রবিবার, ১৮ জানুয়ারি, ২০২৬, ২:০৮ অপরাহ্ণ

বেস্ট হোল্ডিংসের ‘বিনিয়োগ’ জালিয়াতি : রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও শেয়ারবাজার থেকে হাজার কোটি টাকা লোপাট

বি‌ডিমেইল ডেস্ক: শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হোটেল ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান বেস্ট হোল্ডিংস লিমিটেডের বিরুদ্ধে দেশের আর্থিক খাতের অন্যতম বড় অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগ উঠেছে। সর্বশেষ বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) তদন্ত প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ভুয়া সম্পদ দেখানো, জালিয়াতির মাধ্যমে শেয়ার প্রিমিয়াম আদায় এবং প্লেসমেন্টে অনিয়মসহ নানা অভিযোগের তথ্য উঠে এসেছে।

বিএসইসির প্রতিবেদনে বলা হয়, বেস্ট হোল্ডিংস শেয়ারবাজার ও ব্যাংক খাত থেকে ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বেশি অর্থ তুলে নেয়, যার বড় অংশই বিদেশে পাচার করা হয়। রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচটি ব্যাংক—সোনালী, অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও আইসিবিকে ভুয়া দলিল ও মুনাফার আশ্বাস দিয়ে বিনিয়োগে প্রলুব্ধ করে প্রতিষ্ঠানটি। শুধুমাত্র সোনালী ব্যাংকই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৪২৩ কোটি টাকা।

এছাড়া তদন্তে দেখা গেছে, কোম্পানিটি অডিট ফার্ম ও রেটিং এজেন্সিগুলোর সঙ্গে আঁতাত করে আর্থিক প্রতিবেদন ও সম্পদের মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন করে। ৮ কোটি ৮৩ লাখ টাকা মূলধনের কোম্পানিকে ড. খায়রুল হোসেনের নেতৃত্বাধীন কমিশন অনুমোদন দেয় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার বন্ড ছাড়ার, যার বিপরীতে ১০ টাকার শেয়ারে ৫৫ টাকা প্রিমিয়াম নেওয়া হয়।

এ ধরনের প্রক্রিয়ায় মিউচুয়াল ফান্ড ও ব্যাংকগুলো থেকে শত শত কোটি টাকা আদায় করে বেস্ট হোল্ডিংস। পরে এসব তহবিলের বড় অংশ সহযোগী প্রতিষ্ঠান বা স্পেশাল পারপাস ভেহিকেলের মাধ্যমে স্থানান্তর করে কোম্পানির পরিচালকরা। এতে অর্থপাচারের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দেখা যায় বলে মন্তব্য তদন্ত কমিটির।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুরো ঘটনাটি ছিল এক ‘অশুভ আঁতাত’ বা আনহোলি নেক্সাস—যেখানে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি, আমলা, নিরাপত্তা সংস্থার সাবেক কর্মকর্তা এবং আর্থিক খাতের নীতিনির্ধারকেরা প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। তদন্ত কমিটির মতে, এটি চরম ক্রোনি ক্যাপিটালিজমের (চামচা পুঁজিবাদ) উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

বেস্ট হোল্ডিংসের চেয়ারম্যান আমিন আহমেদ ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাসান আহমেদ বর্তমানে দুর্নীতির মামলায় গ্রেফতার। প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন রেস ম্যানেজমেন্টের চেয়ারম্যান চৌধুরী নাফিজ সরাফাত ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. হাসান তাহের ইমাম, যাঁদের বিরুদ্ধে আজীবন নিষেধাজ্ঞা ও বড় অঙ্কের জরিমানার সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বিস্ময় প্রকাশ করা হয়েছে বিএসইসির দায়িত্বে থাকা শীর্ষ কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে। তদন্তে বলা হয়, শুধুমাত্র অনুমোদন নয়, তারা এই কেলেঙ্কারিতে সরাসরি সুবিধাভোগী হিসেবে কাজ করেছেন। কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. খায়রুল হোসেন, অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামসহ একাধিক কমিশনারের বিরুদ্ধে আজীবন নিষেধাজ্ঞা আরোপের সুপারিশ এসেছে।

এছাড়া কিছু নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান, রেটিং এজেন্সি ও ট্রাস্টি প্রতিষ্ঠানও অনিয়মে জড়িত বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে ৩ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত নিষিদ্ধ করার সুপারিশ করা হয়েছে।

বিশেষ সুপারিশ ও আইনগত প্রস্তাবনা

কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী,

বেস্ট হোল্ডিংসের বিরুদ্ধে ফরেনসিক অডিট করানো

মানি লন্ডারিং আইনে দুদকে তদন্তের জন্য রেফার করা

জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আর্থিক জরিমানা ও নিষেধাজ্ঞা আরোপ

ভুক্তভোগী বিনিয়োগকারী ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের অর্থ পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া

এছাড়া বেস্ট হোল্ডিংসের প্রি-আইপিও প্লেসমেন্টের লক-ইন মেয়াদ আরও তিন বছর বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।

অর্থনীতিবিদ ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, “শেয়ারবাজারের বড় সংকট এখন আস্থার। এ ধরনের ঘটনা বিচার না হলে সাধারণ মানুষ আরও বিমুখ হবে। সুশাসন নিশ্চিত না করা পর্যন্ত বাজার ঘুরে দাঁড়াবে না।”

আরো