Tuesday, 28 July, 2026, 5:26 am

কারচিহ্নের অপপ্রয়োগে উচ্চারণ বিকৃতি’—সমাধানের পথ দেখালেন গবেষক শাহ সীদদীক

শহিদুল ইসলাম খোকন

বাংলা ভাষার বানান, উচ্চারণ ও প্রমিত রূপ নিয়ে দীর্ঘদিনের অচলায়তন ভাঙার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে রাজধানীর বাংলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত হলো *বাংলা বানান সংস্কার* শীর্ষক এক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সভা। ভাষার প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে নতুন করে আলোচনার দুয়ার খুলে দেওয়া এই আয়োজনটি বাংলা ভাষা উন্নয়ন পরিষদ ও পূর্ণিমা বাসরের যৌথ উদ্যোগে বাংলা একাডেমির কবি আল মাহমুদ লেখক কর্নারে অনুষ্ঠিত হয়।

সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলা একাডেমির সভাপতি, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও চিন্তক অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। ভাষা গবেষণা ও সংস্কার নিয়ে দীর্ঘদিনের নীরবতা ভাঙার এই উদ্যোগকে তিনি সময়োপযোগী ও সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

মূল প্রবন্ধে বানান সংকটের শিকড় উন্মোচন*
আলোচনা সভার মূল আকর্ষণ ছিল বিশিষ্ট ভাষাগবেষক ও কবি শাহ সীদদীক-এর প্রবন্ধ উপস্থাপন।
বাংলা বানানে কারচিহ্নের অপপ্রয়োগজনিত উচ্চারণ বিকৃতি সমস্যা-স্বরূপ ও সমাধান’ শীর্ষক প্রবন্ধে তিনি বাংলা বানানের অন্তর্নিহিত অসংগতি, অদৃশ্য ধ্বনি যুক্তাক্ষরের জটিলতা এবং কারচিহ্নের অপপ্রয়োগের ফলে সৃষ্ট উচ্চারণ বিভ্রান্তির বিশ্লেষণ তুলে ধরেন।

প্রবন্ধে তিনি দেখান—কীভাবে প্রমিত বানানের নামে শিক্ষার্থী, পাঠক ও ভাষাভাষীরা প্রতিনিয়ত দ্বিধা ও ভুল উচ্চারণে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে, যা বাংলা ভাষার স্বাভাবিক প্রবাহ ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতাকে বাধাগ্রস্ত করছে।

বিশিষ্টজনদের অংশগ্রহণে গভীর আলোচনা
জাতীয় সাহিত্য-সাংস্কৃতিক ঐক্যজোটের সভাপতি রেজাবুদ্দৌলা চৌধুরী-এর সভাপতিত্বে আয়োজিত সভায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন বাংলাভাষা উন্নয়ন পরিষদের আহ্বায়ক,লেখক-সাংবাদিক মঈন মাহমুদ। তিনি বলেন,বাংলা বানান ও উচ্চারণ সংকট নতুন নয়। যুগে যুগে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা ছিল খণ্ডিত ও অসম্পূর্ণ। এখন প্রয়োজন সাহসী ও সমন্বিত প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ।
মূখ্য আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির বাংলা বিভাগের খণ্ডকালীন শিক্ষক ড. নূর মোহাম্মদ মল্লিক। তিনি বলেন,বাংলা ভাষা আজ শিক্ষার্থীদের কাছে ভীতিকর বিষয়ে পরিণত হয়েছে। পরীক্ষায় সবচেয়ে কম নম্বর আসে বাংলায়। এর অন্যতম কারণ বানান ও উচ্চারণের জটিলতা। এই সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন সময়ের দাবি।
*প্রকাশনা, আবৃত্তি ও গবেষণার অভিজ্ঞতা-*
উষার দুয়ার প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের সত্ত্বাধিকারী কবি *কাব্য সুলতানা* বলেন, গবেষক শাহ সীদদীক রচিত এবং তাদের প্রকাশিত গ্রন্থ বাংলা বানানে অদৃশ্য অধ্বনির পুনর্বিন্যাস ও যুক্তাক্ষর সমস্যার সমাধান প্রকাশের পর বাংলা বানান নিয়ে নতুন করে আগ্রহ ও আলোচনা শুরু হয়েছে।

আবৃত্তিশিল্পী ও গবেষক জাহান বশীর বলেন,
বাংলা বানানের সমস্যার কারণে আবৃত্তি ও উচ্চারণেও বড় ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হয়। আমরা সমস্যা চিহ্নিত করেছি, কিন্তু বিশ্লেষণ ও সমাধানের কোনো অভিভাবক প্রতিষ্ঠান নেই—এটাই সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য।

এছাড়াও বক্তব্য রাখেন—জিয়া সংসদের সভাপতি সৈয়দ নাজমুল আহসান, সাবেক সংসদ সদস্য মো. শফিকুল ইসলাম, বাংলা একাডেমির কর্মকর্তা শাহ মো. মনিরুজ্জামান, কবি গোলাম মোস্তফা তাপসসহ আরও অনেকে।

বাংলা একাডেমির প্রতি প্রত্যাশা

প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেন,ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, এনামুল হক, ড. মুনীর চৌধুরীদের পর দীর্ঘদিন কেউ বাংলা ভাষার সংস্কার নিয়ে সাহসী গবেষণা করেননি। শাহ সীদদীক যে দায়িত্ববোধ ও সাহসিকতা দেখিয়েছেন, তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।
সভাপতির বক্তব্যে রেজাবুদ্দৌলা চৌধুরী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,বাংলা বানানে এত সমস্যা থাকা সত্ত্বেও বাংলা একাডেমি এতদিন কেন কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি—এ প্রশ্ন জাতির।
তিনি বাংলা একাডেমিকে বাংলা বানান সংস্কার প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ ও বাস্তবায়নের আহ্বান জানান।
সভা সঞ্চালনা অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ভাষা আন্দোলনের সংগঠক ডা. মো. মোক্তাদির।

এই আলোচনা সভা প্রমাণ করেছে—
বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ রক্ষায় বানান সংস্কার আর বিলাসিতা নয়, এটি এখন সময়ের দাবি। গবেষণা, প্রকাশনা ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ একসূত্রে গাঁথা না গেলে বাংলা ভাষা বিশ্বায়নের দৌড়ে পিছিয়ে পড়বে—এই সতর্কবার্তাই উঠে এসেছে আলোচনার প্রতিটি স্তরে।

আরো