সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬, ৩:৪২ অপরাহ্ণ

ফ্লাইহুইল প্রযুক্তিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ, বগুড়ায় ১ মেগাওয়াট প্লান্টের পরিকল্পনা

গ্যাস, তেল, কয়লা কিংবা সৌরশক্তির মতো প্রচলিত জ্বালানির বাইরে ফ্লাইহুইল প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা চলছে বগুড়ায়। পরীক্ষামূলক পর্যায়ে সফলতার দাবি করে এবার প্রায় ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে এক মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি পূর্ণাঙ্গ প্লান্ট স্থাপনের পরিকল্পনা করছে পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (আরডিএ)।

বগুড়ার এরুলিয়া এলাকার বানদিঘীতে পরীক্ষামূলক প্লান্টে বর্তমানে উৎপাদিত বিদ্যুৎ দিয়ে দুটি পাম্প ও কয়েকটি ওয়েল্ডিং মেশিন পরিচালনা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, পূর্ণাঙ্গভাবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা গেলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ হতে পারে প্রায় ১ টাকা ৫০ পয়সা।

আরডিএ সূত্র জানায়, ২০০৪ সাল থেকে ফ্লাইহুইলভিত্তিক এই প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা চলছে। বর্তমানে দুটি ৫০০ কিলোওয়াট ক্ষমতার মোটর ব্যবহার করে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। গবেষকরা বলছেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত জেনারেটরটি সম্পূর্ণভাবে স্থানীয় প্রয়োজন অনুযায়ী কাস্টমাইজ করা হয়েছে।

প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক প্রকৌশলী জানান, জেনারেটরটির রোটর অংশে পারমানেন্ট ম্যাগনেট ব্যবহার করা হয়েছে। এক মেগাওয়াট ক্ষমতার প্লান্টে প্রায় ৪৮টি পোল ও ম্যাগনেট ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব ম্যাগনেটের দাম তুলনামূলক বেশি হওয়ায় জেনারেটরের আকারও বড় হবে।

তিনি বলেন, পরীক্ষামূলক পর্যায়ে যন্ত্রটি প্রায় ২৫০ আরপিএম গতিতে পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে পূর্ণাঙ্গ ও উন্নত প্রযুক্তির প্লান্টে গতি প্রায় ১২০ আরপিএমে নামিয়ে এনে আরও স্থিতিশীল ও মসৃণভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।

আরডিএ কর্মকর্তারা বলছেন, ফ্লাইহুইল প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ধারণা বিশ্বে নতুন নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মতো দেশেও বিভিন্ন ক্ষেত্রে এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে বাংলাদেশে এ প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা ও পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগটি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

এক কর্মকর্তা বলেন, দেশে বর্তমানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে গড়ে ১৪ থেকে ১৬ টাকা পর্যন্ত খরচ হয় বলে বিভিন্ন হিসাবে উল্লেখ করা হয়। সেখানে পরীক্ষামূলক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, এই প্রযুক্তিতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ প্রায় দেড় টাকার মধ্যে রাখা সম্ভব হতে পারে বলে তারা আশা করছেন।

তবে গবেষণাটি এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে। এক মেগাওয়াটের পূর্ণাঙ্গ প্লান্ট স্থাপনের পর এর প্রকৃত উৎপাদন সক্ষমতা, দক্ষতা, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহের সম্ভাব্যতা আরও স্পষ্ট হবে।

আরডিএর পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রায় ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে এক মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি পূর্ণাঙ্গ প্লান্ট স্থাপন করা হবে। এ জন্য স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়সহ বাংলাদেশ জলবায়ু ট্রাস্টের কাছে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও অর্থায়নের প্রস্তাব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও প্রকল্পটি বড় পরিসরে বাস্তবায়নে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন। তাদের মতে, প্রযুক্তিটি কার্যকর ও বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক প্রমাণিত হলে স্থানীয়ভাবে এ ধরনের যন্ত্র তৈরি ও বাজারজাত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফ্লাইহুইল প্রযুক্তির অন্যতম সম্ভাব্য সুবিধা হলো এটি সূর্যের আলো বা আবহাওয়ার ওপর সরাসরি নির্ভরশীল নয়। ফলে প্রযুক্তিটি কার্যকরভাবে উন্নয়ন করা গেলে প্রচলিত জ্বালানির পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বিকল্প উৎস হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

গবেষকদের দাবি, একই পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনে তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন হতে পারে। তবে ফ্লাইহুইলভিত্তিক প্রযুক্তির প্রকৃত অর্থনৈতিক সুবিধা নির্ধারণে পূর্ণাঙ্গ প্রকল্প বাস্তবায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা যাচাই প্রয়োজন হবে।

বগুড়ার এই উদ্যোগ সফল হলে জ্বালানি বহুমুখীকরণ এবং বিকল্প প্রযুক্তির মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আরো