Sunday, 28 June, 2026, 10:22 pm

যমুনার ভাঙনে বিলীন বসতভিটা, গৃহহীন শত শত পরিবার

যমুনা যেন এবার শুধু মাটি নয়, মানুষের স্বপ্ন, স্মৃতি আর অস্তিত্বও গিলে খাচ্ছে। প্রতিদিন নদীর বুকে হারিয়ে যাচ্ছে একের পর এক বসতভিটা, ফসলি জমি, মসজিদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, দোকানপাট এমনকি পূর্বপুরুষদের কবরও। নদীর তীব্র স্রোতের সামনে অসহায় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সিরাজগঞ্জের সদর, কাজিপুর ও চৌহালী উপজেলার হাজারো মানুষ।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত দুই সপ্তাহের টানা নদীভাঙনে শতাধিক বসতবাড়ি, মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল, দোকানপাট, অসংখ্য গাছপালা এবং শত শত বিঘা আবাদি জমি যমুনার গর্ভে বিলীন হয়েছে। পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিদিনই নতুন নতুন এলাকা ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়ছে। ঘর হারানোর আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন নদীপাড়ের মানুষ।

সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করছে কাজিপুর উপজেলার চরগিরিশ ইউনিয়নে। একসময় যেখানে ৫০০ থেকে ৬০০ পরিবারের বসবাস ছিল, সেখানে এখন সর্বত্র ভাঙনের ক্ষতচিহ্ন। স্থানীয়দের ভাষ্য, মাত্র দুই সপ্তাহে অন্তত ৩০ থেকে ৪০টি বসতবাড়ি নদীতে বিলীন হয়েছে। যেভাবে নদীর তীর ভাঙছে, তাতে আরও শতাধিক পরিবার যেকোনো সময় গৃহহীন হয়ে পড়তে পারে।

একই চিত্র চৌহালী উপজেলার বাগুটিয়া ইউনিয়নের চরসলিমাবাদ, ভূতের মোড়, বিনানুই ও ভুসুরিয়া চরাঞ্চলেও। প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে চলমান ভাঙনে অন্তত ৪০ থেকে ৫০টি বসতবাড়ি, মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল ও দোকানপাট নদীগর্ভে চলে গেছে। কৃষকের বছরের পর বছর পরিশ্রমে গড়ে ওঠা শত শত বিঘা ফসলি জমিও নিমিষেই বিলীন হচ্ছে যমুনার বুকে।

এদিকে গত ২০ জুন বিকেলে সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার বাহুকা এলাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ তীররক্ষা বাঁধের প্রায় ৩০ মিটার অংশ নদীতে ধসে পড়ে। সেখানে জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা চালাচ্ছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। তবে স্থানীয়দের আশঙ্কা, পানি আরও বাড়লে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

ভাঙনের শিকার পরিবারগুলোর অনেকেই এখন আত্মীয়স্বজনের বাড়ি কিংবা অন্যের জমিতে অস্থায়ীভাবে আশ্রয় নিয়েছে। শুধু বসতভিটাই নয়, হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের শেকড়, স্মৃতি, পূর্বপুরুষদের কবরস্থান এবং জীবিকার একমাত্র অবলম্বন কৃষিজমি।

চরগিরিশ গ্রামের ভাঙনকবলিত বাসিন্দা আব্দুল মমিন বলেন, এই চরে বাবা-দাদার ভিটা ছিল। জীবনের সব সঞ্চয় দিয়ে ঘর তুলেছিলাম। কয়েক দিনের মধ্যেই সব নদীতে চলে গেল। এখন অন্যের জমিতে আশ্রয় নিয়েছি।

রফিকুল ইসলাম বলেন, চোখের সামনে সবকিছু নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। এখন পরিবার নিয়ে কোথায় যাব, কী খাব সেটাই সবচেয়ে বড় চিন্তা।

চরসলিমাবাদের বাসিন্দা কোহিনুর খাতুন বলেন, আমরা গরিব মানুষ। যা ছিল সব নদী নিয়ে গেছে। সরকারি সহায়তা না পেলে খোলা আকাশের নিচেই থাকতে হবে।

রেজাউল করিম বলেন, নদী শুধু ঘরবাড়ি কেড়ে নেয়নি, আমাদের স্বপ্নও কেড়ে নিয়েছে। নিজের দেশেই আমরা যেন উদ্বাস্তু হয়ে গেছি। পূর্বপুরুষদের কবর আর মসজিদও নদীতে চলে গেছে।

ষাটোর্ধ্ব রশিদ মিয়া বলেন, জীবনে অনেক কষ্ট করেছি, কিন্তু এমন অসহায় কখনো লাগেনি। এখন কোথায় যাব, কিছুই বুঝতে পারছি না।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর যমুনার ভাঙন চললেও কার্যকর ও স্থায়ী প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি পানি উন্নয়ন বোর্ড। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা আগে থেকেই চিহ্নিত থাকলেও সময়মতো প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ভাঙন শুরু হওয়ার পর জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ফেলা হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা নদীর ভয়াল আগ্রাসন ঠেকাতে পারছে না।

তাদের দাবি, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় টেকসই তীররক্ষা বাঁধ নির্মাণ ছাড়া এই দুর্ভোগের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

চরগিরিশ ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আল আমিন সরকার বলেন, একসময় এই চরে অনেক পরিবারের বসবাস ছিল। আগের ভাঙনে প্রায় ১৫০টি পরিবার এলাকা ছেড়ে চলে গেছে। গত দুই সপ্তাহের ভাঙনে আরও অন্তত ৩০টি পরিবার গৃহহীন হয়েছে। পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আরও শতাধিক পরিবার ভিটেমাটি হারাবে।

যমুনার পানি বৃদ্ধির কারণে নদীতীরবর্তী অনেক এলাকায় নতুন করে ভাঙনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। নিচু এলাকার বিস্তীর্ণ কৃষিজমি ইতোমধ্যে পানিতে তলিয়ে গেছে। কোথাও কোথাও নৌকা ছাড়া চলাচলও অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, গত ২৪ ঘণ্টায় সিরাজগঞ্জ পয়েন্টে যমুনার পানি ৩ সেন্টিমিটার এবং কাজিপুর পয়েন্টে ৬ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে সিরাজগঞ্জ পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ১৪৮ সেন্টিমিটার এবং কাজিপুর পয়েন্টে ১৯৩ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

চৌহালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুরুল আমিন বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করা হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড ভাঙন রোধে জরুরি ভিত্তিতে কাজ করছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সরকারি সহায়তা দেওয়া হবে।

সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেছুর রহমান বলেন, যমুনার পানি বৃদ্ধির কারণে সদর, কাজিপুর, শাহজাদপুর ও চৌহালীর কয়েকটি এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ফেলে তীর সংরক্ষণের কাজ চলছে। একই সঙ্গে স্থায়ী সমাধানের প্রস্তাব ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।

আরো