সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬, ৯:২৩ অপরাহ্ণ

অগ্রণী ব্যাংকের লকারে ৩ কোটি টাকার স্বর্ণ উধাও!

অগ্রণী ব্যাংকের রমনা করপোরেট শাখার একটি লকার থেকে প্রায় তিন কোটি টাকা মূল্যের স্বর্ণালংকার সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে দুইটি চেক জালিয়াতির মাধ্যমে টাকা তুলে নেওয়ারও অভিযোগ করেছেন কানাডাপ্রবাসী এক নারী। ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে সই জাল ও ভুয়া ঘোষণাপত্র তৈরির মাধ্যমে লকার খুলে স্বর্ণালংকার বের করে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কমন সার্ভিসেস ডিপার্টমেন্টে দেওয়া লিখিত অভিযোগে এসব তথ্য তুলে ধরেছেন ফারজানা রহমান লিমা। অভিযোগের বিষয়ে অগ্রণী ব্যাংক তদন্তের জন্য ইনকোয়ারি বা অডিট টিম গঠনের কথা জানিয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকও অভিযোগটি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, ফারজানা রহমান লিমা ও তার স্বামী ২০১৯ সালের ১৫ জুন কানাডায় পাড়ি জমান। বিদেশ যাওয়ার আগে অগ্রণী ব্যাংকের রমনা করপোরেট শাখার ৪০৯ নম্বর লকারে তিনি নিজের স্বর্ণালংকার জমা রাখেন। একই লকারে তার মায়ের স্বর্ণালংকারও রাখা ছিল।

ফারজানার দাবি, লকারে থাকা তার স্বর্ণালংকারের বর্তমান আনুমানিক বাজারমূল্য ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। আর তার মায়ের গচ্ছিত স্বর্ণালংকারের মূল্য প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে লকারে থাকা দুইজনের স্বর্ণালংকারের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ২ কোটি ৯০ লাখ টাকা।

অভিযোগে বলা হয়েছে, লকার পরিচালনার জন্য ফারজানার নাম অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন তার মা হোস্নে জাহান। তিনি ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই মারা যান। মায়ের মৃত্যুর সময় ফারজানা দেশে ছিলেন না। দীর্ঘদিন পর চলতি বছরের ১২ আগস্ট দেশে ফিরে তিনি জানতে পারেন, তার বোন ফারহানা রহমান লকারটি পরিচালনার জন্য ব্যাংকে আবেদন করেছেন।

ফারজানার অভিযোগ, তার সই জাল করে একটি ‘মিথ্যা ঘোষণাপত্র’ তৈরি করে ২০২৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ব্যাংকে জমা দেওয়া হয়। ওই ঘোষণাপত্রের ভিত্তিতে ব্যাংক তার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ না করেই ফারহানাকে লকার খোলার সুযোগ দেয়। পরে লকারে থাকা তার ও মায়ের স্বর্ণালংকার বের করে নেওয়া হয়।

ফারজানা জানান, দেশে ফিরে গত ২৪ আগস্ট ব্যাংকে গিয়ে লকারের বিষয়ে খোঁজ নিলে তিনি জানতে পারেন, ২০২৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর লকার থেকে স্বর্ণালংকার বের করে নেওয়া হয়েছে এবং পরে লকারটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

তার প্রশ্ন, মালিকের অনুপস্থিতিতে এবং অনুমতি ছাড়া কীভাবে লকার খোলা ও স্বর্ণালংকার বের করা হলো। লকার পরিচালনা, স্বর্ণালংকার উত্তোলন এবং সংশ্লিষ্ট ঘোষণাপত্র তৈরির প্রক্রিয়ায় ব্যাংকের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত ছিলেন কি না, তা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তিনি।

চেক জালিয়াতির অভিযোগ

লকারের স্বর্ণালংকারের পাশাপাশি নিজের স্বাক্ষর করা দুইটি চেক নিয়েও অভিযোগ করেছেন ফারজানা। তার দাবি, বিদেশে যাওয়ার আগে মায়ের দৈনন্দিন ও জরুরি খরচ মেটানোর জন্য তিনি দুইটি চেকে স্বাক্ষর করে রেখে যান।

অভিযোগ অনুযায়ী, ওই চেক বইয়ের দুইটি পাতা ব্যবহার করে চলতি বছরের ২৭ জুলাই ও ৩ আগস্ট অগ্রণী ব্যাংকের পৃথক দুইটি শাখা থেকে টাকা উত্তোলন করা হয়। একটি চেকের মাধ্যমে ৩০ হাজার টাকা এবং অপরটি দিয়ে ৩৮ হাজার ৫০০ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। ফারজানার দাবি, তার বোনের প্রতিনিধি ফাহমিদা ও সামিয়া ওই টাকা উত্তোলন করেন।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ফারহানা রহমান সুমি। তার দাবি, বোনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ‘১০০ শতাংশ মিথ্যা’। তিনি বলেন, বিদেশে যাওয়ার আগে তার বোন দেশে থাকা সম্পদ বা লকারের বিষয়ে তাকে কোনো দায়িত্ব দিয়ে যাননি। চেক জালিয়াতির অভিযোগেরও কোনো ভিত্তি নেই বলে দাবি করেন তিনি।

লকারের স্বর্ণালংকারের বিষয়ে ফারহানা বলেন, তার বোনের গয়নার একটি বাক্স তার কাছে রয়েছে এবং সেগুলো অন্য একটি ব্যাংকের লকারে রাখা আছে। তবে তিনি এখনো সেই লকার খুলে দেখেননি বলেও জানান।

তদন্ত করবে অগ্রণী ব্যাংক

অভিযোগের বিষয়ে অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, অভিযোগটি ব্যাংকের নজরে এসেছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।

তিনি বলেন, অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে একটি ‘ইনকোয়ারি’ বা ‘অডিট টিম’ গঠন করা হচ্ছে। তদন্ত না করে অভিযোগটি সত্য না মিথ্যা—কোনোটিই বলা সম্ভব নয়।

এমডি আরও বলেন, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে এবং কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংশ্লিষ্টতা বা দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ মিললে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পরই প্রকৃত বিষয়টি পরিষ্কার হবে।

জবাব চাইবে বাংলাদেশ ব্যাংক

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, অভিযোগটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বিষয়টি তদন্ত করে দেখবে। পাশাপাশি অগ্রণী ব্যাংকের কাছেও এ বিষয়ে জবাব চাওয়া হবে।

তিনি বলেন, অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

অভিযোগের সত্যতা, লকার পরিচালনার প্রক্রিয়া এবং স্বর্ণালংকার ও টাকা উত্তোলনে কারও অনিয়ম বা সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না—তদন্ত শেষ হলেই তা স্পষ্ট হবে।

আরো