লাজারাসের নতুন সাইবার হামলায় পোস্ট-কোয়ান্টাম ক্রিপ্টোগ্রাফির ব্যবহার শনাক্ত করল ক্যাসপারস্কি
নিজস্ব প্রতিবেদক
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে সাইবার গুপ্তচরবৃত্তির নতুন কৌশল প্রয়োগ করছে উত্তর কোরিয়াভিত্তিক হ্যাকার গোষ্ঠী লাজারাস। গোষ্ঠীটির ‘অপারেশন সিংকহোল’-এর নতুন একটি অভিযানে আরও উন্নত টুল ও কৌশল ব্যবহারের প্রমাণ পেয়েছে ক্যাসপারস্কির গ্লোবাল রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস টিম (জিআরইএটি)। এ অভিযানে লক্ষ্যবস্তু ব্যক্তিদের কাছে ভুয়া চাকরির প্রস্তাবের আড়ালে ফিশিং ইমেইল পাঠানো হচ্ছে। এসব ইমেইলের মাধ্যমে তাঁদের এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া পোর্টফোলিও ও সিভি ওয়েবসাইটে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে সাইবার হামলা চালানোর ক্ষেত্রে লাজারাসের আগের ‘অপারেশন ড্রিমজব’-এর সঙ্গে এ কৌশলের মিল রয়েছে। এ ছাড়া, গবেষকেরা গিটহাব (GitHub) অ্যাকাউন্টের সঙ্গে যুক্ত একটি গিটহাব পেজেস (GitHub Pages) ওয়েবসাইট শনাক্ত করেছেন, যা হামলাকারীদের কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল (C2) চ্যানেল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল।
তদন্তে দক্ষিণ কোরিয়ায় বহুল ব্যবহৃত আর্থিক নিরাপত্তা ও ব্যবহারকারী শনাক্তকরণ সফটওয়্যার ক্রসওয়েব ইএক্স (CrossWeb EX)-এর একটি নিরাপত্তা দুর্বলতাকে সম্ভাব্য সংক্রমণের প্রবেশপথ হিসেবে ব্যবহারের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। গবেষকেরা হামলার সংক্রমণ-প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করে একাধিক ক্ষতিকর সফটওয়্যার শনাক্ত করেছেন। এর মধ্যে টাচহাব (TouchHub) ও ক্লায়েন্টহাব (ClientHub) নামের দুটি টুল আগে নথিভুক্ত হয়নি। এগুলো ম্যালওয়্যার ইনস্টল, আক্রান্ত কম্পিউটারে নির্দেশনা কার্যকর এবং হামলাকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনে ব্যবহৃত হয়। এদের একটি সংস্করণ সি২ (C2) যোগাযোগের জন্য ড্রপবক্স (Dropbox) ব্যবহার করে।
এ অভিযানে এলপিইক্লায়েন্ট (LPEClient)-এর হালনাগাদ সংস্করণও ব্যবহার করা হচ্ছে। এটি আক্রান্ত কম্পিউটারের সিস্টেম ও নিরাপত্তা সফটওয়্যার-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করে সেগুলো এনক্রিপ্ট করে হামলাকারীদের কাছে পাঠায়। বিশেষভাবে উদ্বেগের বিষয় হলো, ম্যালওয়্যারটি নিরাপদ যোগাযোগ স্থাপনে এমএল-কেইএম-১০২৪ (ML-KEM-1024) নামের একটি পোস্ট-কোয়ান্টাম ক্রিপ্টোগ্রাফিক পদ্ধতি ব্যবহার করছে। পাশাপাশি শনাক্ত হওয়া এড়াতে মেমোরির সুরক্ষা-ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণের কাজে ব্যবহৃত হুক নিষ্ক্রিয় করার মতো উন্নত কৌশলও প্রয়োগ করছে।
ক্যাসপারস্কির জিআরইএটি দলের জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা গবেষক সুজুন রিউ বলেন, “লাজারাস তাদের সাইবার কার্যক্রমের পরিধি ক্রমাগত বাড়াচ্ছে। নতুন অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন টুল তৈরি করছে এবং পরিচিত টুলগুলোতেও পরিবর্তন আনছে। ‘অপারেশন ফ্ল্যাশহোল’ নিয়ে আমাদের বিশ্লেষণ এবং আগের তদন্তের তথ্য থেকে ধারণা পাওয়া যায়, গোষ্ঠীটি তাদের দীর্ঘদিনের হামলার কৌশলে এআই যুক্ত করছে। লাজারাসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য হুমকি সৃষ্টিকারী গোষ্ঠীর মধ্যেও আমরা একই প্রবণতা লক্ষ করেছি। তবে বিশেষভাবে নজর দেওয়ার বিষয় হলো, ভবিষ্যতের কোয়ান্টাম প্রযুক্তির সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলায় তৈরি ক্রিপ্টোগ্রাফি ব্যবহারে লাজারাসের অগ্রগতি। আমাদের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অন্তত ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে তারা এ প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। অর্থাৎ, বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার এক বছরেরও বেশি সময় আগে থেকেই নিজেদের ম্যালওয়্যারের যোগাযোগ সুরক্ষিত রাখতে এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে আসছে গোষ্ঠীটি।”
প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ ধরনের সাইবার হামলা থেকে সুরক্ষিত থাকতে কর্মীদের ফিশিং ইমেইল ও ভুয়া ওয়েবসাইট শনাক্ত করার প্রশিক্ষণ দেওয়া, সফটওয়্যারের নিরাপত্তা দুর্বলতা দ্রুত সমাধান করা, ব্যবহারকারীদের প্রবেশাধিকার সীমিত রাখা এবং ক্লাউড সংযোগ নিয়মিত পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দিয়েছে ক্যাসপারস্কি। পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তা জোরদারে ক্যাসপারস্কি নেক্সট সলিউশন ব্যবহারের সুপারিশ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এ ছাড়া, ম্যানেজড ডিটেকশন অ্যান্ড রেসপন্স (এমডিআর), ইনসিডেন্ট রেসপন্স-এর মতো ম্যানেজড সিকিউরিটি সেবা এবং থ্রেট ইন্টেলিজেন্স ব্যবহারের মাধ্যমে সাইবার হুমকি সম্পর্কে আগাম ধারণা পাওয়া, ক্ষতিকর কার্যক্রম শনাক্ত করা, নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ঘটনা তদন্ত করা এবং প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক সাইবার নিরাপত্তা সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব।
