Wednesday, 24 June, 2026, 11:39 pm

আর্থিক চাপে বিএসআরএম স্টিলস

সুদ ও ঋণের বাড়তি চাপের মধ্যে পড়ে থাকা পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রকৌশল খাতের প্রতিষ্ঠান বিএসআরএম স্টিলস লিমিটেড সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে এন্টারটেইনমেন্ট খাতে নজিরবিহীন ব্যয় দেখিয়েছে। এই ব্যয়ের অঙ্ক প্রকাশের পর সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বিস্ময় এবং ক্ষোভ বিরাজ করছে।

বিনিয়োগকারীদের বক্তব্য—যে প্রতিষ্ঠানের ফাইন্যান্স কস্ট ক্রমেই বাড়ছে এবং সুদ পরিশোধ করতেই হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে বিনোদনের নামে কোটি কোটি টাকা ব্যয় দেখানো দায়িত্বহীনতার পরিচায়ক। তাঁদের প্রশ্ন—প্রকৃতপক্ষে কি কোম্পানি এত অর্থ এ খাতে খরচ করেছে, নাকি ভুয়া ভাউচার দেখিয়ে অর্থ অপচয় বা অপব্যবহারের সুযোগ হয়েছে? বিনিয়োগকারীদের দাবি, স্বাধীন তদন্ত হলে বিষয়টির প্রকৃত চিত্র উঠে আসবে।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৩০ জুন ২০২৫ সমাপ্ত অর্থবছরে বিএসআরএম স্টিলস এন্টারটেইনমেন্ট খাতে ব্যয় দেখিয়েছে ৮ কোটি ১৮ লাখ ২৯ হাজার টাকা, যা আগের বছরে ছিল ১ কোটি ৯৫ লাখ ৬৯ হাজার টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বৃদ্ধি ৩১৮ শতাংশ। গত ১৬ বছরের মধ্যে এটিই কোম্পানিটির সর্বোচ্চ এন্টারটেইনমেন্ট ব্যয়, যা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সন্দেহ আরও বাড়িয়েছে।

একই সাথে কোম্পানির নিরীক্ষিত বিবরণীতে দেখা যায়, স্থায়ী সম্পদ অধিগ্রহণে ব্যয় দেখানো হয়েছে ১,৬৩৫ কোটি ২৭ লাখ টাকারও বেশি, যেখানে আগের বছর ব্যয় ছিল মাত্র ১২৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ বৃদ্ধি ১,২০৫ শতাংশ। এই বিপুল ব্যয় নিয়ে বিনিয়োগকারীদের প্রশ্ন—এ ব্যয়ের প্রতিটি খাত কি যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছে?

কোম্পানির প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) নুরুল করিম জানান, মিরেশ্বরাইতে বছরে ছয় লাখ মেট্রিক টন উৎপাদনক্ষমতার নতুন রোলিং মিল স্থাপনের কারণে স্থায়ী সম্পদ অধিগ্রহণ ব্যয় অত্যন্ত বেড়েছে। তবে বিনিয়োগকারীরা মনে করছেন—এই ব্যয়গুলো সঠিকভাবে যাচাই হওয়া প্রয়োজন।

এদিকে দীর্ঘমেয়াদি ঋণসংগ্রহেও বড় ধরনের বৃদ্ধি দেখা গেছে। সদ্য বিদায়ী বছরে বিএসআরএম স্টিলস নিয়েছে ২,২২৪ কোটি ৪৭ লাখ টাকার দীর্ঘমেয়াদি ঋণ, যেখানে আগের বছর তা ছিল ৮৪৪ কোটি টাকা। এর ফলে ফাইন্যান্স কস্ট বেড়েছে প্রায় ৬০ কোটি টাকা, বৃদ্ধির হার ৩৪ শতাংশ। সিএফওর ব্যাখ্যা—নতুন প্রজেক্টের জন্য নেওয়া ২,১০০ কোটি টাকার ঋণের ছয় মাসের সুদই ফাইন্যান্স কস্টে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

বাজার বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অতিরিক্ত সুদব্যয় কোম্পানির ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অনেক কোম্পানি উচ্চ ব্যয়সমৃদ্ধ প্রকল্প হাতে নিয়ে বাস্তবায়নের সময় দুর্নীতির ঝুঁকিতে পড়ে। এমন প্রকল্প প্রত্যাশিত ফল না দিলে প্রতিষ্ঠান ঋণ খেলাপিতে পরিণত হতে পারে—যার ক্ষতি শেয়ারহোল্ডারদের ওপরই এসে পড়ে।

এন্টারটেইনমেন্ট খাতের ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তুললে কোম্পানির সিএফও বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতে অনীহা দেখান। বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ—অডিট রিপোর্টে পৃথক খরচের খাত উল্লেখ না থাকায় প্রকৃত ব্যয় যাচাই করা কঠিন।

পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্যপরিষদের সভাপতি মিজান উর রশীদ চৌধুরী বলেন, তাঁর মতে এন্টারটেইনমেন্ট খাতে দেখানো ব্যয়ের বড় অংশই অস্বাভাবিক ও প্রশ্নবিদ্ধ। তিনি দাবি করেন, অনলাইনে অধিকাংশ করপোরেট লেনদেন পরিচালিত হওয়ায় এ খাতে এমন ব্যয় অযৌক্তিক হতে পারে। এ বিষয়ে তিনি বিএসইসির প্রতি নতুন অডিটর নিয়োগ করে তদন্ত করার আহ্বান জানান।

কোম্পানির শেয়ারহোল্ডিং কাঠামো অনুযায়ী—

উদ্যোক্তা–পরিচালক: ৭২.০৬%

প্রাতিষ্ঠানিক: ১৮.৫২%

বিদেশি বিনিয়োগকারী: ০.২৫%

সাধারণ বিনিয়োগকারী: ৯.১৭%
পরিশোধিত মূলধন: ৩৭৫ কোটি ৯৫ লাখ টাকা

আরো