বুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬, ১০:৪৬ অপরাহ্ণ

সামাজিকতা বনাম প্রয়োজন: ভোগবাদী বাস্তবতায় আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে

তানভীর মাহাদী

জীবনের প্রথম ত্রিশ বছর পার হতে না হতেই সামাজিক বাস্তবতার প্রকৃত রূপ মানুষের সামনে খুলে যায়। তখন স্পষ্ট হয় এই সমাজে আমরা কী নিয়ে বাঁচি, কোনটি প্রকৃত প্রয়োজন, আর কোনটি কেবল সামাজিকতার নামে কৃত্রিমভাবে বহন করা বোঝা। বিশ্ব যখন দ্রুত সরলতা, সংযম এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার দিকে এগোচ্ছে, তখন আমাদের সমাজ যেন উল্টো পথে হাঁটছে। জীবন হয়ে উঠছে আরও জটিল, আরও ব্যয়বহুল এবং আরও অনর্থক প্রদর্শনমুখী।

আমাদের সমাজের বড় একটি সমস্যা হলো প্রয়োজন আর সামাজিক প্রদর্শনকে একাকার করে ফেলা। বেঁচে থাকা, পরিবারের সুরক্ষা, শিক্ষা, সঞ্চয় কিংবা ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা এগুলো নিঃসন্দেহে মৌলিক চাহিদা। কিন্তু এই প্রয়োজনগুলো প্রায়ই পিছিয়ে পড়ে ‘মানুষ কি বলবে’ নামের অদৃশ্য চাপের কাছে। মধ্যবিত্ত পরিবারের বহু সিদ্ধান্তই এই চাপের কারণে বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। একটি পরিবার সন্তানের উচ্চশিক্ষার জন্য সঞ্চয়ের পরিকল্পনা করা উচিত কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, সেই অর্থ ব্যয় হয় একটি অপ্রয়োজনীয় আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানে, যা কেবল সামাজিকতার খাতিরে আয়োজন করা হয়।

এ প্রবণতার শিকড় সমাজের গভীরে। আমাদের সংস্কৃতিতে সামাজিক মর্যাদার ধারণাটি এখনো বহুলাংশে নির্ভর করে বাহ্যিক প্রকাশের ওপর। কে কত খরচ করল, কার বিয়েতে কতটা জাঁকজমক হলো, কার ঘর কত বড়—এসবই হয়ে ওঠে সফলতার পরিমাপক। এর সাথে যুক্ত হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রদর্শনবাদ। আজ মানুষ তার জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে যেন একটি প্রদর্শনীতে পরিণত করেছে। অন্যদের চোখে ‘প্রভাবশালী’ দেখানোই যেন জীবনের প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে বাস্তব জীবন আর ভার্চুয়াল জীবনের সীমারেখা ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে সমাজে একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। পাশের মানুষটি কী কিনল, কে কোথায় গেল, কে কী পরল—এসব তুলনা মানুষের মধ্যে অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করছে। বিশ্বজুড়ে গবেষণা বলে, অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়লে মানুষ মর্যাদা দেখানোর প্রবণতায় আরও অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। আমাদের সমাজেও তাই ঘটছে। জীবনমানের প্রকৃত উন্নতি যতটা হয়নি, ততটাই বেড়েছে প্রকাশ্য ব্যয়ের প্রবণতা।

অথচ পৃথিবীর উন্নত সমাজগুলো সম্পূর্ণ বিপরীত পথে অগ্রসর হচ্ছে। সেখানে মানুষ সফলতা মাপে সম্পদের আকারে নয়, বরং সময়ের স্বাধীনতা, মানসিক স্বস্তি, অভিজ্ঞতা এবং ব্যক্তিগত পছন্দের ভিত্তিতে। ছোট বাসা, কম সম্পদ, কম ব্যয় কিন্তু বেশি সঞ্চয় এবং বেশি জীবনমান—এটাই এখন তাদের আদর্শ। সেই বাস্তবতা আমাদের সমাজে এখনো দূরস্বপ্নের মতো।

তবে পরিবর্তন অসম্ভব নয়। প্রয়োজন শুধু দৃষ্টিভঙ্গির রূপান্তর। পরিবারগুলো যদি ঠান্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নেয় কোনটি প্রয়োজন এবং কোনটি সামাজিকতার চাপে গৃহীত, তাহলে অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের পরিমাণ স্বাভাবিকভাবেই কমে আসবে। জীবনের প্রকৃত আনন্দ যে প্রদর্শনে নয় বরং অভিজ্ঞতা, জ্ঞান, শান্তি ও সম্পর্কের মধ্যে এ বোধ ফিরে আসলে জীবন স্বাভাবিকভাবেই সহজ হবে। ‘মানুষ কী বলবে’ এই ভয় কাটিয়ে ওঠা ব্যক্তিগত স্বাধীনতা অর্জনের সবচেয়ে বড় ধাপ।

প্রকৃত প্রশ্ন হলো, আমরা কি আমাদের জীবনকে অন্যের দৃষ্টির ওপর নির্ভর করে চালাতে চাই? নাকি আমরা এমন একটি সমাজ গড়ে তুলতে চাই যেখানে প্রয়োজন, যুক্তি এবং বাস্তবতা অগ্রাধিকার পাবে? পরিবর্তন ব্যক্তিগতভাবে শুরু হলেও এর প্রভাব সমাজজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। পরিবারগুলো সচেতন হলে, সমাজও ধীরে ধীরে এই প্রদর্শনমুখী সংস্কৃতি থেকে সরে আসবে।

আজ প্রয়োজন—সেই পরিবর্তনের প্রথম পদক্ষেপ নেওয়া। কারণ সরলতা কোনো দুর্বলতা নয়; বরং সচেতন, স্বাধীন ও দায়িত্বশীল সমাজের ভিত্তি।

আরো