্রায় আমিষ ও চর্বি বিদ্যমান।

ফলে উপস্থিত শতকরা ৯০ শতাংশ পানি শরীরকে হাইড্রেট রাখতে সহায়তা করে। অ্যান্টি অক্সিডেন্ট শরীরের কোষকে ফ্রি – র‍্যাডিকেল এর ক্ষতি হতে রক্ষা করে। জৈব এসিড শরীরের হজম শক্তি বৃদ্ধি করে। শর্করা তাৎক্ষণিক শক্তি সরবারহ করে। এছাড়াও ভিটামিন সমূহ বিপাকীয় ক্রিয়ায় সহায়তা করে।

“ ফল খেয়ে জল পান ” প্রচলিত ভুল ধারণা নাকি বৈজ্ঞানিক সত্যতা :

ফল এবং জল (পানি) একসাথে গ্রহণ করলে কি হবে ? কোনো স্বাস্থ্য ঝুঁকি হওয়ার সম্ভাবনা আছে কি ? নাকি ‘ফল খেয়ে জল পান’ সম্পূর্ণ বিষয়টি প্রচলিত ভুল ধারণা ?

শুরুতেই আমাদের জেনে রাখা উচিত খাদ্য পরিপাক সম্পর্কে৷ যে জৈবরাসায়নিক প্রক্রিয়ায় জটিল ও দেহকোষে অদ্রবণীয় খাদ্যবস্তু যান্ত্রিক ও রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় ভেঙ্গে সরল, তরল, দেহকোষে দ্রবণীয় ও শোষণ উপযোগী উপাদানে পরিণত হয়, সেই জৈবরাসায়নিক প্রক্রিয়াকে পরিপাক বলা হয়।

পরিপাক প্রক্রিয়ার শুরু মুখবিবর হতে, এখানে বড় খাদ্যবস্তু যান্ত্রিকভাবে পিষ্ট হয়ে ছোট ছোট বোলাস/মন্ড-এ পরিণত হয় এবং একই সাথে লালা মিশ্রিত হয়। উল্লেখ্য লালার শতকরা ৯৯ ভাগই পানি, সাথে থাকে অ্যামাইলেজ ও টায়ালিন এনজাইম। এই এনজাইম শর্করা জাতীয় খাদ্য পরিপাকে সাহায্য করে। অর্থাৎ, ফলে থাকা শর্করা জাতীয় খাদ্য (গ্লুকোজ ও ফ্রুক্টোজ) মুখবিবরেই লালা মিশ্রিত এনজাইমের সাহায্যে পরিপাক শুরু হয়। গ্ুকোজ ও ফ্রুক্টোজ সরাসরি দেহকোষে শোষণ উপযোগী হওয়ায় অতিরিক্ত পানির প্রয়োজন হয় না। লালারসের ৯৯ ভাগ পানি, অতিরিক্ত পানি পান করলে লালারসের এনজাইমের ঘনত্ব হালকা হয়ে যাওয়ার বৈজ্ঞানিক সত্যতা না থাকলেও, ফল জাতীয় খাবার পরিপাকে অতিরিক্ত পানির প্রয়োজনীয়তা বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ হতে পাওয়া যায় না ।

বৈজ্ঞানিকভাবে ফল খাওয়ার পর জল পান করা নিরাপদ নয়। কেননা, ফল অতিরিক্ত রসালো এবং অধিকাংশ ফলে শতকরা ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশই পানি থাকে। তাই স্বাভাবিকভাবেই ফলের সাথে জল পান করা উচিত নয়। এর ফলে পরিপাক বা হজম প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

পাকস্থলীর গ্যাস্ট্রিক গ্রন্থি হতে নিঃসৃত হয় পাচকরস বা গ্যাস্ট্রিক রস। পাচকরসে থাকে শতকরা ৯৯.৫ ভাগ পানি এছাড়াও থাকে হাইড্রোক্লোরিক এসিড, পেপসিন, মিউকাস, বাই-কার্বোনেট ও ইলেক্ট্রোলাইট।

ফল খাওয়ার পরপরই পানি পান করলে প্রথমত, পাকস্থলীর পাচকরসে থাকা হাইড্রোক্লোরিক এসিডের ঘনমাত্রা হালকা হয়ে যায় ও এসিডের কার্যক্ষমতা কমে গিয়ে পরিপাকে ব্যাঘাত ঘটে।

কিছু কিছু ফলে ( যেমন: কাঁঠাল, পেয়ারা, ইত্যাদি ) প্রচুর পরিমাণে চিনি ও ঈস্ট থকে। ফল খাওয়ার সাথে কিংবা পরপরই পানি পান করলে পাকস্থলীতে এমন একধরনের পরিবেশ তৈরি হয়, যেখানে ঈস্ট বংশবৃদ্ধি করতে পারে। এমতাবস্থায় পাকস্থলীতে কার্বন ডাই-অক্সাইড ও অ্যালকোহল তৈরি হয়, যা পাকস্থলীতে গ্যাস তৈরি করে। American College of Gastoenterlogy-র গবেষণামতে, উক্ত গ্যাস পেট ফাঁপা ( Bloating ) এবং পেট ব্যাথার ( Abdominal cramps) কারণ হতে পারে।

ফল খাওয়ার পর পানি পান করলে পাকস্থলীর pH মাত্রার তারতম্য ঘটে। বিশেষ করে সাইট্রাস জাতীয় (কমলা, আঙুর, লেবু, জাম্বুরা ইত্যাদি) ফলে জৈব এসিড বেশি থাকায়, এসকল ফল খওায়ার পর তৎক্ষনাৎ পানি করা নিরাপদ নয়। ফলে উপস্থিত জৈব এসিডসমূহের স্বাভবিক ঘনমাত্রা হ্রাস( Dilution) পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। পুষ্টিবিদদের মতে, পাকস্থলির pH মানেের তারতম্যের কারণে, স্বাভাবিক পরিপাক ও শোষন ব্যাহত হয়।

ফল খাওয়ার পর পানি পান করলে স্বাভাবিক পরিপাক প্রক্রিয়া ব্যাহত হয় ও প্রচুর পরিমান খাদ্যের অপাচ্য অংশ অবশিষ্ট রয়ে যায়। ফলাফল হিসেবে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে গিয়ে ডায়াবেটিসের কারণও হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ( World Health Organisation – WHO ) এর মতে, ডায়াবেটিস (Diabetes) দীর্ঘমেয়াদী হলে কিডনি বিকল ( (Kedney Failure ), অন্ধত্ব (Blindness) ও হার্ট অ্যাটাক (Heart Attack) এর কারণ হতে পারে।

অধিকাংশ ফলে পানির পরিমাণ স্বাভাবিকভাবেই বেশি থাকে। অতিরিক্ত পানি পান করলে মানব শরীরে পানির ভারসাম্য নষ্ট হয়ে, অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

পুষ্টিবিদদের মতে, ফল খাওয়ার অন্তত ৩০ থেকে ৪০ মিনিট পর, পানি পান করা উচিত।

ফল খেয়ে তৎক্ষণাৎ জল পান হতে বিরত থাকাই নিরাপদ। তবে গলা ভেজানো, গলায় খাবার আটকে যাওয়া ইত্যাদি কারণে ফলের সাথে অথবা ফল খাওয়ার পরে সামান্য জল পানে ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা নেই৷

অর্থাৎ, ফল খেয়ে জল পান না করা বিষয়টি প্রচলিত ভুল ধারণা নয় বরং এটি বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে সঠিক। তাই, ফল খেয়ে অতিরিক্ত জল পান হতে বিরত থাকুন, স্বাস্থ্য ঝুঁকি এড়িয়ে চলুন, নিরাপদ থাকুন।

আরো