নাজরান ফিশারীজ এন্ড এগ্রো প্রজেক্টে বিনিয়োগের নামে ৪০০ কোটি টাকা প্রতারণা
আলী আহসান রবি
নাজরান ফিশারীজ এন্ড এগ্রো নামীয় কৃষি প্রজেক্টে অধিক মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষের নিকট থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎকারী একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের ০১ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
গ্রেফতারকৃত ব্যক্তির নাম মো. ওবায়েদুল্লাহ (৩৩), পিতা-মৃত আবু নাইম, মাতা-মৃতা আয়েশা; সাং- জাহানপুর, ডাকঘর-শশীভোষণ, থানা-শশীভোষণ, জেলা-ভোলা। ঢাকা মহানগরীর সবুজবাগ থানাধীন বাসাবো এলাকা হতে তাকে গ্রেফতার করে ঢাকা মেট্রো উত্তর ইউনিটের একটি আভিযানিক দল।
বাদীর দায়ের করা মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায় যে, সংঘবদ্ধ চক্রের সদস্যরা “নাজরান ফিশারীজ এন্ড এগ্রো প্রজেক্ট” নামে একটি ভুয়া প্রকল্পে বিনিয়োগ করলে অধিক লাভ পাওয়া যাচ্ছে এরকম একটি প্রচারণা চালান। চক্রের সদস্যরা প্রতিশ্রুতি দেয় যে ০১ লক্ষ টাকা বিনিয়োগ করলে প্রতি মাসে ৩ হাজার টাকা লাভসহ আসলের সমপরিমাণ অর্থ ফেরত দেওয়া হবে এবং ৩৩ মাসে বিনিয়োগকৃত মূলধন দ্বিগুণ হবে।
প্রলোভনে আকৃষ্ট হয়ে মামলার বাদী এবং তার ০৩ জন বান্ধবী গত ২০২৩ সালের মে মাসে ভাটারা থানা (ডিএমপি) এলাকার কুড়িল চৌরাস্তা সংলগ্ন উক্ত “নাজরান ফিশারীজ এন্ড এগ্রো প্রজেক্ট” প্রতিষ্ঠানের অফিসে গিয়ে বিনিয়োগ করেন। ওই দিন বাদী নিজে ০৭ লক্ষ টাকা এবং অন্য দুই বান্ধবী প্রত্যেকেই ০৫ লক্ষ টাকা করে বিনিয়োগ করেন। বিনিয়োগের প্রমাণ হিসেবে চক্রের সদস্যরা তাদেরকে মানি রিসিট ও মাসিক ক্যাশ ব্যাক বহি প্রদান করে।
প্রথম দিকে আস্থা অর্জনের লক্ষ্যে চক্রটির সদস্যরা মোট ৪২ হাজার টাকা ফেরত প্রদান করে। এতে ভুক্তভোগীদের আস্থা বৃদ্ধি পায় এবং পরবর্তীতে ২০২৩ সালের জুলাই মাসে ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে আরও ৫০ লক্ষ টাকা বিনিয়োগ করেন।
পরবর্তীতে প্রতারক চক্রের সদস্যরা বিনিয়োগকারীদের বাধ্যতামূলকভাবে প্রজেক্টের প্লট ক্রয়ের কথা বলে বাদীর ও অন্য দুই বান্ধবীর কাছ থেকে মোট ১ কোটি ৬৩ লক্ষ ৯৮ হাজার টাকা বিনিয়োগের নামে প্রতিষ্ঠানে জমা করতে বাধ্য করে। জমাকৃত উক্ত অর্থের লভ্যাংশ হিসেবে ১৮ লক্ষ ৭২ হাজার টাকা ফেরত দিলেও পরবর্তীতে লেনদেন স্থগিত এবং অফিস বন্ধ করে আত্মগোপনে চলে যায়।
মামলাটি তদন্তকালে জানা যায়, উক্ত প্রতারক চক্র একই কৌশলে অসংখ্য ব্যক্তির নিকট থেকে অর্থ আত্মসাৎ করেছে। “নাজরান ফিশারীজ এন্ড এগ্রো প্রজেক্ট” প্রতিষ্ঠানের নামে পরিচালিত ০৪টি ব্যাংক হিসাব, মানি রিসিট পর্যালোচনা এবং অফিসের সার্ভারে থাকা তথ্যানুযায়ী বিভিন্ন ভুক্তভোগী কর্তৃক আনুমানিক ৪০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়াও গ্রেফতারকৃত অভিযুক্ত মো. ওবায়েদুল্লাহ (৩৩)’র ব্যক্তিগত ১৪টি ব্যাংক হিসাবে প্রায় আড়াই কোটি টাকার লেনদেনের তথ্য পাওয়া গিয়েছে। বিগত ২০২৫ সালের মে মাসে প্রায় ১৫ হাজার জন ভুক্তভোগীর কাছ থেকে ৮০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে প্রেস কনফারেন্স ও মানব বন্ধন করেন ভুক্তভোগীরা। এতদসংক্রান্তে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
মামলা দায়েরের পরপরপরই অভিযুক্তরা পলাতক হয়ে যায় এবং গ্রেফতার এড়াতে তার ব্যবহৃত সকল মোবাইল নম্বর বন্ধ রাখে। পরবর্তীতে গোয়েন্দা ও প্রাপ্ত অন্যান্য তথ্যের প্রাযুক্তিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে ঢাকার সবুজবাগ থানাধীন বাসাবো এলাকায় তার অবস্থান শনাক্ত করে অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে তাকে গ্রেফতার করা হয়।
তদন্তকালে গ্রেফতারকৃত মো. ওবায়েদুল্লাহ (৩৩)’র বিরুদ্ধে আরও একাধিক মামলার তথ্য পাওয়া গেছে, যার মধ্যে-
১। সিআর মামলা নং-৫৬৭/২০২৪ (ভাটারা)
২। সিআর মামলা নং-২০৭৯/২০২৫ (উত্তরা পশ্চিম), ধারা-৪০৬/৪২০ পেনাল কোড
৩। সিআর মামলা নং-৩৪৫/২০২৪ (সাভার) মামলাগুলোতে বিজ্ঞ আদালত গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন।
মামলার এজাহারে উল্লিখিত অন্যান্য অভিযুক্তদের বিরুদ্ধেও একাধিক মামলা রয়েছে মর্মে তথ্য পাওয়া গেছে। এই চক্রের সাথে আরও কেউ জড়িত আছে কিনা সে সংক্রান্ত তথ্যাদির জন্য গ্রেফতারকৃতকে পর্যাপ্ত পুলিশ প্রহরা ও সতর্কতার সাথে রিমান্ডের আবেদনসহ বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করার প্রক্রিয়া চলমান।
বর্তমানে মামলাটির তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছে ঢাকা মেট্রো উত্তর ইউনিট। প্রতারণা চক্রের অন্যান্য সদস্যদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত আছে। এ ধরনের প্রতারণা সম্পর্কে সর্বসাধারণকে বিশেষভাবে সতর্ক থাকার জন্য অনুরোধ করছে সিআইডি। পাশাপাশি অচেনা ব্যক্তি কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের পূর্বে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সত্যতা যাচাই না করে ব্যবসায়িক অংশীদারিত্ব ও আর্থিক লেনদেন থেকে বিরত থাকার অনুরোধ ও পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে।