মঙ্গলবার, ৯ জুন, ২০২৬, ৫:৪০ অপরাহ্ণ

বিডিবিএলে সর্বজনীন পেনশন স্কিমের চাঁদা সংগ্রহ কার্যক্রম উদ্বোধন

আলী আহসান রবি

রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক পিএলসি. (বিডিবিএল) আজ ০৯/০৬/২০২৫ তারিখ সোমবার সকাল ১০.৩০ টায় সর্বজনীন পেনশন স্কিমের চাঁদা সংগ্রহ কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করেছে। জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মোঃ সুরাতুজ্জামান বিডিবিএল-এর বোর্ড রুমে আয়োজিত শুভ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে কার্যক্রমটির উদ্বোধন করেন। Zoom প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে এই অনুষ্ঠানে ব্যাংকের সারাদেশের সকল শাখার কর্মকর্তারা একযোগে অংশগ্রহণ করেন।
সর্বজনীন পেনশন স্কিমের আওতায় দেশের নাগরিকদের রেজিস্ট্রেশন ও মাসিক চাঁদা সংগ্রহের লক্ষ্যে গত ১৪ জুলাই ২০২৫ তারিখে বিডিবিএল ও জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির আওতায় ব্যাংকের প্রিন্সিপাল ব্রাঞ্চে কর্তৃপক্ষের নামে একটি বিশেষ SND অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে এবং ব্যাংকের Core Banking System (CBS)-এর সাথে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের সফটওয়্যার ইন্টিগ্রেশন ও টেস্টিং সম্পন্ন করে কার্যক্রমটি লাইভ করা হয়েছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মোঃ সুরাতুজ্জামান সর্বজনীন পেনশন স্কিমের প্রেক্ষাপট ও গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি জানান, ২০২৩ সালের আগস্ট মাসে সর্বজনীন পেনশন স্কিম চালু করা হয়। এই স্কিমটি ১৮ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সী সকল নাগরিকের জন্য উন্মুক্ত — বেসরকারি কর্মচারী, কৃষক, দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং প্রবাসী বাংলাদেশিরাও এতে অংশ নিতে পারবেন। অনুষ্ঠানে উপস্থাপিত তথ্যে জানানো হয়, UNFPA-র প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রত্যাশিত গড় আয়ু বর্তমানে ৭৩ বছর, যা ২০৫০ সালে ৭৯.৯ বছর এবং ২০৭৫ সালে ৮৪.৩ বছরে উন্নীত হবে। ২০২৫ সালে প্রতি ১০ জনে একজন এবং ২০৫০ সালে প্রতি ৫ জনে একজন ষাটোর্ধ্ব মানুষ হবেন বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। বয়স্ক জনগোষ্ঠীর নির্ভরশীলতার অনুপাত ২০২২ সালে যেখানে ছিল মাত্র ৮.৬ শতাংশ, তা ২০৫০ সালে ২৪ শতাংশ এবং ২০৭৫ সালে ৪৮ শতাংশে পৌঁছাবে, যা একটি সুসংগঠিত পেনশন ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তাকে আরও জরুরি করে তুলেছে।
বক্তব্যে আরও জানানো হয়, বাংলাদেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৮৫ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত, যেখানে সাধারণত পেনশন বা ভবিষ্য তহবিলের কোনো সুবিধা নেই। দেশের ৭৭.৪ মিলিয়ন শ্রমশক্তির এই বিশাল অংশকে সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় আনাই সর্বজনীন পেনশন স্কিমের মূল লক্ষ্য।
“সর্বজনীন পেনশন স্কিম কোনো নির্দিষ্ট চাকরি বা খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি দেশের সকল নাগরিকের জন্য। বিডিবিএল-এর সাথে এই অংশীদারিত্বের মাধ্যমে আমরা দেশের আরও বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে পেনশন সুবিধা পৌঁছে দিতে পারব এবং একটি সুরক্ষিত ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে সক্ষম হব।”
— ড. মোঃ সুরাতুজ্জামান, নির্বাহী চেয়ারম্যান, জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ

অনুষ্ঠানে সর্বজনীন পেনশন স্কিমের চারটি বিদ্যমান স্কিম সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়: প্রবাস (প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য), প্রগতি (বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের জন্য), সুরক্ষা (স্বনিযুক্ত/অনানুষ্ঠানিক খাতের জন্য) এবং সমতা (নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য)। মাসিক ১,০০০ থেকে ১5,০০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা প্রদানের সুবিধা রয়েছে এবং চাঁদার পরিমাণ ও মেয়াদ অনুযায়ী পেনশনের পরিমাণ নির্ধারিত হবে।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, সর্বজনীন পেনশন কার্যক্রম জোরদার করতে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB) ১০০ মিলিয়ন ডলার সহজশর্তে ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং এই লক্ষ্যে সম্ভাব্যতা যাচাই (Feasibility Study) চলমান রয়েছে। পাশাপাশি ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের প্রায় ৪ কোটি পরিবারের প্রতিটি পরিবার থেকে অন্তত একজন সদস্যকে যেকোনো একটি স্কিমে অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে শরিয়াহভিত্তিক পেনশন স্কিম চালুর প্রস্তাবও উপস্থাপন করা হয়। বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী ইসলাম ধর্মাবলম্বী হওয়ায় অনেকে সুদভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থায় অংশ নিতে অনাগ্রহী। তাই বিদ্যমান প্রতিটি স্কিমে ইসলামিক (শরিয়াহ-সম্মত) ভার্সন চালুর পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানানো হয়। এছাড়া নমিনিদের আজীবন পেনশন সুবিধা প্রদানের বিষয়টিও সক্রিয় বিবেচনা করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার ২০২৬-এর ‘বৈষম্যহীন আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও টেকসই রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা অর্জন’ শীর্ষক অধ্যায়ে বেসরকারি খাতের কর্মীদের জন্য পেনশন ফান্ড গঠনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সর্বজনীন পেনশন স্কিম সম্প্রসারণে তফসিলি ব্যাংকগুলোর সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানানো হয়।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে বিডিবিএল-এর সকল শাখার কর্মকর্তাদের জন্য একটি বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি পরিচালিত হয়। এতে সর্বজনীন পেনশন স্কিমের নিয়মকানুন, গ্রাহক নিবন্ধন প্রক্রিয়া, চাঁদা সংগ্রহের পদ্ধতি এবং CBS সফটওয়্যার ব্যবহার সম্পর্কে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। বিডিবিএল-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মোঃ জসীম উদ্দিন বলেন, সর্বজনীন পেনশন স্কিমে ব্যাংকের অংশগ্রহণ দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে নতুন মাত্রা যোগ করবে। ব্যাংকের বিস্তৃত শাখা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে দেশের প্রতিটি নাগরিকের কাছে এই গুরুত্বপূর্ণ সেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক পিএলসি.-এর প্রধান কার্যালয় ঢাকার রাজউক এভিনিউতে অবস্থিত এবং ব্যাংকটি সারাদেশে তার শাখা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে গ্রাহকদের সেবা প্রদান করে আসছে। সর্বজনীন পেনশন স্কিম সম্পর্কিত আরও তথ্যের জন্য https://www.upension.gov.bd ওয়েবসাইট অথবা ব্যাংকের যেকোনো শাখায় যোগাযোগ করা যাবে

আরো