Wednesday, 1 July, 2026, 10:14 pm

পানির ওপর নির্মিত জেদ্দার আল-জাজিরা মসজিদের স্থাপত্য রহস্য

জেদ্দা কর্নিশের এক শীতকালীন সকাল। হঠাৎই একটি অভাবনীয় ঘটনার মুখোমুখি হলেন প্রখ্যাত মিশরীয় স্থপতি আবদেল ওয়াহেদ আল-ওয়াকিল। জেদ্দা পৌরসভার একটি গাড়ি হঠাৎ রাস্তার একটি বড় গর্তে পড়ে যায়। তখনই সবাই আবিষ্কার করেন যে, সমুদ্রের ঢেউ ভেতরের সব বালি ধুয়ে নিয়ে গেছে এবং কর্নিশের আল-জাজিরা মসজিদের নিচের কোনো ভিত্তি বা মাটি অবশিষ্ট নেই। এই মসজিদটি আর-রাহমা মসজিদ হিসেবেও বিখ্যাত। স্থপতির ভাষায়, পুরো মসজিদ ভবনটি তখন কোনো খুঁটি বা অবলম্বন ছাড়াই বাতাসে ভাসছিল।

খবর পেয়ে জেদ্দার মেয়র ও প্রকৌশলীরা ঘটনাস্থলে ছুটে যান। যেকোনো মুহূর্তে ইট দিয়ে তৈরি এই মসজিদ ভেঙে পড়বে—এই আশঙ্কায় যখন সবাই কাঁপছিলেন, তখন আল-ওয়াকিল রসিকতা করে বলেছিলেন, এই মসজিদ ফেরেশতারা ধরে রেখেছেন। আসলে আধুনিক স্থাপত্যকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কেন কোনো ফাটল ছাড়াই মসজিদটি টিকে ছিল, তা ছিল এক দারুণ স্থাপত্য রহস্য।

সম্প্রতি আথির প্ল্যাটফর্মের বিতাফসিল অনুষ্ঠানে এই প্রখ্যাত স্থপতি জেদ্দা ও মদিনার বিভিন্ন মসজিদ নির্মাণের পেছনের সেই রোমাঞ্চকর ও অবিশ্বাস্য গল্পগুলো শুনিয়েছেন। ১৯৮৪ সালে জেদ্দার কর্নিশ মসজিদের পরিবেশবান্ধব ও অনন্য নকশার জন্য তিনি লন্ডনের একটি সাময়িকী থেকে পুরস্কার পান এবং পরবর্তীতে ১৯৮৯ সালে একই মসজিদের জন্য লাভ করেন সম্মানজনক আগা খান স্থাপত্য পুরস্কার। আল-ওয়াকিল মনে করেন, স্থাপত্য শুধু প্রকৌশল নয়, এটি একটি আত্মিক বিশ্বাস।

আল-জাজিরা মসজিদের অলৌকিকতা

গল্পের শুরু এক সাহসী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে। আল-ওয়াকিল জেদ্দার তৎকালীন মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ ফারসিকে একটি প্রবাল দ্বীপের ওপর মসজিদ নির্মাণের প্রস্তাব দেন। আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো যখন সেখানে রড ও কংক্রিটের ৪০ মিটার গভীর ভিত্তি দেওয়ার জন্য বিশাল খরচের হিসাব দিচ্ছিল, তখন আল-ওয়াকিল রড ও সিমেন্ট ছাড়াই মসজিদ তৈরির সিদ্ধান্ত নেন।

তিনি ইট ও পোড়ামাটির তৈরি দেয়াল ও গম্বুজের ওপর ভিত্তি করে ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে আল-জাজিরা মসজিদ নির্মাণ করেন, যা সমুদ্রের আর্দ্রতা ও ভূমিকম্পের বিরুদ্ধে এক প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ ছিল। সমুদ্রের ঢেউ মসজিদের নিচের মাটি ধুয়ে নিয়ে একটি বড় গুহা তৈরি করার পরও যখন ভবনটিতে কোনো ফাটলও দেখা যায়নি, তখন প্রমাণ হয়ে যায় যে আধুনিক স্থাপত্যের চেয়ে সনাতনী নির্মাণশৈলী কতটা শক্তিশালী।

জেদ্দায় সফলতার পর আল-ওয়াকিলকে মদিনার ঐতিহাসিক মসজিদগুলোর সংস্কার ও সম্প্রসারণের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর মধ্যে ছিল মসজিদে কুবা, কিবলাতাইন এবং মিকাত জিল হুলাইফা।

মসজিদে কুবায় কাজের সময়কার একটি স্মরণীয় ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এক কৃশকায় বৃদ্ধ লোক কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই আমাদের সাথে কাজ করার জন্য জেদ ধরছিলেন। পরে নিরাপত্তারক্ষীরা তাকে আটক করলে তিনি এমন কিছু কথা বলেছিলেন যা আমি কখনো ভুলব না। তিনি বলেছিলেন, তোমরা কি ভাবছ তোমরাই এই মসজিদ বানাচ্ছ? চারদিকে তাকিয়ে দেখ, ফেরেশতারা এখানে তাওয়াফ করছে এবং তারাই এই মসজিদ নির্মাণ করছে।

হস্তশিল্প ও মাটির ছোঁয়া

আবদেল ওয়াহেদ আল-ওয়াকিল বিশ্বাস করেন, জেদ্দা ও মদিনার মসজিদগুলোর আধ্যাত্মিক আবহ লুকিয়ে আছে মানুষের হাতের স্পর্শ ও দক্ষতায়। ইতালীয় চিত্রশিল্পী সিলভিও বিকি এবং পরবর্তীতে প্রখ্যাত স্থপতি হাসান ফাতির সান্নিধ্যে এসে তিনি শেখেন যে স্থাপত্য শুধু দেয়াল তোলা নয়, একটি নৈতিক দায়িত্ব।

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, মানুষের হাত যখন কাজ করে না, তখন তার মস্তিষ্কও বিকৃত হয়ে যায়। তাই তিনি ইট-পাথর ও কাদার তৈরি ঘরকে ঋণ দিতে অস্বীকৃতি জানানো ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। লড়াই করেছেন সেই তথাকথিত সিমেন্ট আইনের বিরুদ্ধে, যা গ্রীষ্মের প্রচণ্ড উত্তাপ থেকে মানুষকে বাঁচাতে পারে না। তিনি কংক্রিটের বদলে ঐতিহ্যবাহী উপায়ে কাদা ও ইটের ব্যবহারে জোর দেন। রাজমিস্ত্রির হাত যখন প্রতিটি পাথর আর ইট স্পর্শ করে, তখন সেই দেয়ালে এক ধরণের বরকত বা কল্যাণ তৈরি হয়, যা কোনো আধুনিক যন্ত্র দিতে পারে না।

স্থাপত্যের বৈশ্বিক স্বীকৃতি

ব্যক্তিগত পুরস্কারের চেয়ে মানুষের কল্যাণকেই সবসময় এগিয়ে রেখেছেন আল-ওয়াকিল। তবে তার অনন্য কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৮০ সালে আলেকজান্দ্রিয়ার হালাওয়া হাউসের জন্য তিনি আগা খান পুরস্কার পান। ১৯৮৫ সালে পান ইসলামিক স্থাপত্য গবেষণায় কিং ফাহাদ পুরস্কার। এছাড়া আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টসের সম্মানসূচক ফেলোশিপ এবং ২০০৮ সালে ক্ল্যাসিকাল স্থাপত্যে অবদানের জন্য রিচার্ড ড্রেইহাউস পুরস্কারে ভূষিত হন তিনি। এমনকি ব্রিটেনের রাজা চার্লসও তাকে অক্সফোর্ড ইসলামিক সেন্টারের নকশা করার অনুরোধ জানিয়েছিলেন।

সূত্র : আল জাজিরা

আরো