ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের দুই সার্ভিস সেতু চালু
ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ধউর মোড় থেকে আশুলিয়া পর্যন্ত দুই লেনবিশিষ্ট দুটি সার্ভিস সেতু যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। প্রতিটি সার্ভিস সেতুর দৈর্ঘ্য ৩ দশমিক ১৭ কিলোমিটার।
‘ঢাকার সঙ্গে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগ যানজটহীনভাবে নিশ্চিত করবে ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। একই সঙ্গে ঢাকার চারপাশের উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিমের যোগাযোগব্যবস্থাকে নগরীর অ্যাট-গ্রেড সড়ক ব্যবহার না করেই এলিভেটেড ওয়েতে পারাপারের সুযোগ তৈরি হবে’- বলেছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) সকালে ফিতা কেটে সেতু দুটির উদ্বোধন করেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
শেখ রবিউল আলম বলেন, “সহজভাবে যদি বলি, এই প্রকল্পটি খুবই দরকারি একটি প্রকল্প। ঢাকার সঙ্গে উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের দেশের যোগাযোগটা একেবারে যানজটহীনভাবে নিশ্চিত করবে এই প্রকল্প। শুধু তাই নয়, এই ঢাকার ওপর দিয়ে এলিভেটেড ওয়েতে উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিম, অর্থাৎ ঢাকার চারপাশে যে যোগাযোগব্যবস্থা রয়েছে, সেটিও এলিভেটেড ওয়েতে ঢাকা শহরের অ্যাট-গ্রেড ব্যবহার না করে ওপর দিয়ে ক্রস করা সম্ভব হবে।”
তিনি বলেন, “আমার জানা এবং দেখা মতে, যতগুলো প্রকল্প বাস্তবায়ন হতে চলেছে, তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্প। এটি স্থবির হয়ে গিয়েছিল, বাস্তবায়ন অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। কিন্তু আমরা জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় আসার পর, এই প্রকল্পটির গুরুত্ব ও প্রয়োজন বিবেচনা করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে আবার সেই স্থবির অবস্থা থেকে কার্যকর করার জন্য যে সমস্ত বরাদ্দ ও উদ্যোগ নেওয়া দরকার, এই সরকার তা নিয়েছে।”
মন্ত্রী বলেন, “আমি খুশি হয়েছি এই প্রকল্পটির মান এবং এর বাস্তবায়নের তড়িৎ গতিতে। এটাই একমাত্র প্রকল্প, যেখানে এত বড় একটি প্রকল্পের প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশের কাছাকাছি কাজ শেষ হয়েছে। সাড়ে তিন বছর আমরা এই প্রকল্পের এক্সটেনশন করেছি। আরো আমরা এই প্রকল্পে মান বজায় রেখে দ্রুততম সময়ে গত ছয় মাসে যে কাজ হওয়ার টার্গেট ছিল, তার চেয়ে অধিক কাজ সম্পন্ন করেছি।’
ইউটিলিটি স্থানান্তরের কাজকে প্রকল্পটির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে শেখ রবিউল আলম বলেন, “ইউটিলিটি শিফটিংটা খুব চ্যালেঞ্জিং ছিল। আমাদের পিডিসহ অন্যান্য যারা এখানে যুক্ত, আমি নিয়মিত খবর নিয়েছি, সহযোগিতা করেছি, পরামর্শ দিয়েছি এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে সেটা সম্পন্ন করার জন্য কাজ করেছি।”
তিনি বলেন, ‘যে প্রকল্পগুলো আছে, এখান থেকে আপনারা আশুলিয়া ক্রস করে আমরা পাইপ ক্রস করে দিচ্ছি। তার মানে, আরও কিছু এক্সটেনশন ওয়ার্ক বেড়েছে এই প্রকল্পে। এর জন্য অর্থ বরাদ্দ এবং সেই বরাদ্দকৃত অর্থ যাতে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করে ব্যয় করা হয়, অর্থাৎ সংশোধিত ডিপিপি এসেছে। আরডিপি সংশোধিত হলে তো আগের ডিপিপি থাকে না; যে ডিপিপি এসেছে সংশোধিত আকারে, সেখানেও আমরা প্রয়োজনীয় ব্যয় অপচয়হীনভাবে নির্ধারণ করে, যাতে জনগণ তাদের অর্থের শতভাগ সুফল এই প্রকল্পের মাধ্যমে পান, সেই বিষয়টি নিশ্চিত করেছি।”
উদ্বোধন করা অংশকে দেশের মানুষের জন্য একটি স্মরণীয় সময় উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, “এই প্রকল্পের একটি অংশ আজ উদ্বোধন হয়েছে, উন্মুক্ত হয়েছে জনগণের ব্যবহারের জন্য। এটা জাতির জন্য এবং এই অঞ্চলের মানুষের জন্য আমি মনে করি, একটি স্মরণীয় সময় অথবা একটি সুসংবাদ। এই সুসংবাদের অংশ হিসেবে আমরা যারা এখানে উপস্থিত হয়েছি, নিশ্চয়ই তারাও আনন্দিত।”
শেখ রবিউল আলম বলেন, “আমি এই দুটি লেনের শুভ উন্মুক্তিকরণ ঘোষণা করছি। বাকি কাজ পিডি সাহেব উল্লেখ করেছেন। অল্প সময়ের মধ্যে, ডিসেম্বরের মধ্যে আরেকটা বড় অংশ হয়ে যাবে। আগামী এক বছরের মধ্যে প্রকল্পের কাজ প্রায় সমাপ্তির কাছাকাছি জায়গায় চলে আসবে। এক্সটেনশন যেটা হয়েছে, সেটাও দ্রুতগতির মধ্যে আমরা শেষ করতে সক্ষম বলে মনে করছি।”
তুরাগ পারাপারে লাগবে না টোল
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, তুরাগ নদের পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে আশুলিয়া বাজার থেকে ধউর বেড়িবাঁধ পর্যন্ত বিদ্যমান সড়কটি আর রাখা হচ্ছে না। ফলে নতুন সার্ভিস লেন ব্যবহার করে টোল ছাড়াই তুরাগ নদ পার হওয়া যাবে।
ঢাকা আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের প্রকল্প পরিচালক শফিকুল ইসলাম বলেন, “আজকে যে অংশ চালু হয়েছে এটিসহ পুরো এক্সপ্রেসওয়ে টোল মুক্ত থাকবে। শুধু মাঝের চার লেন অংশটি টোল নেওয়া হবে। তবে আজ যে অংশ চালু হয়েছে, এটিতে চলাচলে কোনো টোল লাগবে না।”
তুরাগ নদের পানিপ্রবাহ নির্বিঘ্ন রাখতে ২ দশমিক ৭২ কিলোমিটার সেতু খুলে দেওয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের একাংশ চালু হওয়ায় যানবাহনের চালক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে স্বস্তি দেখা গেছে।
সাইফুল ইসলাম নামে এক পিকআপ ভ্যানচালক বলেন, “আগে রাস্তায় অনেক যানজট ছিল। এখন কমে যাবে। অনেক ভালো লাগছে। এখন দ্রুত যেতে পারব।”
আশুলিয়ার বাসিন্দা দীপংকর দাস বলেন, “আশুলিয়া এক্সপ্রেসওয়ে অবশেষে চালু হয়েছে। এত দিন অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। আশা করছি, এখন যানজট থেকে অনেকটা রক্ষা পাব।”
প্রকল্পের অগ্রগতি ৭২ শতাংশ
রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত প্রবেশদ্বার আশুলিয়া হয়ে দেশের উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ নিশ্চিত করতে ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) অনুমোদনের প্রায় পাঁচ বছর পর ২০২২ সালের ১২ নভেম্বর প্রকল্পটির নির্মাণকাজ শুরু হয়।
তবে, নানা জটিলতায় দীর্ঘদিন প্রকল্পটির কাজ ধীরগতিতে চলায় আশুলিয়া ও আশপাশের মানুষের ভোগান্তি বাড়ে। পরে কাজের গতি বাড়ানো হলে জুলাই পর্যন্ত প্রকল্পটির সার্বিক অগ্রগতি ৭২ শতাংশে পৌঁছায়। প্রকল্পটির দ্বিতীয় সংশোধনীতে ব্যয় প্রায় ৫৪ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে। বর্তমানে প্রকল্পটির নির্মাণ ব্যয় দাঁড়িয়েছে ২৭ হাজার ৪৫ দশমিক ৬৭ কোটি টাকা।
সংশোধিত প্রকল্পে ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও ভূগর্ভস্থ বৈদ্যুতিক লাইন নির্মাণের পাশাপাশি নতুন নকশায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এ ছাড়া বাইপাইলে নির্মাণ করা হবে তিনতলা দৃষ্টিনন্দন ‘ট্রাম্পেট ইন্টারচেঞ্জ’।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, মন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী, ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পের আরো একটি বড় অংশ চালু করার লক্ষ্য রয়েছে। আগামী এক বছরের মধ্যে মূল প্রকল্পের কাজ প্রায় সমাপ্তির কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি সংশোধিত প্রকল্পের আওতায় যুক্ত হওয়া এক্সটেনশন কাজও দ্রুত শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে চালু হলে রাজধানীর সঙ্গে উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগ আরও দ্রুত ও নির্বিঘ্ন হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে আশুলিয়া, সাভার ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলের যানজট কমানোর পাশাপাশি রাজধানীর প্রবেশ ও বের হওয়ার পথেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।
