বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৪:২৩ অপরাহ্ণ

ভোলা থেকে জাতীয় গ্রিড: গ্যাস সংকট সমাধানের বাস্তবসম্মত কৌশল

ড. বারেক কায়সার

বাংলাদেশে গত ৯ বছর ধরে ক্রমাগত কমছে গ্যাসের উৎপাদন। এর ওপর মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ও বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানি অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। আমদানিকৃত গ্যাসের চড়া দাম মেটাতে গিয়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর চরম চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। গ্যাসের তীব্র অভাবে দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর একটি বড় অংশ বন্ধ রাখতে হচ্ছে, যার ফলে দেশজুড়ে ৩ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং হচ্ছে। এই জ্বালানি সংকটের বিরূপ প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনসহ দেশের তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল এবং ভারী শিল্প খাতের ওপর। অনেক কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে এবং জেনারেটর চালাতে গিয়ে উৎপাদন ব্যয় বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বহুমুখী সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দেওয়ার তাগিদ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। এই বৈরী সময়ে রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি জায়ান্ট গ্যাজপ্রমের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট উত্তরণে অন্যতম নিয়ামক হতে পারে।

২০১২ সাল থেকে গ্যাজপ্রম বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট নিরসনে পেট্রোবাংলা ও বাপেক্সের অংশীদার হিসেবে অবদান রেখে আসছে। গত এক দশকেরও বেশি সময়ে কোম্পানিটি দেশের স্থলভাগের বিভিন্ন গ্যাসক্ষেত্রে প্রায় ২০টি মূল্যায়ন, অনুসন্ধান ও উৎপাদন কূপ সফলভাবে ডিজাইন ও খনন করেছে। এই সফল খননকাজের ফলে জাতীয় গ্রিডে মোট গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়, যা দেশের তৎকালীন মোট গ্যাস উৎপাদনের প্রায় ১০ শতাংশ বাড়াতে সরাসরি অবদান রেখেছিল।

বিশেষ করে ভোলার গ্যাসক্ষেত্রে গ্যাজপ্রম বড় ধরনের সাফল্য দেখিয়েছে। ২০২৩ সালে গ্যাজপ্রমের সফল অনুসন্ধানের মাধ্যমেই ভোলার ইলিশা-১ কূপটি আবিষ্কৃত হয়, যা দেশের ২৯তম গ্যাসক্ষেত্র হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। এই কূপ থেকে দৈনিক প্রায় ২০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি গ্যাস বাণিজ্যিক উৎপাদনের বড় সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এছাড়া তারা ভোলার শাহবাজপুর ও ভোলা নর্থ এলাকায় টবগী-১ এবং ভোলা নর্থ-২ কূপে সফল খননকাজ শেষ করেছে, যা থেকে বিপুল পরিমাণ গ্যাস উত্তোলনের পথ সুগম হয়েছে।

গ্যাজপ্রমের নিজস্ব সমীক্ষা অনুসারে ভোলায় প্রায় ৭ টিসিএফ গ্যাসের মজুত রয়েছে, যা দিয়ে বাংলাদেশের আগামী ৭ বছরের গ্যাসের মোট চাহিদা মেটানো সম্ভব। বাপেক্সের সাথে সমঝোতা স্মারকের আওতায় এই সমীক্ষা সম্পন্ন করে তারা ভোলায় আরও ১৯টি নতুন কূপের অবস্থান সুনির্দিষ্ট করেছে। শুধু ভোলার মূল ভূখণ্ডেই নয়, তারা হাতিয়া, চরফ্যাশন ও মনপুরা এলাকায় আরও ৩০টি নতুন কূপ চিহ্নিত করেছে, যা দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য এক আশার আলো।
ভোলার এই বিপুল গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য গ্যাজপ্রম কার্যকর প্রস্তাব দিয়েছে। স্বল্পমেয়াদি সমাধান হিসেবে তারা ২০ থেকে ৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের জন্য স্মল স্কেল এলএনজি এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে ভোলা-বরিশাল পাইপলাইন স্থাপনের প্রস্তাবনা দিয়েছে। বর্তমানে তারা ভোলার গ্যাসক্ষেত্রের সামগ্রিক মজুত মূল্যায়ন ও আরও ১৪টি নতুন কূপ খননের লক্ষ্যে কাজ করছে, যা সফল হলে ভোলার গ্যাস বরিশাল ও খুলনার মূল ভূখণ্ডের জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা যাবে।

রাষ্ট্রীয় গ্যাস অনুসন্ধানকারী প্রতিষ্ঠান বাপেক্সের জনবল ও রিগ সীমাবদ্ধতার কারণে একই সাথে একাধিক কূপে খননকাজ চালানো সম্ভব ছিল না। গ্যাজপ্রম তাদের আধুনিক আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি ও দ্রুততম সময়ে কাজ সম্পন্ন করার ফাস্ট-ট্র্যাক দক্ষতার মাধ্যমে এই ঘাটতি পূরণ করেছে। বর্তমানে বাপেক্স ও গ্যাজপ্রম যৌথ অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে ভোলার গ্যাসক্ষেত্রে দ্বিমাত্রিক ও ত্রিমাত্রিক ভূকম্পন জরিপ বা সিসমিক সার্ভে পরিচালনার জন্য চুক্তি সই করেছে। এর মাধ্যমে মাটির নিচে গ্যাসের সঠিক মজুত ও অবস্থান সুনির্দিষ্টভাবে নির্ণয় করা সহজ হচ্ছে। এছাড়া দেশের জ্বালানি খাতের টেকসই উন্নয়নে পেট্রোবাংলাকে স্ট্র্যাটেজিক গ্যাস সেক্টর মাস্টার প্ল্যান তৈরিতে কারিগরি সহযোগিতা দিতেও গ্যাজপ্রম সম্মত হয়েছে।

গ্যাজপ্রম কেবল সমতলের গ্যাসক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না। তারা চট্টগ্রামের দুর্গম পার্বত্য অঞ্চল ও বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য বাংলাদেশের সাথে কৌশলগত যৌথ উদ্যোগ গঠনের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের বিশাল সমুদ্রাঞ্চল থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে সমুদ্রভিত্তিক অনুসন্ধান ব্যাহত হয়েছে। গ্যাজপ্রমের মতো অভিজ্ঞ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা আমাদের এই অফশোর গ্যাস অনুসন্ধানে নতুন গতি এনে দিতে পারে।
আমদানিকৃত চড়া দামের এলএনজির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা যে আমাদের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা দিতে পারে না, তা বর্তমান চরম গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট থেকে প্রমাণিত। দেশের সার্বভৌমত্ব এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সচল রাখতে নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের কোনো বিকল্প নেই। গ্যাজপ্রমের মতো দক্ষ ও বিশ্বস্ত আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সাথে কৌশলগত সহযোগিতা বাড়ালে বাংলাদেশ দ্রুত এই সংকট থেকে মুক্তি পেতে পারে। সরকারের উচিত হবে ভোলার গ্যাস দ্রুত মূল ভূখণ্ডে এনে ব্যবহার করার পাশাপাশি গ্যাজপ্রমের প্রস্তাবিত অফশোর ও পার্বত্য অঞ্চলে যৌথ অনুসন্ধানের সুযোগগুলোকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা।

এদিকে বাংলাদেশ-রাশিয়া দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও জ্বালানি খাতের যৌথ প্রকল্প নিয়ে প্রকাশিত অসত্য সংবাদের স্পষ্টীকরণ দিয়েছে ঢাকায় নিযুক্ত রুশ দূতাবাস। গত ১৯ আগস্ট রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও দূতাবাসের পেজে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ‘২০১২ সাল থেকে গ্যাজপ্রম ভোলাসহ বিভিন্ন স্থানে ২০টির বেশি কূপ সফলভাবে খনন করে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ বাড়িয়েছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ সার্বিক সহযোগিতার বিষয়ে বস্তুনিষ্ঠ ও তথ্যভিত্তিক সংবাদ প্রকাশের আহ্বান জানায় দূতাবাস।’

লেখক: শিক্ষক ও স্বাধীন সাংবাদিক

আরো