বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৬:৩৪ অপরাহ্ণ

চার বছরেও হদিস নেই ঢাকা উত্তর বন্ডের ৮৯৩ নথির

বিশেষ প্রতিবেদক

কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট ভাগ হওয়ার চার বছর পেরিয়ে গেলেও ঢাকা উত্তর বন্ড কমিশনারেটের ৮৯৩টি প্রতিষ্ঠানের নথির এখনো কোনো সন্ধান মেলেনি। এসব নথির মধ্যে সরকারের বড় অঙ্কের পাওনা ও বকেয়া সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রও রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। দীর্ঘদিন বিষয়টি নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ না থাকলেও সম্প্রতি নথিগুলো উদ্ধারে তৎপর হয়েছে ঢাকা উত্তর বন্ড কমিশনারেট।

নথি উদ্ধারের পাশাপাশি সরকারের নিরঙ্কুশ বকেয়া চিহ্নিত ও আদায়ে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। একই সঙ্গে নিখোঁজ নথির সন্ধান এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর অস্তিত্ব যাচাইয়ে মাঠপর্যায়ে পরিদর্শনেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, রপ্তানি সেবা সহজ করার লক্ষ্যে ২০২২ সালের আগস্টে তৎকালীন ঢাকা বন্ড কমিশনারেটকে ভাগ করে ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ বন্ড কমিশনারেট গঠন করা হয়। বিভাজনের পর ঢাকা উত্তর বন্ডের আওতায় পড়ে মোট ২ হাজার ৬০৮টি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ বন্ড কমিশনারেট ১ হাজার ৭১৫টি প্রতিষ্ঠানের নথি উত্তর বন্ডে হস্তান্তর করে। তবে বাকি ৮৯৩টি প্রতিষ্ঠানের নথি হস্তান্তর করা হয়নি।

নথি না পাওয়ার বিষয়টি জানিয়ে ঢাকা উত্তর বন্ড কমিশনারেট থেকে একাধিকবার ঢাকা দক্ষিণ বন্ড কমিশনারেটকে চিঠি দেওয়া হয়। ২০২৩ সালে উত্তর বন্ডের তৎকালীন উপকমিশনার চপল চাকমা দুই দফায় এসব নথি হস্তান্তরের অনুরোধ করেন। পরে দক্ষিণ বন্ডের তৎকালীন উপকমিশনার সাদিয়া আফরোজ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকা চেয়ে উত্তর বন্ডকে চিঠি দেন।

এরপর ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে দক্ষিণ বন্ডের তৎকালীন কমিশনার আহসানুল হক নথি হস্তান্তর না হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর বিআইএন নম্বরসহ পূর্ণাঙ্গ তালিকা পাঠানোর অনুরোধ করেন। কিন্তু এরপরও নথি উদ্ধারে কার্যকর অগ্রগতি হয়নি। কয়েকজন কর্মকর্তাকে মৌখিকভাবে দায়িত্ব দেওয়ার মধ্যেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ ছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

ফলে পরবর্তী প্রায় তিন বছর ৮৯৩ প্রতিষ্ঠানের নথি না পাওয়ার বিষয়টি কার্যত আড়ালেই থেকে যায়।

বকেয়া আদায়ে গিয়ে বেরিয়ে আসে তথ্য

সম্প্রতি রাজস্ব আহরণ বাড়াতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে সরকারের নিরঙ্কুশ বকেয়া আদায় নিয়ে কাজ শুরু করে ঢাকা উত্তর বন্ড কমিশনারেট। এ-সংক্রান্ত হিসাব করতে গিয়ে কর্মকর্তাদের নজরে আসে দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ থাকা নথির বিষয়টি।

ঢাকা উত্তর বন্ডের বর্তমান কমিশনার ড. নাহিদা ফরিদী বলেন, এনবিআরের নির্দেশনায় সরকারের নিরঙ্কুশ বকেয়া আদায়ের বিষয়ে একটি বৈঠক করা হয়। বকেয়ার তথ্য খুঁজতে গিয়ে নথির বিষয়টি সামনে আসে। নথির সন্ধান পেতে ইতোমধ্যে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

সূত্র জানায়, ঢাকা উত্তর বন্ডের সহকারী কমিশনার মো. রিদুয়ান সরদারকে প্রধান করে গঠিত কমিটিকে নিখোঁজ নথি ও সরকারের বকেয়া সংক্রান্ত ফাইল খুঁজে বের করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কমিশনারেট ভাগের সময় যেসব নথি হস্তান্তর হয়নি, সেগুলোর বিষয়েও মনিটরিংয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তাকে।

২৪ সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রতিবেদন

গত ১২ সেপ্টেম্বর ঢাকা উত্তর বন্ড কমিশনারেটে নথি ব্যবস্থাপনা ও সরকারের নিরঙ্কুশ বকেয়া আদায় নিয়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এনবিআর চেয়ারম্যানের নির্দেশনায় অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে চার বছর ধরে ৮৯৩ প্রতিষ্ঠানের নথি না পাওয়ার বিষয়টি বিস্তারিতভাবে উঠে আসে।

বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, গঠিত কমিটিকে আগামী ২৪ সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে উত্তর বন্ড কমিশনারেটের শাখা সহকারীদের ১৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সংশ্লিষ্ট শাখার সব নথির তথ্য হালনাগাদ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া যেসব প্রতিষ্ঠানের কাছে সরকারের নিরঙ্কুশ বকেয়া রয়েছে, সেসব প্রতিষ্ঠানের নথি হালনাগাদ এবং প্রয়োজনে সরেজমিন পরিদর্শনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নথির তথ্য নিয়মিত আপডেট রাখার বিষয়েও কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ বন্ডের বর্তমান কমিশনার মোহাম্মদ হাসমত আলী বলেন, ঢাকা উত্তর বন্ডের ৮৯৩টি প্রতিষ্ঠানের নথি হস্তান্তর না হওয়ার বিষয়টি তার জানা নেই।

গায়েব নথি নিয়ে নানা প্রশ্ন

এনবিআর সূত্র জানায়, গত কয়েক বছরে রাজস্ব প্রশাসনকে পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমসের বিভিন্ন দপ্তর ভাগ করে নতুন কর অঞ্চল, ভ্যাট কমিশনারেট ও কাস্টমস হাউস গঠন করা হয়েছে। এসব দপ্তর পুনর্বিন্যাসের সময় নথি হস্তান্তরে বিভিন্ন জায়গায় কিছু ফাইলের সন্ধান না পাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।

তবে ঢাকা উত্তর বন্ড কমিশনারেটের ৮৯৩ প্রতিষ্ঠানের নথি না পাওয়ার ঘটনাটিকে বড় ধরনের ঘটনা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। দীর্ঘ সময় ধরে দুই বন্ড কমিশনারেটের মধ্যে চিঠি চালাচালি হলেও নথিগুলো উদ্ধারে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর সঙ্গে যোগসাজশ করে সরকারের বড় অঙ্কের বকেয়া সংক্রান্ত নথি সরিয়ে ফেলা হয়ে থাকতে পারে। এর সঙ্গে বন্ড কমিশনারেটের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো প্রমাণিত হয়নি।

কর্মকর্তারা বলছেন, নথি না থাকায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সরকারের প্রকৃত পাওনা নির্ধারণ ও আদায় জটিল হয়ে পড়তে পারে।

অটোমেশন না থাকায় ঝুঁকি বাড়ছে

বন্ড ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিন ধরে অটোমেশন চালুর কথা বলা হলেও এখনো কার্যকরভাবে তা বাস্তবায়িত হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তাদের মতে, কাগজনির্ভর ব্যবস্থাপনার কারণে নথি হারানো, তথ্যের অসামঞ্জস্য এবং বিভিন্ন অনিয়মের ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।

গত এক দশক ধরে বন্ড অটোমেশনের আলোচনা থাকলেও ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ—কোনো বন্ড কমিশনারেটেই কার্যকর বন্ড ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা চালু হয়নি। ফলে নথি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের অনিয়মের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

শুধু বন্ড কমিশনারেট নয়, কাস্টম হাউস ও ভ্যাট কমিশনারেটের মধ্যে নথি স্থানান্তরের ক্ষেত্রেও এমন সমস্যা রয়েছে বলে একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, ডিজিটাল ও কেন্দ্রীয় নথি ব্যবস্থাপনা চালু করা গেলে এ ধরনের নথি নিখোঁজের ঘটনা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।

আরো