বিদ্যুৎ খাতে ঘনীভূত সংকট, এক বছরে বিপিডিবির লোকসান বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ
দেশের বিদ্যুৎ খাতে আর্থিক সংকট ক্রমেই তীব্র আকার ধারণ করছে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার দেড় বছর পার হলেও এই খাতে কাঙ্ক্ষিত স্বস্তি আসেনি। বরং সরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়া এবং বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরতা বাড়ার ফলে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) লোকসান নজিরবিহীনভাবে বেড়েছে।
সদ্যসমাপ্ত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিপিডিবির নিট লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ২১ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৮ হাজার ৭৬৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে লোকসান বেড়েছে প্রায় ৯৪ শতাংশ।
ভর্তুকি দিয়েও সামাল দেওয়া যায়নি ক্ষতি
২০২৪ সালের মাঝামাঝি রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর বিদ্যুৎ খাতে বিপুল দায়দেনা নিয়ে দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। সেই চাপ কমাতে গত অর্থবছরে আগের বকেয়া মিলিয়ে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হয়। বিদ্যুৎ খাতে ব্যয় কমানো, বিশেষ আইন বাতিল, সরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন বাড়ানো এবং বিদ্যুৎ ক্রয়মূল্য পুনঃআলোচনার মতো নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তবে আর্থিক চিত্রের খুব একটা উন্নতি হয়নি।
উল্টো বিদ্যুতের গড় উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে, পাশাপাশি সঞ্চালন ও বিতরণ পর্যায়ে সিস্টেম লস কমার বদলে বেড়েছে।
ব্যয় ও আয়ের ব্যবধান
২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদ্যুৎ সরবরাহে বিপিডিবির মোট ব্যয় দাঁড়ায় ১ লাখ ২১ হাজার ৪২০ কোটি টাকা। বিপরীতে বিদ্যুৎ বিক্রি করে সংস্থাটির আয় হয়েছে ৬৯ হাজার ৩৮৩ কোটি টাকা। ঘাটতি সামাল দিতে অর্থ বিভাগ থেকে ৩৮ হাজার ৬৩৬ কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হলেও বছর শেষে বড় অঙ্কের লোকসান এড়ানো যায়নি।
বেসরকারি বিদ্যুতে বাড়তি নির্ভরতা
বিশেষজ্ঞদের মতে, লোকসানের অন্যতম প্রধান কারণ হলো চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি, বিদ্যুৎ কেন্দ্র অলস রেখেও ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ এবং ব্যয়বহুল বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ক্রয়।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র (আইপিপি) থেকে বিদ্যুৎ কিনতে ব্যয় হয়েছে ৭২ হাজার ৭১ কোটি টাকা—যা আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১৪ হাজার ৭০০ কোটি টাকা বেশি। অথচ জাতীয় বাজেটে এই খাতে ব্যয় ধরা হয়েছিল অনেক কম।
এই সময় আইপিপি থেকে কেনা হয়েছে ১ লাখ ৩০৯ মিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ, যেখানে প্রতি ইউনিটের গড় মূল্য দাঁড়িয়েছে ১৪ টাকা ৪৫ পয়সা। এর ফলে বিদ্যুতের সামগ্রিক গড় উৎপাদন ব্যয় বেড়ে হয়েছে ১২ টাকা ১০ পয়সা, যা আগের বছর ছিল ১১ টাকা ৩৫ পয়সা।
সিস্টেম লস কমেনি
বিদ্যুৎ খাত সংস্কারের অন্যতম লক্ষ্য ছিল সঞ্চালন ও বিতরণে সিস্টেম লস কমানো। তবে বাস্তবে সেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে যেখানে সিস্টেম লস ছিল ১০ দশমিক ৬ শতাংশ, সেখানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০ দশমিক ১৩ শতাংশে। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী আদর্শ সিস্টেম লস হওয়া উচিত প্রায় ৮ শতাংশ।
ভর্তুকির হিসাবেও অস্পষ্টতা
বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি কমিয়ে আনার কথা বললেও সরকারি বিভিন্ন সংস্থার হিসাবের মধ্যে রয়েছে বড় ধরনের গরমিল। বিপিডিবির হিসাবে ভর্তুকির অঙ্ক ৩৮ হাজার ৬৩৬ কোটি টাকা হলেও বিদ্যুৎ বিভাগের অন্য নথিতে এই অঙ্ক দেখানো হয়েছে প্রায় ৫৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকা।
সরকার গত এক বছরে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে প্রায় ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ বকেয়া পরিশোধের কথা জানিয়েছে। তবে একই সময়ে বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে নতুন করে বকেয়াও বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে।
জ্বালানির দাম কমলেও কেন ব্যয় বাড়ছে?
বিশ্ববাজারে বর্তমানে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম তুলনামূলকভাবে কম। ব্যারেলপ্রতি তেলের দাম নেমে এসেছে প্রায় ৬০ ডলারে, আর গ্যাসের দামও আগের তুলনায় নিম্নমুখী। তবুও বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বাড়ার সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারছেন না বিপিডিবির কর্মকর্তারা।
সংস্থাটির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, গ্যাস সংকটের কারণে সরকারি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র পুরো সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। ফলে বাধ্য হয়ে তেলভিত্তিক ও বেসরকারি কেন্দ্রের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যেখানে উৎপাদন ব্যয় ও ক্যাপাসিটি চার্জ দুটোই বেশি।
বিদ্যুৎ খাত বিশ্লেষকদের মতে, সাময়িক ভর্তুকি দিয়ে এই সংকট সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। প্রয়োজন কার্যকর কাঠামোগত সংস্কার—অপ্রয়োজনীয় উচ্চ ব্যয়সম্পন্ন কেন্দ্র পুনর্মূল্যায়ন, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি পুনঃআলোচনা, ক্যাপাসিটি চার্জ কমানো এবং বাস্তব চাহিদার ভিত্তিতে উৎপাদন পরিকল্পনা।
তাদের আশঙ্কা, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে বিদ্যুৎ খাতের লোকসান আরও বাড়বে এবং ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির ওপর চাপ আরও তীব্র হবে।