খুলনা-২ ও খুলনা-৩ আসনে মূল লড়াই বিএনপি–জামায়াত দোলাচলে ভোটাররা
নিজস্ব প্রতিবেদক
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬কে সামনে রেখে দেশজুড়ে রাজনৈতিক উত্তাপ ক্রমেই বাড়ছে। কাকডাকা ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত প্রার্থী ও তাদের সমর্থকেরা পাড়া-মহল্লা, হাট-বাজার ও অলিগলিতে ছুটে বেড়াচ্ছেন ভোটারদের দ্বারে দ্বারে। উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার নানা প্রতিশ্রুতিতে মুখর নির্বাচনী মাঠ। এই উৎসবমুখর পরিবেশ গণতন্ত্র নিয়ে নতুন প্রত্যাশাও তৈরি করছে।
এই প্রেক্ষাপটে খুলনার দুটি গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় আসন—খুলনা-২ ও খুলনা-৩—এবার নির্বাচনী রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। জন্মসূত্রে খুলনার মানুষ হওয়ায় এ অঞ্চলের মাটি ও মানুষের সঙ্গে আমার সম্পর্ক আবেগঘন। সেই অভিজ্ঞতা ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা থেকেই সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ অবস্থানে থেকে এই দুই আসনের রাজনৈতিক চিত্র, প্রার্থী ও ভোটারের মনোভাব নিয়ে কিছু পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা প্রয়োজন বলে মনে করি।
খুলনা-২: অভিজ্ঞতা বনাম নতুন প্রজন্ম
খুলনা মহানগরীর সোনাডাঙ্গা ও আশপাশের এলাকা নিয়ে গঠিত খুলনা-২ আসনে নির্বাচনী তৎপরতা দিন দিন বাড়ছে। মাঠপর্যায়ে ঘুরে দেখা যায়, এ আসনে মূল লড়াইয়ের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে এগিয়ে আছেন—
নজরুল ইসলাম মঞ্জু (বিএনপি)
এডভোকেট শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলাল (জামায়াতে ইসলামি)
আমানুল্লাহ (ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ)
ফরিদুল হক (এনসিপি)
মো. শাহিদুল ইসলাম (বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস)
অন্যান্য দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থী থাকলেও তাদের প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম।
বিএনপির প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু খুলনা অঞ্চলে পরিচিত ও অভিজ্ঞ রাজনীতিক। সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপির বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে তার দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা রয়েছে। তার সরল আচরণ ও ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা ভোটারদের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। গল্লামারি, শের-এ-বাংলা রোড, বনরগতি বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় পায়ে হেঁটে প্রচারণা চালাচ্ছেন তিনি। মঞ্জু বলেন, জননেতা তারেক রহমানের অঙ্গীকার বাস্তবায়নের মাধ্যমে একটি আধুনিক ও কল্যাণমূলক খুলনা গড়াই তার লক্ষ্য।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামির প্রার্থী এডভোকেট শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলাল তুলনামূলক তরুণ ও শিক্ষিত। একজন আইনজীবী হিসেবে তিনি এলাকার সমস্যা বোঝার সক্ষমতা রাখেন এবং মাঠে সক্রিয় প্রচারণা চালাচ্ছেন। তবে বয়স ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার ঘাটতির কারণে তার জনপ্রিয়তা মঞ্জুর মতো ব্যাপক নয়। এই আসনের ফল অনেকটাই নির্ভর করবে তরুণ ভোটার ও সুইং ভোটের ওপর।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মুফতী আমানুল্লাহ ‘হাতপাখা’ প্রতীক নিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন। তার উপস্থিতি জামায়াতের ভোটে কিছুটা হলেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে স্থানীয়দের ধারণা।
খুলনা-২ আসনের ভোটচিত্র
খুলনা জেলা নির্বাচন অফিসের তথ্য অনুযায়ী, এ আসনে মোট ভোটার ৩,৩১,৯৯৫ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১,৬৪,১২২ জন, নারী ১,৬৭,৮৬৩ জন ও হিজড়া ভোটার ১০ জন। মোট ভোটকেন্দ্র ১৫৭টি।
ইতিহাস বলছে, খুলনা-২ আসনে আওয়ামী লীগ চারবার জয়ী হলেও ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০৮ সালে বিএনপি এখানে বিজয় অর্জন করে। ২০০৮ সালে নজরুল ইসলাম মঞ্জু প্রায় ৯১ হাজার ভোট পেয়ে জয়ী হন।
খুলনা-৩: মাঠ দখলে বিএনপি, প্রতীকের লড়াইয়ে জামায়াত
দৌলতপুর, খালিশপুর ও খান জাহান আলী থানা নিয়ে গঠিত খুলনা-৩ আসনেও এবারের নির্বাচন অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। এখানে মোট প্রার্থী ৯ জন।
বিএনপির প্রার্থী হিসেবে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন রকিবুল ইসলাম বকুল। রাজনীতির শুরু থেকেই মানুষের পাশে থাকার কারণে তিনি এলাকায় পরিচিত মুখ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা এই নেতা মাঠপর্যায়ে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন। অনেকের মতে, স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের পূর্ণ সহযোগিতা পেলে তার জয় সম্ভাবনাময়।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামির প্রার্থী মাহফুজুর রহমান ব্যক্তিগতভাবে সৎ ও ভদ্র হলেও মাঠের প্রচারণায় পিছিয়ে রয়েছেন। ফলে অনেক ভোটার এখনো তাকে ব্যক্তিগতভাবে চেনেন না। এই আসনে ভোট অনেকটাই প্রতীকের ওপর নির্ভর করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. আওয়াল প্রার্থী হওয়ায় জামায়াতের ভোটে কিছুটা ভাঙন ধরতে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মত।
খুলনা-৩ আসনে মোট ভোটার ২,৫৪,৪০৯ জন (২০২৫ সালের ভোটার তালিকা অনুযায়ী)। এই আসনের নির্বাচনী ইতিহাসে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জয় রয়েছে।
ভোটারের দোলাচল ও গণতান্ত্রিক চেতনা
খুলনা-২ ও খুলনা-৩—দুটি আসনেই এবার মূল লড়াই বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামির মধ্যে হবে বলে ভোটার ও পর্যবেক্ষকদের ধারণা। তবে ভোটারদের মধ্যে স্পষ্ট দোলাচল রয়েছে। অনেকেই বলছেন, দল বা প্রতীক নয়—যোগ্যতা, সততা, অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিবেচনায় নিয়েই ভোট দেওয়া উচিত।
গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এখানেই—ভোটারই শেষ কথা বলবে। সব মিলিয়ে খুলনার এই দুই আসনে এবারের নির্বাচন যে জমজমাট ও গুরুত্বপূর্ণ হতে যাচ্ছে, তা বলাই বাহুল্য।