রবিবার, ১ নভেম্বর, ২০২৬, ২:৫৪ অপরাহ্ণ

ঢাকায় ৬ রুটে পরীক্ষামূলক বাস চালু

রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরানো, যানজট কমানো এবং যাত্রীসেবার মান বাড়াতে বাস রুট পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ঢাকায় চালু থাকা ৯৮টি বাস রুট কমিয়ে ৩২টি সমন্বিত রুটে পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রাথমিকভাবে ছয়টি রুটে রোববার (১ নভেম্বর) থেকে পরীক্ষামূলকভাবে বাস চলাচল শুরু হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে বাকি রুটগুলোও নতুন ব্যবস্থার আওতায় আনা হবে।

দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় একই সড়কে একাধিক কোম্পানির বাসের যাত্রী সংগ্রহের প্রতিযোগিতা, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা, অতিরিক্ত বাস চলাচল এবং নির্ধারিত স্টপেজ না মানার মতো সমস্যা রয়েছে। এসব কারণে সড়কে বিশৃঙ্খলা ও যানজট বাড়ার পাশাপাশি ভোগান্তিতে পড়ছেন যাত্রীরা।

আবার রাজধানীর অনেক এলাকায় প্রয়োজনের তুলনায় বাসের সংখ্যা কম। এ পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে যাত্রীদের চাহিদা, সড়কের ধারণক্ষমতা এবং যানবাহন চলাচলের বাস্তব চিত্র বিশ্লেষণ করে রুট পুনর্বিন্যাসের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) বাস রুট রেশনালাইজেশন প্রকল্পের আওতায় এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, নির্ধারিত প্রতিটি রুটে একটি কোম্পানির মাধ্যমে বাস পরিচালনার ব্যবস্থা করা হবে। এতে একই সড়কে বিভিন্ন কোম্পানির মধ্যে যাত্রী তোলার প্রতিযোগিতা কমবে এবং বাস চলাচলে শৃঙ্খলা ফিরবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ মসিউর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের বিশৃঙ্খলা দূর করতেই বাস রুট রেশনালাইজেশন কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ঢাকায় ৯৮টি সচল বাস রুট রয়েছে। এসব রুট পুনর্বিন্যাস করে ৩২টি সমন্বিত রুটে নিয়ে আসার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

তিনি বলেন, যাত্রীদের প্রকৃত চাহিদা, সড়কের ধারণক্ষমতা এবং যানবাহন চলাচলের তথ্য বিশ্লেষণ করে এ পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে। রাজধানীর গণপরিবহনকে একটি পরিকল্পিত, নিরাপদ ও যাত্রীবান্ধব কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসাই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।

বাস রুট রেশনালাইজেশন মূলত যাত্রীদের যাতায়াতের চাহিদা, সড়কের সক্ষমতা এবং যানজটের পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বাস চলাচলের পথ ও ব্যবস্থাপনা নতুনভাবে সাজানোর প্রক্রিয়া। এর আওতায় শুধু রুট পরিবর্তন বা বাসের সংখ্যা কমানো নয়, বরং বাসের সংখ্যা, চলাচলের পথ, স্টপেজ, সময়সূচি এবং পরিচালনব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় করা হয়।

ডিটিসিএ সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীর বাস রুট পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগ প্রথম নেওয়া হয় ২০১১ সালে। ওই সময় ঢাকা পরিবহন সমন্বয় বোর্ডের (ডিটিসিবি) মাধ্যমে একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলেও তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। পরে ২০১৯ সালে ডিটিসিএ আগের বিভিন্ন সমীক্ষা পর্যালোচনা করে নতুন করে পরিকল্পনা তৈরির কাজ শুরু করে। প্রথমদিকে ৪২টি রুটের প্রস্তাব করা হয়েছিল।

পরবর্তী সময়ে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি), বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, বাস মালিক এবং শ্রমিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে আলোচনা ও পর্যালোচনার মাধ্যমে ৩২টি রুটের বিষয়ে ঐকমত্য তৈরি হয়।বাংলাদেশ ব্যাংক

পরিকল্পনা প্রণয়নে বিভিন্ন পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ ও জরিপ চালানো হয়েছে। ২০২৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত সচল থাকা ৯৮টি বাস রুটের প্রতিটিতে ১৮টি ট্রিপের যাত্রী ওঠানামা পর্যবেক্ষণ করা হয়। এ জরিপে ১০ হাজারের বেশি যাত্রীর তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। পাশাপাশি ৩৫ হাজারের বেশি বাসযাত্রীর যাত্রা শুরুর স্থান ও গন্তব্য চিহ্নিত করতে পৃথক জরিপ পরিচালনা করা হয়।

এ ছাড়া ঢাকা মহানগরীর ৭২টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে টানা ৭২ ঘণ্টা যানবাহন গণনা করা হয়েছে। প্রায় ৪০০ কিলোমিটার বাস নেটওয়ার্কের বর্তমান অবস্থা জানতে ড্রোনের মাধ্যমে ছবি সংগ্রহ, সড়কের অবকাঠামোগত পর্যালোচনা এবং প্রকৌশল নকশা প্রস্তুত করা হয়েছে।

সংগৃহীত এসব তথ্য সফটওয়্যারের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করে একটি গণপরিবহন মডেল তৈরি করা হয়েছে। এর ভিত্তিতে যাত্রী চলাচলের প্রবণতা, বিভিন্ন রুটের প্রয়োজনীয়তা এবং পরিবহন নেটওয়ার্কের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা হয়েছে।

ডিটিসিএর পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রস্তাবিত ৩২টি রুটের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ৩৭ থেকে ৩৮ লাখ যাত্রীর যাতায়াতের সুযোগ তৈরি হবে। যা মোট ব্যক্তিগত যাত্রার প্রায় ৮ শতাংশ। নতুন রুটগুলোর গড়ে প্রায় ৭০ শতাংশ বিদ্যমান বাস রুটের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ফলে বর্তমান বাস চলাচলের পথ ও পরিবহন অবকাঠামো ব্যবহার করেই নতুন ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ঢাকার বাস রুট রেশনালাইজেশন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ধ্রুব আলম বলেন, এ পরিকল্পনা কোনো অনুমানের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়নি। ২০২৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত সচল ৯৮টি বাস রুটে বিভিন্ন ধরনের জরিপ পরিচালনা করা হয়েছে। এতে ১০ হাজারের বেশি যাত্রীর বাসে ওঠানামার তথ্য এবং ৩৫ হাজারের বেশি যাত্রীর যাত্রা শুরুর স্থান ও গন্তব্যের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। পাশাপাশি মহানগরীর ৭২টি স্থানে একটানা ৭২ ঘণ্টা যানবাহন গণনা করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, প্রায় ৪০০ কিলোমিটার বাস নেটওয়ার্কের অবকাঠামোগত অবস্থাও পর্যালোচনা করা হয়েছে। এসব তথ্য সফটওয়্যারের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করেই ৩২টি রুটের প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে। যেসব এলাকায় যাত্রীর চাহিদা বেশি, সেখানে পর্যাপ্ত বাস নিশ্চিত করা এবং অপ্রয়োজনীয় রুটের পুনরাবৃত্তি কমানোই এ পরিকল্পনার উদ্দেশ্য।

নতুন পরিবহন নেটওয়ার্কে বিমানবন্দর, মিরপুর-১০, কুড়িল, গাবতলী, মহাখালী, ফার্মগেট, বাড্ডা ও যাত্রাবাড়ীকে কেন্দ্র করে একাধিক রুটের সংযোগ রাখা হয়েছে।

প্রাথমিক পর্যায়ে চালু হচ্ছে যে ছয়টি রুট

প্রথম পর্যায়ে যেসব ছয়টি রুটে বাস চলাচল শুরু হচ্ছে, সেগুলো হলো-

গাজীপুরের শিববাড়ী চৌরাস্তা থেকে আজিমপুরের ঢাকেশ্বরী মন্দির পর্যন্ত, আব্দুল্লাহপুর হয়ে।

মিরপুর চিড়িয়াখানা থেকে চুলকুটিয়া পর্যন্ত, সায়েন্স ল্যাব হয়ে।

মোহাম্মদপুরের বসিলার ঘাটারচর থেকে ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার পর্যন্ত, শাহবাগ ও মৎস্য ভবন হয়ে।

মোহাম্মদপুরের বসিলা থেকে নারায়ণগঞ্জের চিটাগাং রোডের কাঁচপুর সেতু পর্যন্ত, সায়েন্স ল্যাব ও জিগাতলা হয়ে।

মোহাম্মদপুরের ঘাটারচর থেকে আব্দুল্লাহপুরের ধউর সেতু পর্যন্ত, মিরপুর-১০ হয়ে।

টঙ্গী কলেজগেট থেকে আজিমপুরের ঢাকেশ্বরী মন্দির পর্যন্ত, আব্দুল্লাহপুর হয়ে।

প্রস্তাবিত প্রধান রুটগুলোর মধ্যে রয়েছে গাজীপুরের শিববাড়ী থেকে আজিমপুর, মিরপুর চিড়িয়াখানা থেকে কেরানীগঞ্জ, ঘাটারচর থেকে ডেমরা ও কাঁচপুর এবং ঘাটারচর থেকে মিরপুর হয়ে আব্দুল্লাহপুরের ধউর পর্যন্ত। এসব রুটে ৭০ থেকে ২৫০টি পর্যন্ত শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত নয় এমন বাস পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া টঙ্গী কলেজগেট থেকে আজিমপুর পর্যন্ত ২২ দশমিক ৮৯ কিলোমিটার রুটে ২০টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাস চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে।

এর বাইরে ফার্মগেট-পলাশী, মোহাম্মদপুরকেন্দ্রিক এবং উত্তরা এলাকায় তিনটি চক্রাকার বাস সার্ভিস চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটি চক্রাকার রুটে ২০টি করে বাস পরিচালনার প্রস্তাব করা হয়েছে।

পরিকল্পনায় ঢাকা চাকা, রমজান আলী এন্টারপ্রাইজ, ফোর স্টার বাস লাইন ও পিএনপি সিটি সার্ভিসসহ কয়েকটি পরিবহন প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি বাস রাখার জন্য রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে নির্দিষ্ট জায়গা নির্ধারণের প্রস্তাবও রয়েছে।

আরো