শনিবার, ২ মে, ২০২৬, ১২:৫৩ পূর্বাহ্ণ

টিকে গ্রুপের গ্যাস বিল জালিয়াতি: চাপ কম দেখিয়ে আত্মসাৎ ১৩ কোটি ৭২ লাখ টাকা

গ্যাস সরবরাহের চাপ সংক্রান্ত তথ্যে কারসাজির মাধ্যমে প্রায় ১৩ কোটি ৭২ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে টিকে গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। চট্টগ্রামের বাহির সিগন্যাল এলাকায় অবস্থিত টিকে গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান সামুদা কেমিক্যাল কমপ্লেক্স লিমিটেড দীর্ঘ সময় ধরে গ্যাস ব্যবহারে অভিনব জালিয়াতি চালিয়ে আসছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

তদন্তে উঠে এসেছে, চুক্তি অনুযায়ী যেখানে গ্যাসের চাপ ২৯ পিএসআইজি (প্রেশার ফ্যাক্টর ২.৯৬৯) থাকার কথা, সেখানে তা কম দেখিয়ে ২.৬২৯ ধরে বিল নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফলে ২০১৮ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ২০ লাখ টাকা করে কম বিল পরিশোধ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

এরিয়ার বিল পরিশোধের নির্দেশ, ব্যবস্থাপক অপসারিত

ঘটনার প্রেক্ষিতে কর্নফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) টিকে গ্রুপকে বকেয়া ১৩ কোটি ৭২ লাখ টাকা এরিয়ার গ্যাস বিল পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে এ ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকার অভিযোগে কেজিডিসিএলের বিক্রয় (উত্তর-১) বিভাগের ব্যবস্থাপক আব্দুল বাতিনকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

তবে অভিযোগ রয়েছে, এত বড় আর্থিক ক্ষতির ঘটনায় তার বিরুদ্ধে কেবল বদলিই যথেষ্ট নয়। বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি তার অধীনে থাকা অন্যান্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানের গ্যাস চাপ যাচাইয়ের দাবিও উঠেছে।

ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরির সময়ই জালিয়াতি

কেজিডিসিএলের এক চিঠিতে বলা হয়েছে, গ্যাস বিপণন বিধিমালা-২০১৪ অনুযায়ী ২৯ পিএসআইজি চাপে গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রে প্রেশার ফ্যাক্টর ২.৯৬৯ নির্ধারিত। সে অনুযায়ী ২০১০ সাল থেকে বিল করা হচ্ছিল।

কিন্তু ২০১৮ সালের ২২ জুলাই ডিজিটাল ডাটাবেজ প্রস্তুতের সময় সংশ্লিষ্টদের যোগসাজশে চাপ শুদ্ধিগুণক পরিবর্তন করে ২.৬২৯ নির্ধারণ করা হয়। এতে ছয় বছরের বেশি সময় ধরে সঠিক পরিমাণ গ্যাসের বিপরীতে বিল আদায় করা হয়নি।

চিঠিতে আরও বলা হয়, বিদ্যমান চুক্তি অনুসারে পুনর্গণনা করলে ২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত মোট ১৩ কোটি ৭২ লাখ টাকা আদায়যোগ্য, যা পে-অর্ডার বা রাজস্ব শাখায় জমা দিতে বলা হয়েছে।

মামলা চলমান, কারণ দর্শানোর নোটিশ

কর্নফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সালাউদ্দিন জানিয়েছেন, এখনো টিকে গ্রুপ ওই অর্থ পরিশোধ করেনি। বিষয়টি বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) বিচারাধীন রয়েছে।

তিনি জানান, বিইআরসির নির্দেশনার আলোকে এ ঘটনায় জড়িত কয়েকজন কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

আগেও বিতর্কে টিকে গ্রুপ

টিকে গ্রুপের বিরুদ্ধে জ্বালানি খাতে জালিয়াতির অভিযোগ নতুন নয়। তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান কর্নফুলী স্টিল মিলস লিমিটেডের ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ কেন্দ্রে গ্যাস সংযোগ নিয়েও আগে বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ ওঠে।

নিয়ম অনুযায়ী এনওসি না পেয়েও ভুয়া চিঠির মাধ্যমে গ্যাস সংযোগ অনুমোদন নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এমনকি এখতিয়ারবহির্ভূতভাবে ফৌজদারহাট বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের ইস্যু করা চিঠি ব্যবহার করে সংযোগ আদায়ের তথ্যও সামনে এসেছে।

২০২১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত কোম্পানির ১৬৯তম বোর্ডসভায় কর্নফুলী স্টিল মিলসের ১৬.৮ মেগাওয়াট ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ কেন্দ্রে গ্যাস সংযোগ অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

সংযোগ বন্ধ, আরও তদন্তের ইঙ্গিত

প্রকাশিত প্রতিবেদনের পর বিষয়টি পুনরায় আলোচনায় এলে এনওসি যাচাইয়ের উদ্যোগ নেয় কেজিডিসিএল। এনওসি প্রদানকারী কর্মকর্তার ব্যাখ্যায় জালিয়াতির একাধিক তথ্য প্রকাশ পায়। এ বিষয়ে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যানের মতামত চাওয়া হয়েছে। মতামত না পাওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট গ্যাস সংযোগ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে কেজিডিসিএল।

কেজিডিসিএলের এক সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তার দায়িত্বকালেও টিকে গ্রুপের দাখিল করা কাগজপত্রে অসংগতি ধরা পড়েছিল। পূর্ণাঙ্গ যাচাই করলে আরও জালিয়াতি বেরিয়ে আসতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তার দাবি, আগের সরকারের সময়ে প্রভাবশালী মহলের মাধ্যমে তারা নিয়মবহির্ভূত চাপ প্রয়োগ করত।

এ বিষয়ে টিকে গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের গ্রুপ ডিরেক্টর মোহাম্মাদ মোস্তফা হায়দার-এর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

আরো