মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৮:৫৩ অপরাহ্ণ

গরিব মানুষ সবচেয়ে বেশি বরিশালে, কম যে বিভাগে

একসময় ‘বাংলার শস্যভাণ্ডার’ আর খাল-নদীর সৌন্দর্যের কারণে ‘বাংলার ভেনিস’ হিসেবে পরিচিত ছিল বরিশাল। দূর-দূরান্ত থেকে আসা বণিকদের হাঁকডাকে গমগম করত এ অঞ্চলের বন্দরগুলো। তবে কালের পরিক্রমায় সেই ঐতিহ্য হারিয়ে এখন দেশের আটটি বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে দরিদ্র বিভাগে পরিণত হয়েছে বরিশাল। কৃষি ও মৎস্য উৎপাদনে ধস, শিল্পকারখানার অভাব এবং পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান না থাকায় চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে এই উপকূলীয় অঞ্চল।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) দারিদ্র্য মানচিত্র ২০২২ অনুযায়ী, জাতীয় পর্যায়ে দারিদ্র্যের হার ১৯ দশমিক ২ শতাংশ হলেও বরিশালে এই হার সর্বোচ্চ ২৬ দশমিক ৬ শতাংশ। একসময় রংপুরকে দেশের দরিদ্রতম বিভাগ হিসেবে গণ্য করা হতো, কিন্তু বর্তমানে সেই শীর্ষ স্থান দখল করেছে বরিশাল। কর্মসংস্থানের তীব্র সংকটে পড়ে এ অঞ্চলের বাসিন্দারা ঢাকামুখী হচ্ছেন। জনশুমারি ২০২২-এর তথ্য বলছে, বরিশালের স্থানীয় অধিবাসীদের ১৮ দশমিক ৬২ শতাংশই এখন ঢাকায় বাস করেন, যার বড় একটি অংশ ঠাঁই নিয়েছেন রাজধানীর বস্তিগুলোতে।

কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি হলেও ধান উৎপাদনে ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছে বরিশাল। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিভাগটিতে আউশ উৎপাদন আগের বছরের ৪ লাখ ৩০ হাজার টন থেকে কমে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৭৪ হাজার টনে। একইভাবে আমন উৎপাদনও হ্রাস পেয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতির অধ্যাপক এ এইচ এম সাইফুল ইসলাম জানান, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে জমিতে লবণাক্ততা বাড়ায় ফসল উৎপাদন মারাত্মক ব্যাহত হচ্ছে।

কৃষির পাশাপাশি ধস নেমেছে মৎস্যসম্পদেও। বিভাগীয় মৎস্য অফিসের হিসাব অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বরিশালে ৩ লাখ ৭২ হাজার টন ইলিশ উৎপাদন হলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা সাড়ে ২৮ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৬৬ হাজার টনে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে কৃষকের পকেটে। বিবিএসের জরিপ বলছে, ধান-গম উৎপাদনে বরিশালের কৃষকদের বার্ষিক নিট আয় মাত্র ৬ হাজার ৮১ টাকা, যা দেশের মধ্যে সর্বনিম্ন।

জ্বালানি সম্পদে সমৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও কাজে লাগানো যায়নি স্থানীয় সম্ভাবনার। ভোলায় বাপেক্সের তথ্যমতে ১ দশমিক ৭৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের বড় মজুদ রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ তিন দশকেও সেখানে উল্লেখযোগ্য কোনো শিল্পায়ন ঘটেনি। বর্তমানে ছয় জেলার পুরো বিভাগে কেবল বরিশাল জেলাতেই উল্লেখ করার মতো ৪০৯টি কারখানা রয়েছে, যেখানে মাত্র ২০ হাজার শ্রমিকের কাজের সুযোগ রয়েছে।

এমন পরিস্থিতির পেছনে নদীনির্ভর যোগাযোগব্যবস্থাকে দায়ী করে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক জানান, দক্ষিণাঞ্চলের প্রভাবশালী নেতারা জাতীয় রাজনীতিতেই বেশি মনোযোগী ছিলেন; যার ফলে পুরো অঞ্চলের সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা নেওয়া সম্ভব হয়নি।

বরিশাল-১ আসনের সংসদ সদস্য ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, জ্বালানি সংকট ও দুর্গম যোগাযোগের কারণেই এই উপকূলীয় এলাকা পিছিয়ে পড়েছে। তবে ভোলার গ্যাসকে স্থানীয় শিল্প ও সার কারখানায় ব্যবহার, পায়রা বন্দর পুরোদমে চালু করা এবং ভোলা-বরিশাল সংযোগ মহাসড়ক নির্মিত হলে দ্রুতই দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) দারিদ্র্য মানচিত্র ২০২২ অনুযায়ী, ২৬ দশমিক ৬ শতাংশ দারিদ্র্যের হার নিয়ে দেশের আটটি বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে দরিদ্র বিভাগ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে বরিশাল। অন্যদিকে, মাত্র ১৫ দশমিক ২ শতাংশ দারিদ্র্যের হার নিয়ে তালিকার সবচেয়ে ভালো অবস্থানে বা শীর্ষ স্থানে রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগ।

একসময় দেশের দরিদ্রতম অঞ্চলের তালিকায় রংপুর শীর্ষে থাকলেও বর্তমানে ২৫ দশমিক ০ শতাংশ দারিদ্র্যের হার নিয়ে রংপুর রয়েছে দ্বিতীয় স্থানে। এ ছাড়া ময়মনসিংহে ২২ দশমিক ৬ শতাংশ, ঢাকায় ১৯ দশমিক ৬ শতাংশ, সিলেটে ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ, খুলনায় ১৭ দশমিক ১ শতাংশ এবং রাজশাহীতে ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ দারিদ্র্যের হার রেকর্ড করা হয়েছে।

আরো