জামায়াত জোট ঘিরে এনসিপিতে নারীদের অনাস্থা, পদত্যাগের হিড়িক
জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তকে ঘিরে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ভেতরে তীব্র অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে দলটির শীর্ষস্থানীয় নারী নেত্রীদের একাংশ এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য অবস্থান নিয়েছেন। কেউ পদত্যাগ করেছেন, কেউ নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন, আবার কেউ দলীয় কার্যক্রমে নিষ্ক্রিয় থাকার ঘোষণা দিয়েছেন।
দলীয় সূত্র জানায়, গত বৃহস্পতিবার এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের বাসায় অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে ছয়জন নারী নেতা জামায়াতের সঙ্গে আসন সমঝোতা নিয়ে তীব্র আপত্তি তোলেন। বৈঠকে অংশ নেন সামান্থা শারমিন, মনিরা শারমিন, নুসরাত তাবাসসুম, তাজনূভা জাবীন, তাসনিম জারা ও নাহিদা সারোয়ার নিভা। সেখানে তারা স্পষ্ট করে জানান, জামায়াতের সঙ্গে জোট হলে তারা সম্মিলিতভাবে পদত্যাগের পথেও যেতে পারেন।
বৈঠক–সংশ্লিষ্টদের দাবি, নারী নেত্রীদের কেউ কেউ বিএনপির সঙ্গে জোট অথবা এককভাবে নির্বাচনে যাওয়ার পক্ষে মত দেন। তাদের আশঙ্কা, জামায়াতের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতা ভবিষ্যতে নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে আরও সংকুচিত করবে।
একাধিক নেত্রীর পদত্যাগ ও নির্বাচন বর্জন
এই বিরোধের ধারাবাহিকতায় এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব তাসনিম জারা দল থেকে পদত্যাগ করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দেন। তিনি ঢাকা-৯ আসন থেকে নির্বাচন করার প্রস্তুতি শুরু করেছেন।
এরপর দল ছাড়ার ঘোষণা দেন যুগ্ম আহ্বায়ক তাজনূভা জাবীন। তবে তিনি নির্বাচনে অংশ নেবেন না বলে জানিয়েছেন। অন্যদিকে, যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন দল ছাড়েননি, কিন্তু নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন।
এছাড়া আরেক যুগ্ম আহ্বায়ক নুসরাত তাবাসসুম নির্বাচনকালীন সময়ে দলীয় সব কার্যক্রম থেকে নিজেকে নিষ্ক্রিয় রাখার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, শীর্ষ নেতৃত্ব দলীয় আদর্শ থেকে সরে এসে তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে।
জামায়াত নিয়ে আদর্শগত আপত্তি
দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্থা শারমিন জামায়াতের সঙ্গে জোটকে ‘আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত’ বলে মন্তব্য করেছেন। তবে তিনি পদত্যাগ করেননি। তাঁর ভাষ্য, জামায়াতের রাজনৈতিক ইতিহাস, দর্শন ও অবস্থান এনসিপির ঘোষিত মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
তিনি বলেন, “তৃতীয় শক্তি হিসেবে এনসিপিকে গড়ে তোলার যে প্রত্যাশা ছিল, এই সিদ্ধান্ত তা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।”
৩০ নেতার চিঠি, আদর্শ বিচ্যুতির অভিযোগ
এর আগে গত শনিবার জামায়াতের সঙ্গে জোটের বিরোধিতা করে এনসিপির ৩০ জন নেতা আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে একটি চিঠি দেন। চিঠিতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক দায়, গণতান্ত্রিক নৈতিকতা এবং দলের ঘোষিত আদর্শের সঙ্গে এই জোটের অসামঞ্জস্যতার কথা উল্লেখ করা হয়।
চিঠিতে আরও অভিযোগ করা হয়, জামায়াত ও তাদের ছাত্র সংগঠনের পক্ষ থেকে এনসিপির নারী সদস্যদের বিরুদ্ধে অনলাইনে চরিত্র হননের চেষ্টা চালানো হয়েছে।
নাহিদ ইসলামের বক্তব্য
রোববার রাতে এনসিপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, দলীয় নির্বাহী পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই জোটের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, “কে দলে থাকবে বা নির্বাচন করবে, সেটা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। যারা আপত্তি তুলছেন, তাদের সঙ্গে আমরা আলোচনা করব এবং বোঝানোর চেষ্টা করব।”
স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কারণে সংশ্লিষ্ট আসনে এনসিপি প্রার্থী দেওয়া হবে কি না—এ প্রশ্নে তিনি জানান, প্রার্থী চূড়ান্ত হবে দলের লক্ষ্য ও মাঠপর্যায়ের গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তিতে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এস এম আলী রেজা বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান থেকে শুরু করে এনসিপির গঠনে নারী নেতৃত্বের বড় ভূমিকা ছিল। “এই নারী নেত্রীদের সরে যাওয়া বা নিষ্ক্রিয় হওয়া নতুন দলটির জন্য বড় ধাক্কা,” বলেন তিনি।
আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচন এনসিপির জন্য প্রথম বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা। তার আগেই দলটির ভেতরে তৈরি হওয়া এই ভাঙন কতটা প্রভাব ফেলবে, সেটিই এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।