পরিবারের খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা উন্নয়নের লক্ষ্যে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ সরকারের একটি অগ্রাধিকার কর্মসূচি
আলী আহসান রবি
সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী অধ্যাপক ডাঃ এজেডএম জাহিদ হোসেন বলেছেন,নারীর ক্ষমতায়নের মাধ্যমে নারীর অধিকার ও নারীর মর্যাদা নিশ্চিত করন, পরিবারের খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা উন্নয়নের লক্ষ্যে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান বিএনপি সরকার। এই কার্ডের মাধ্যমে নির্বাচিত পরিবারগুলোকে নিয়মিত নগদ সহায়তা দেয়া হবে।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রী অধ্যাপক ডাঃ এ জেড এম জাহিদ হোসেন আজ ঢাকায় বনানী কড়াইল বস্তি ও সাততলা বস্তি পরিদর্শন উপলক্ষ্যে টিএনটি বালক বিদ্যালয় আয়োজিত ফ্যামিলি কার্ড পাইলটিং কার্যক্রম সরেজমিনে দেখার জন্য সাংবাদিকদের এক প্রেস ব্রিফিংয়ে কথা বলেন।
এ সময় সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ আবু ইউছুফ ও মন্ত্রণালয় এবং সমাজসেবা অধিদপ্তরের কর্মকর্তাবৃন্দ, শিক্ষকবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রী বলেন,গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫(ঘ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নাগরিকদের সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার নিশ্চিত করার রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতাকে আধুনিক ডিজিটাল কাঠামোর মাধ্যমে বাস্তবে রূপ দিতে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও সমাজসেবা অধিদপ্তর ‘ফ্যামিলি কার্ড’ পাইলটিং বাস্তবায়ন গাইডলাইন ২০২৬ প্রণয়ন করেছে। এই কর্মসূচির মূল দর্শন হচ্ছে “ব্যক্তি নয়, পরিবারই উন্নয়নের মূল একক”। বর্তমানে দেশে প্রচলিত ৯৫টিরও বেশি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মধ্যে বিদ্যমান সমন্বয়হীনতা, একই ব্যক্তির একাধিক সুবিধা গ্রহণ (Double-dipping) এবং উল্লেখযোগ্য শতাংশ প্রকৃত দরিদ্রদের বাদ পড়ার মতো ত্রুটিগুলো দূর করে একটি বৈষম্যহীন ও মানবিক কল্যাণ রাষ্ট্র গড়ে তোলাই এ কর্মসূচির লক্ষ্য। এই কর্মসূচির দীর্ঘমেয়াদী রূপকল্প হলো ২০৩০ সালের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ডকে প্রতিটি নাগরিকের জন্য একটি ‘সর্বজনীন সোশ্যাল আইডি কার্ড’-এ রূপান্তর করা।
তিনি বলেন,সুবিধাভোগী নির্বাচনের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি হিসেবে ‘প্রক্সি মিনস টেস্ট’ (PMT) স্কোরিং ব্যবহার করা হবে। পাইলটিং পর্যায়ে ০-১০০০ স্কোরের মধ্যে ১ম, ২য় ও ৩য় কোয়ান্টাইলের অন্তর্ভুক্ত অতি দরিদ্র, দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। নির্দিষ্ট সময় অন্তর দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা পর্যালোচনা ও মূল্যায়ন করে দারিদ্র্যের এ ধাপ পুন:নির্ধারণ করা যাবে। গ্রামীণ এলাকায় বসতভিটাসহ আবাদি জমির পরিমাণ ০.৫০ একর বা তার কম এবং পরিবারের মাসিক আয় ও সম্পদের ভিত্তিতে এই যোগ্যতা নির্ধারিত হবে। নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে এই কার্ডটি সরাসরি পরিবারের ‘মা’ বা ‘নারী প্রধান’ সদস্যের নামে ইস্যু করা হবে।
পাইলট কর্মসূচির আওতায় নির্বাচিত প্রতিটি পরিবারকে মাসিক ২,৫০০ টাকা সরাসরি নগদ সহায়তা প্রদান করা হবে। সরকারি কোষাগার থেকে এই অর্থ ‘জিটুপি’ (G2P) পদ্ধতিতে সরাসরি সুবিধাভোগী নারীর মোবাইল ওয়ালেট বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হবে। এর পাশাপাশি বিদ্যমান টিসিবি কার্ডকে ফ্যামিলি কার্ডের ‘ডাইনামিক সোশ্যাল রেজিম্মি’ (DSR)-এ স্থানান্তর করা হবে। সরকারের অন্যান্য মন্ত্রণালয় বা বিভাগ ভবিষ্যতে একই স্মার্ট কার্ড ব্যবহার করে API স্থাপন কিংবা ওটিপি ভেরিফিকেশনের মাধ্যমে সাশ্রয়ী মূল্যে খাদ্য সহায়তা এবং শিক্ষা উপবৃত্তি ও কৃষি ভর্তুকির মতো সুবিধাগুলোও পাওয়া যাবে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো আনুসংগিক খরচ বহন করবে, তবে ডাটা সংরক্ষণের মূল দায়িত্ব পালন করবে সমাজসেবা অধিদপ্তর। ২০২৮ সালের মধ্যে দেশের সামাজিক নিরাপত্তা বাজেটকে জিডিপির ৩ শতাংশে উন্নীত করার একটি লক্ষ্যমাত্রা এই গাইডলাইনে নির্ধারণ করা হয়েছে।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রী বলেন,এই বিশাল কর্মযজ্ঞটি বাস্তবায়নের জন্য মন্ত্রিপরিষদ কমিটি থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত একটি শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সার্বিক তত্ত্বাবধান সংক্রান্ত মন্ত্রিপরিষদ কমিটি নীতি নির্ধারণ করবে এবং সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের নেতৃত্বে কারিগরি ও ডাটা ম্যানেজমেন্ট কমিটি সার্বিক তত্ত্বাবধান-করবে। উপজেলা, ইউনিয়ন এবং ওয়ার্ড পর্যায়ে পৃথক বাস্তবায়ন ও মনিটরিং কমিটি গঠন করা হয়েছে। পাইলট পর্যায়ে দেশের ১৪টি ভিন্ন বৈচিত্রের এলাকা নির্বাচন করা হয়েছে, যার মধ্যে ঢাকার বনানী কড়াইল বস্তি, মিরপুরর অলিমিয়ারটেক বস্তি ও বাগানবাড়ী বস্তি (শহরে বস্তি), চট্টগ্রামের পতেঙ্গা (শিল্প এলাকা), বান্দরবানের লামা (পার্বত্য এলাকা), সুনামগঞ্জের দিরাই (হাওর এলাকা) এবং ঠাকুরগাঁও সদর (সীমান্তবর্তী এলাকা) মতো বৈচিত্র্যময় অঞ্চল অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এলাকা নির্বাচনের ক্ষেত্রে দারিদ্রোর ঘনত্ব, ভৌগোলিক চ্যালেঞ্জ এবং অনগ্রসরতাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন,বাস্তবায়ন রোডম্যাপ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে কারিগরি ও প্রশাসনিক প্রস্তুতির মাধ্যমে এই কার্যক্রম শুরু হবে। এরপর ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ০৫ মার্চ পর্যন্ত ওয়ার্ড কমিটি বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রত্যেক পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করবে। সংগৃহীত ডাটা অনলাইনে এন্ট্রি ও পিএমটি স্কোরিং শেষে সমাজসেবা অধিদপ্তরের কর্মীরা সরেজমিনে ‘লাইভ ভেরিফিকেশন’ করবেন। ৮ মার্চ চূড়ান্ত অনুমোদন শেষে কিউআর কোড যুক্ত ডিজিটাল স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড মুদ্রণ করা হবে। সকল প্রস্তুতি শেষে ১০ মার্চ ২০২৬ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রংপুরে আনুষ্ঠানিকভাবে এই কার্যক্রমের উদ্বোধন করবেন। এবং উদ্বোধনের সাথে সাথেই সুবিধাভোগীদের মোবাইল ওয়ালেটে/ব্যাংক হিসাবে প্রথম মাসের নগদ সহায়তা পৌঁছে যাবে। পাইলটিং কর্মসূচিতে প্রথম পর্যায়ে ১৪টি ইউনিটে ১০,০০০ পরিবারকে এ কার্ড প্রদান করা হবে। পরবর্তীতে প্রতি ধাপে ১০,০০০ করে বৃদ্ধি করে জুন ২০২৬ এর মধ্যে বিভিন্ন ইউনিটে ৪০০০০ পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ডের আওতাভুক্ত করা হবে। তবে জরিপকৃত সকল পরিবারকেই ফ্যামিলি কার্ড প্রদান করা হবে। এই পাইলটিং কর্মসূচির জন্য ০৪ মাসে (মার্চ-জুন, ২০২৬) মোট ৩৮ কোটি ৭ লক্ষ টাকা বরাদ্দ প্রয়োজন হবে, যার ৬৬ শতাংশ অর্থ সরাসরি দরিদ্র পরিবারগুলোর হাতে পৌঁছাবে। এটি বাংলাদেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক মুক্তির একটি ঐতিহাসিক সনদ হিসেবে বিবেচিত হবে, যা প্রতিটি নাগরিকের মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করবে।
পরে মন্ত্রী কড়াইল বস্তি এবং সাততলা বস্তি পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনকালে বস্তিতে বসবাসকারী বস্তিবাসীদের সাথে কথা বলেন এবং তাদের খোঁজখবর নেন।