রবিবার, ১৭ মে, ২০২৬, ১২:২৭ অপরাহ্ণ

স্বপ্ন ও হেলথকেয়ারে এসিআইর লোকসান ৪০০০ কোটি টাকা

বিশাল টার্নওভার আর দেশজুড়ে ব্যবসার বিস্তৃতি থাকলেও দেশের অন্যতম শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী এসিআই পিএলসি এখন এক চরম সংকটের মুখে। উচ্চ সুদের ব্যাংক ঋণের ওপর ভিত্তি করে ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য প্রসারের যে ‘আক্রমণাত্মক কৌশল’ গ্রুপটি নিয়েছিল, তা এখন বুমেরাং হয়ে দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে ‘স্বপ্ন’ ও ‘এসিআই হেলথকেয়ার’—এই দুটি সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানের পুঞ্জীভূত লোকসান ৪ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ায় মূল কোম্পানির ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে পড়েছে।

এসিআই পিএলসির নিরীক্ষিত ও অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত খুচরা চেইন শপ ‘স্বপ্ন’ (এসিআই লজিস্টিকস) এ পর্যন্ত ২,৩১৬ কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে। অন্যদিকে, ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘এসিআই হেলথকেয়ার’-এর পুঞ্জীভূত লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১,৬৮৪ কোটি টাকা। এই দুই প্রতিষ্ঠানের বিশাল ঋণের বোঝা ও সুদ মেটাতে গিয়ে লাভজনক ইউনিটগুলোর মুনাফায় রীতিমতো ‘রক্তক্ষরণ’ (প্রফিট ব্লিডিং) চলছে। ফলে ২৬টি অঙ্গপ্রতিষ্ঠানের মালিক হওয়া সত্ত্বেও এসিআই পিএলসি টানা চার বছর ধরে নিট লোকসানে রয়েছে।

আক্রমণাত্মক ঋণ ও ঋণের ফাঁদ
আন্তর্জাতিক করপোরেট ফিন্যান্সের ভাষায় এসিআই-এর এই মডেলটি ‘লিভারেজড গ্রোথ’ হিসেবে পরিচিত, যেখানে মূল ব্যবসার মুনাফা ব্যবহার না করে বরং ব্যাংক ঋণের মাধ্যমে নতুন সাবসিডিয়ারি তৈরি করা হয়। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে, যদি ঋণের সুদ পরিশোধের সক্ষমতা কম থাকে, তবে এই কৌশলটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়। এমন ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ মডেলের কারণেই কোম্পানিটির শেয়ারে কোনো বিদেশি বিনিয়োগকারীর আগ্রহ নেই।

২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত গ্রুপটির সমন্বিত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭,৮০০ কোটি টাকা। চলতি হিসাববছরের প্রথম নয় মাসে গ্রুপটির নিট সুদ ব্যয় ছিল ৭৪২ কোটি টাকা, যার ৬০ শতাংশই ব্যয় হয়েছে স্বপ্ন ও হেলথকেয়ারের পেছনে। গ্রুপটির মোট দায়ের অর্ধেকেরও বেশি এই দুই প্রতিষ্ঠানের। বর্তমানে এসিআই পিএলসি এমন এক ‘ডেব্ট ট্র্যাপ’ বা ঋণের ফাঁদে পড়েছে, যেখানে ফার্মাসিউটিক্যালস, মোটরস বা সল্টের মতো অত্যন্ত লাভজনক খাতের মুনাফাও লোকসানি প্রতিষ্ঠান দুটির সুদের ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে।

গত নয় মাসে স্বপ্ন বা এসিআই লজিস্টিকসের কর-পূর্ববর্তী লোকসান দাঁড়িয়েছে ১৮৬.৭৫ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ হিসাববছরে এসিআই লজিস্টিকস ২৭৩ কোটি টাকা নিট লোকসান দেয়। আগের বছর ২০২৩-২৪ এ নিট লোকসান ছিলো ১৯৬ কোটি টাকা। উচ্চ সুদ ব্যয়ের কারণে প্রতিবছর এর লোকসানের পরিমাণ বেড়েই চলেছে।

বর্তমানে স্বপ্নের দায়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২,৫১৪ কোটি টাকা, যা প্রতিষ্ঠানটির মোট সম্পদের চেয়ে তিন গুণ বেশি। এর মধ্যে বড় অংশই হচ্ছে আন্তঃকোম্পানি ধার (১,৫৪০ কোটি টাকা) ও ব্যাংক ঋণ। অবশ্য ‘স্বপ্ন’ নিয়ে গ্রুপটির উচ্চাভিলাসী পরিকল্পনা এখনো বহাল।

অতি সম্প্রতি জাপানি জায়ান্ট মিতসুই তাদের সিঙ্গাপুরভিত্তিক অঙ্গপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে স্বপ্ন-তে ৬৪০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে, যা বৈদেশিক মুদ্রায় রূপান্তরযোগ্য ঋণ। এই মূলধন স্বপ্নের সাপ্লাই চেইন উন্নয়ন ও প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নে ব্যয় করা হবে। এসিআই-এর পরিকল্পনা রয়েছে স্বপ্নকে দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে মালয়েশিয়া, দুবাই ও সৌদি আরবের মতো দেশে বিস্তৃত করার, যাতে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে লোকসান কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়।

বাংলাদেশের ৭ম শীর্ষ ব্র্যান্ড হিসেবে স্বীকৃত ‘স্বপ্ন’ ৬৪ জেলায় ৮০০-এর বেশি স্টোর পরিচালনা করছে। রিটেইল চেইন শপের ব্যবসায় ৫১ শতাংশ শেয়ার রয়েছে তাদের। চলতি নয় মাসে প্রতিষ্ঠানটির আয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২,৩৩৪ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ১৮ শতাংশ বেশি।

হেলথকেয়ারের স্থবিরতা ও কড়া ঝুঁকি
এসিআই হেলথকেয়ারের পরিস্থিতি আরও নাজুক। উন্নত বিশ্বের নিয়ন্ত্রিত বাজারে ওষুধ রপ্তানির লক্ষ্য নিয়ে ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সাবসিডিয়ারিটিও স্বপ্নর মতো আন্তঃকোম্পানি ধার ও ব্যাংক ঋণে গড়ে তোলা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ঋণের দায় এখন ২,৪৩০ কোটি টাকা, যা এর সম্পদমূল্যের তিন গুণেরও বেশি। ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত এসিআই হেলথকেয়ারের কাছে আন্তঃকোম্পানি পাওনার পরিমাণ ছিল ১,৭৭৩ কোটি টাকা, যা বর্তমানে আরও বেড়েছে। ওই সময় পর্যন্ত ব্যাংক ঋণ ছিল ৪২৭ কোটি টাকা।
সোনারগাঁওয়ে অবস্থিত এর কারখানাটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘এফডিএ’ অনুমোদন পেলেও আয়ের ক্ষেত্রে কোনো দৃশ্যমান প্রভাব পড়েনি। চলতি অর্থবছরের নয় মাসে প্রতিষ্ঠানটির মোট আয় হয়েছে মাত্র ৬৬ কোটি টাকা, যার পুরোটিই এসেছে আন্তঃকোম্পানি লেনদেন থেকে। অর্থাৎ, এফডিএ অনুমোদনের পরও কোনো উল্লেখযোগ্য ওষুধ রপ্তানি করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি।

প্রতিষ্ঠার পর থেকে টানা লোকসান দিচ্ছে এসিআই হেলথকেয়ারও। ২০২৪-২৫ হিসাববছরে এর নিট লোকসান ছিল ২৯২ কোটি টাকা, যা আগের বছরে ছিল ৩৭৩ কোটি টাকা। আর চলতি হিসাববছরের নয় মাসে কর-পূর্ববর্তী লোকসান দাঁড়িয়েছে ১৯৭.৬৯ কোটি টাকা। হেলথকেয়ার এখন উৎপাদন পর্যায়েই লোকসানে রয়েছে।

এ বিষয়ে এসিআই পিএলসির কোম্পানি সচিব মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান স্বীকার করেছেন যে, এসিআই হেলথকেয়ারে হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করলেও তারা কাঙ্ক্ষিত কোনো রপ্তানি আদেশ পাচ্ছেন না, যা গ্রুপের জন্য একটি বড় সমস্যা। তবে বিদেশে শাখা ছড়িয়ে দেওয়ার যে কৌশলগত পরিকল্পনা কোম্পানি নিয়েছে, তাতে অদূর ভবিষ্যতে ‘স্বপ্ন’ এর লোকসান কাটিয়ে ওঠার বিষয়ে আশাবাদী মোস্তাফিজ।

প্রসঙ্গত স্বপ্ন ও হেলথকেয়ারের পাশাপাশি ফুড ও প্লাস্টিক সেগমেন্টেও প্রায় ৩৮৭ কোটি টাকার পুঞ্জীভূত লোকসান রয়েছে। এ চার সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানের লোকসান সামাল দিতে গিয়ে চলতি ২০২৫-২৬ হিসাববছরের নয় মাসে মূল কোম্পানি এসিআই পিএলসি ৩৬ কোটি টাকারও বেশি নিট লোকসান দিয়েছে।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চ ঋণের এই মডেল এবং সুদের হারের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি এসিআই-কে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণহীন করে তুলেছে। বোস্টন কনসাল্টিং গ্রুপ (বিসিজি) ম্যাট্রিক্স অনুযায়ী, একটি সফল গ্রুপের কাজ হলো লাভজনক ইউনিট থেকে আসা নগদ অর্থ নতুন ব্যবসায় বিনিয়োগ করা। কিন্তু এসিআই-এর ক্ষেত্রে উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে; লাভজনক ইউনিটগুলো এখন লোকসানি সাবসিডিয়ারিগুলোর ঋণের সুদ মেটানোর দাসে পরিণত হয়েছে। ফলে ব্র্যান্ড ইমেজ ধরে রাখতে রিজার্ভ থেকে লভ্যাংশ দিলেও সাধারণ শেয়ারহোল্ডাররা দীর্ঘমেয়াদী সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

আরো