জনস্বাস্থ্যে নতুন হুমকি: তরুণদের আকৃষ্ট করছে সুগন্ধি সিগারেট
বিশ্বজুড়ে বর্তমানে প্রায় ১২০ কোটিরও বেশি মানুষ নিয়মিত ধূমপান করে, আর ধূমপানের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবে প্রতিবছর ৮০ লাখের বেশি প্রাণহানি ঘটে। ধূমপানের ক্ষতি সম্পর্কে জানা সত্ত্বেও এর ব্যবহার কমছে না। বরং সম্প্রতি এক নতুন প্রবণতা— সুগন্ধি বা ফ্লেভারযুক্ত সিগারেট— তরুণদের মধ্যে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নতুন ধরণের সিগারেট সাধারণ সিগারেটের তুলনায় আরও বেশি ক্ষতিকর ও আসক্তিকর।
দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় দেখা যাচ্ছে, ফল, চকলেট, মেনথল বা ভেষজ ঘ্রাণযুক্ত সিগারেট এখন তরুণ-তরুণীদের মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। কর্পোরেট পেশাজীবীরাও এর ভোক্তা হিসেবে যুক্ত হচ্ছেন। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন— এই ফ্লেভারযুক্ত সিগারেট শ্বাসতন্ত্র ও মুখগহ্বরের ক্যানসার, ফুসফুসের অ্যালার্জি এবং নিকোটিন আসক্তি বহু গুণ বাড়িয়ে দেয়।
তামাকবিরোধী সংগঠনগুলোর অভিযোগ, তামাক কোম্পানিগুলো পরিকল্পিতভাবে তরুণ প্রজন্মকে লক্ষ্য করছে। তারা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে প্রচারণা চালাচ্ছে, উপহারসামগ্রী ও সামাজিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ব্র্যান্ড প্রচার করছে— যা আইনবিরুদ্ধ। সংগঠনগুলোর দাবি, বাংলাদেশেও সুগন্ধি ও ই-সিগারেট সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা জরুরি, এবং আইন প্রয়োগের মাধ্যমে দোকানগুলোর বিক্রির ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আনা দরকার।
দেশে কোন কোন ব্র্যান্ড চলছে
বাজারে বর্তমানে এরিস, মন্ড, এলিগেন্স, বেনসন, মার্লবোরো, গোল্ডলিফ, লাকি, নেভি ও ক্যামেলসহ নানা ব্র্যান্ডের সুগন্ধি সিগারেট পাওয়া যাচ্ছে। এর মধ্যে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত “এরিস” ও “মন্ড” ব্র্যান্ডের স্ট্রবেরি, আপেল ও চকলেট স্বাদযুক্ত প্যাকেটের দাম ১৪০ থেকে ১৮০ টাকার মধ্যে। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর দাম ১৬০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত।
গুলশান, ধানমন্ডি ও বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাগুলোর দোকানদারদের মতে, এই পণ্যগুলো ধনী ও তরুণ ক্রেতাদের কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয়, বিশেষত নারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে এর ব্যবহার বাড়ছে। একাধিক দোকানি জানিয়েছেন, অনেক তরুণী সাধারণ সিগারেটের গন্ধ এড়াতে সুগন্ধিযুক্ত সিগারেট বেছে নিচ্ছেন, কারণ এতে “গন্ধ নেই” বলে ধরা পড়ে না।
অনেক তরুণ মনে করেন, সুগন্ধি বা চিকন সিগারেটের নিকোটিন কম এবং এটি “লাইট” হওয়ায় কম ক্ষতিকর। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। ফ্লেভার যুক্ত করার ফলে সিগারেটের রাসায়নিক উপাদান আরও জটিল হয়, যা ফুসফুস ও মস্তিষ্কে দ্রুত প্রভাব ফেলে এবং আসক্তি বাড়ায়।
ডা. লেলিন চৌধুরীর মতে, ফ্লেভারযুক্ত সিগারেটেও সাধারণ তামাকের সমান ক্ষতি থাকে, বরং এতে থাকা কৃত্রিম সুগন্ধি ও রাসায়নিক পদার্থ ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি কয়েকগুণ বাড়িয়ে তোলে। তাই তিনি মেনথল বাদে সব ধরনের সুগন্ধি সিগারেট নিষিদ্ধের পক্ষে মত দিয়েছেন।
বাংলাদেশ ক্যানসার সোসাইটির সভাপতি ডা. গোলাম মহিউদ্দিন ফারুক বলেন, ফ্লেভারিং এজেন্ট ব্রেইনের সেল ক্ষতিগ্রস্ত করে, চিন্তাশক্তি কমিয়ে দেয় এবং শেষ পর্যন্ত মাদকাসক্তির ঝুঁকি বাড়ায়।
আইন ও নীতিগত অবস্থান
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন’ সংশোধনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। প্রস্তাবনায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে তামাকজাত দ্রব্যে কোনো ধরণের ফ্লেভার, রং বা মিষ্টিদ্রব্য ব্যবহার করা যাবে না।
জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেলের মহাপরিচালক মো. আখতারউজ-জামান জানান, তরুণদের আকৃষ্ট করতে সুগন্ধির ব্যবহার তামাক কোম্পানির কৌশল। তাই আইনে এ বিষয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।
অন্যদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সুগন্ধি সিগারেট নিষিদ্ধে তাদের কোনো আপত্তি নেই, তবে এতে সরকারের রাজস্ব আয় কিছুটা কমতে পারে। বর্তমানে দেশে সিগারেটের চারটি মূল্যস্তরে ৮৩% পর্যন্ত কর আরোপ করা রয়েছে।
নীতিবিশ্লেষক ও স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদদের মতে, কর কাঠামোতে লাইট, সুগন্ধি বা ফ্লেভারভিত্তিক শ্রেণিবিভাগ তুলে দেওয়া উচিত। দাম, ওজন ও মান বিবেচনা করে একক করব্যবস্থা চালু করলে তামাক কোম্পানির কৌশল ভেস্তে যাবে।
বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, সুগন্ধি সিগারেট কেবল একটি বিপণন কৌশল নয়, বরং জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। তরুণ সমাজকে আসক্তি থেকে রক্ষা করতে হলে আইন প্রয়োগ, জনসচেতনতা ও বাজার মনিটরিং— এই তিনটি দিকেই জোর দিতে হবে।