সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬, ১১:৩৬ পূর্বাহ্ণ

বিএটির বিরুদ্ধে ২২১ কোটি টাকা আয় গোপনের অভিযোগ

দেশের তামাক খাতের সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ (বিএটি)। এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগও বড়। শ্রম অধিকার লঙ্ঘন, শ্রমিকদের আন্দোলন, তামাকের ট্রাকে গাঁজা, কারখানাকে দোকান হিসেবে লাইসেন্স নেওয়া, বাজেটের আগে সিগারেট মজুত করে শুল্ক-কর ফাঁকি, ভালো স্ট্যাম্পকে অপচয় দেখিয়ে রাজস্ব ফাঁকিসহ নানা অনিয়মের মাধ্যমে আলোচনায় থাকে কোম্পানিটি।

বিভিন্ন অপকৌশলে সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দিতে মরিয়া বিএটি। এবার ২২১ কোটি টাকা আয়ের তথ্য গোপনের চিত্র সামনে এসেছে। আয়করের বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ) কোম্পানিটির ২০২২-২৩ অর্থবছরের রিটার্নের তথ্যে এই অসঙ্গতি পেয়েছে। জানা গেছে, আলোচ্য অর্থবছরে বিএটি তাদের আয় দেখিয়েছে ২ হাজার ৭৩০ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। তবে এলটিইউ’র নিরীক্ষায় দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি কর ফাঁকি দেওয়ার উদ্দেশ্যে আয়ের ২১১ কোটি টাকা কম দেখিয়েছে। নিরীক্ষা অনুযায়ী আয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৯৪২ কোটি ৩১ লাখ টাকা।

তামাকজাত পণ্য প্রস্তুতকারক কোম্পানির ক্ষেত্রে বর্তমানে করপোরেট করহার ৪৫ শতাংশ। সেইসঙ্গে দুই দশমিক ৫০ শতাংশ সারচার্জও দেওয়ার নিয়ম আছে। সে হিসেবে ১০০ কোটি টাকার বেশি কর ফাঁকি দিয়েছে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো।

এলটিইউ সূত্রে জানা গেছে, মোট ১৬টি সুনির্দিষ্ট কারণে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর কর নথি নিরীক্ষা করা হয়েছে। সিগারেট উৎপাদন ও বিক্রি থেকে আয়, গ্রাচ্যুইটি খাতে পরিশোধ, লাভ-ক্ষতি হিসাবে বাড়তি খরচ দাবি, সিগারেট বিক্রির খরচ, কমিশন খরচ, লিগ্যাল ও সেক্রেটিরিয়াট খরচ, সেফটি-সিকিউরিটি, অডিট ফি, ডিস্ট্রিবিউশন ব্যয়, রিসার্চ এন্ড ডেভলপমেন্ট ব্যয়, ডিভিডেন্ড পরিশোধসহ সব খাতে বেশি খরচ দাবী করেছে বিএটি। বেশি খরচ দেখিয়ে প্রতিষ্ঠানটি তার প্রকৃত মুনাফা কম দেখিয়েছে। ফলে রাজস্ব হারিয়েছে সরকার।

জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, সরকারের রাজস্ব আয়ের অন্যতম বড় উৎস তামাক খাত। এই খাতের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান বিএটি। তাদের বিরুদ্ধে কোন ধরণের রাজস্ব ফাঁকির অনুসন্ধান চালু করতে গেলে প্রথমে তারা অনুসন্ধান বন্ধ করার চেষ্টা-তদবির করেন। এতে কাজ না হলে আদালতের মাধ্যমে রাজস্ব আদায় প্রক্রিয়া বিলম্বিত করে থাকে। আদালতকে ঢাল বানিয়ে তারা অনেক টাকা আটকে রেখেছে।

এই বিষয়ে বক্তব্য জানতে বিএটির ব্যবস্থাপক (এক্সটারনাল কমিউনিকেশনস) বায়েজিদ জোয়ার্দারের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

ভালো স্ট্যাম্পকে অপচয় দেখিয়ে রাজস্ব ফাঁকি
সংয়ংক্রিয় ও হাইস্পিড আধুনিক মেশিনে সিগারেট উৎপাদন হওয়ায় ব্যান্ডবোল বা ট্যাক্স স্ট্যাম্প অপচয়ের সম্ভাবনা খুবই কম। তবে ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত সময়ে শুধুমাত্র অপচয় দেখিয়ে ২৩ কোটি টাকা ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে বিএটি। প্রতিমাসে গড়ে রাজস্ব ফাঁকি প্রায় আট কোটি টাকা। সবচেয়ে বেশি অপচয় দেখিয়েছে ডার্বি, পাইলট, হলিউড, রয়্যালস, স্টার, ক্যাপস্টান, লাকি স্ট্রাইক, গোল্ডলিফ, মার্লবোরা ব্র্যান্ডের সিগারেটে। যদিও আদালতের নির্দেশে কারখানা স্থানান্তর ও শ্রমিক আন্দোলনের কারণে স্ট্যাম্প অপচয় হয়েছে বলে দাবি বিএটির। এনবিআর বলছে, মাত্র একদিনের ব্যবধানে এই বিপুল পরিমাণ স্ট্যাম্প নষ্ট হওয়ার কারণ নেই। বিএটি কোনো প্রমাণও দিতে পারেনি। সংশ্লিষ্টরা বলছে, দেশের সিগারেট মার্কেটের সিংহভাগ বিএটির দখলে। প্রতিমাসের গড় অনুযায়ী, বিএটি কেবল স্ট্যাম্পের অপচয় দেখিয়ে বছরে প্রায় ৯২ কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে যাচ্ছে।

ওয়্যারহাউজে বাড়তি মজুত করে ভ্যাট ফাঁকি
এরআগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার আগে সিগারেটের অতিরিক্ত উৎপাদন করে বিপুল পরিমাণে সিগারেট শুল্ক-কর দিয়ে ওয়্যারহাউজে মজুত করে রাখে বিএটি। তবে বিক্রি করে বাড়তি দামে। এতে সরকার রাজস্ব হারিয়েছিল ২১০ কোটি। টাকা আদায়ে প্রতিষ্ঠানটিকে কারণ দর্শানোর নোটিশও দিয়েছিল এনবিআরের বৃহৎ করদাতা ইউনিট-এলটিইউ (ভ্যাট)।

বিএটি বাজেটের আগে চারস্তরের ৩৫ কোটি ৬৫ লাখ ২ হাজার ৯৭৫ প্যাকেট সিগারেট শুল্ক-কর দিয়ে ওয়্যারহাউজে মজুত করে। এতে সরকার রাজস্ব পায় ৩ হাজার ৩৩ কোটি ৬৫ লাখ ৩৮ হাজার ৮৬ টাকা। তবে পুরাতন রেটে শুল্ক-কর দিলেও প্রতিষ্ঠানটি সিগারেট বিক্রি করেছে নতুন রেটে। ফলে প্রকৃতপক্ষে সরকারের রাজস্ব পাওয়ার কথা ছিল ৩ হাজার ২৫৫ কোটি ৫২ লাখ ১ হাজার ৪২৭ টাকা। বাজেটের মারপ্যাচে গ্রাহকের পকেট কেটে বিএটি ২১০ কোটি ৮৬ লাখ ৬৩ হাজার ৩৪২ টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে।

অথচ এনবিআরের আইন অনুযায়ী, সিগারেটের উৎপাদক বা বিক্রেতা নির্ধারিত মূল্যস্তরের অতিরিক্ত মূল্য নির্ধারণ করতে পারবেন না। উৎপাদনস্থল থেকে যে মূল্যের উপর শুল্ক-কর পরিশোধ করা হয়েছে তার চেয়ে বেশি দামে সিগারেট সরবরাহ করা হলে সেই দামের উপর শুল্ক-কর দিতে হবে।

শ্রমিক অধিকার লঙ্ঘনে আন্দোলন
কোম্পানিটির চুক্তিভিত্তিক-মৌসুমী শ্রমিকদের অধিকার ও স্থায়ীকরণের দাবিতে বিগত কয়েক বছর ধরে দফায় দফায় বেশ কয়েকটি আন্দোলন হয়েছে। চলতি বছরের জুলাই-আগস্টে চাকরি স্থায়ীকরণ ও ঠিকাদারি প্রথা বাতিলের দাবিতে কুষ্টিয়া-রংপুরসহ বিভিন্ন অঞ্চলে শ্রমিকেরা ২০ জুলাই থেকে দুই দফায় ১৭ দিন কর্মবিরতি পালন করেন। দাবি আদায় না হওয়ায় ৬ আগস্ট থেকে আবার ১০ দিনের পূর্ণ কর্মবিরতি, লাগাতার প্রতীকী অনশন ও মানববন্ধন করেন তারা।

২০২৫ সালের এপ্রিল-মে মাসে নিয়োগপত্র, প্রফিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুইটিসহ ২২ দফা দাবিতে লাগাতার অবস্থান ধর্মঘট শুরু হয়। প্রায় এক মাসের অচল অবস্থা ও শ্রমিক বিক্ষোভের জেরে কারাখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। ২০২৪ সালের আগস্টে বার্ষিক লভ্যাংশ ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার দাবিতে ঢাকার কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ বিভিন্ন অঞ্চলে রাতভর অবস্থান ও বিক্ষোভ হয়। এর আগে ২০২৩ সালের আগস্টে কুষ্টিয়ার শ্রমিকেরা পাঁচ দফা দাবিতে অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতি ও বিক্ষোভ করেছিলেন।

তামাক ভর্তি ট্রাকে গাঁজা
২০২৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর লালমনিরহাটে বিএটির তামাক ভর্তি ট্রাক থেকে ১৩ কেজি গাঁজা উদ্ধার করেছে র‌্যাপিড অ্যাশন ব্যাটেলিয়ান (র‌্যাব)। তামাক ভর্তি ট্রাকটি বিএটির ডিপো গোডাউন থেকে তামাক নিয়ে কুষ্টিয়ায় বিএটির তামাক প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা জেএলটি নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। তামাক পরিবহনের পাশাপাশি গোপনে মাদক লুকিয়ে পাচার করা হচ্ছিল। এসময় মাদক পরিবহনের অভিযোগে তিনজনকে আটক করা হয়েছে। বিএটির ডিপো ব্যবস্থাপক নাঈম হোসেন জানান, ট্রাকের তামাকগুলো আমাদের। কিন্তু উদ্ধার হওয়া গাঁজাগুলো আমাদের নয়। এর চেয়ে বেশি কিছু বলতে রাজী হননি তিনি।

আরো