হারিয়ে যাচ্ছে বর্ষার ফল ‘কাউ’
বর্ষা এলেই গ্রামবাংলার প্রকৃতিতে দেখা মেলে নানা দেশি ফলের। এসব ফলের মধ্যে স্বাদ ও পুষ্টিগুণের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত ‘কাউ’। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এটি ‘কাউগোলা’ নামেও পরিচিত। টক-মিষ্টি স্বাদের এই ফল একসময় গ্রামবাংলার শিশু-কিশোরদের অন্যতম প্রিয় মৌসুমি ফল ছিল। তবে সময়ের পরিবর্তনে এবং দেশি ফলের গাছ কমে যাওয়ায় কাউ এখন অনেকটাই দুর্লভ হয়ে উঠেছে।
কাউ গাছ একটি দীর্ঘাকার চিরসবুজ বৃক্ষ। এর ডালপালা নিচের দিকে ঝুলে থাকে এবং বছরের অধিকাংশ সময়ই সবুজে আচ্ছাদিত থাকে। সাধারণত অক্টোবর থেকে জানুয়ারি মাসের মধ্যে গাছে ছোট ছোট ফুল ফোটে। ফুল ঝরে যাওয়ার পর ফল ধরতে শুরু করে এবং জুলাই-আগস্ট মাসে ফল পাকতে থাকে। পাকা ফলের প্রতি বাদুড় ও বিভিন্ন বন্য প্রাণীরও বিশেষ আকর্ষণ রয়েছে।
একসময় গ্রামের বাড়ির আঙিনা, বনবাদাড় কিংবা পরিত্যক্ত জমিতে প্রচুর কাউ গাছ দেখা যেত। বর্তমানে ঘরবাড়ি নির্মাণ ও অপরিকল্পিতভাবে গাছ কাটার কারণে এই বৃক্ষ ক্রমেই কমে যাচ্ছে। দেশের কিছু অঞ্চলে এখনও কাউ গাছের দেখা মেলে। বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলের বনাঞ্চল এবং সোনারগাঁয়ের পুরোনো জমিদারবাড়ির আশপাশে ভালো মানের কাউ ফল জন্মাতে দেখা যায়।
আকৃতিতে গোলাকার কাউ ফলের ব্যাস সাধারণত প্রায় পাঁচ সেন্টিমিটার। ফলের গায়ে ছয় থেকে আটটি হালকা খাঁজ থাকে। কাঁচা অবস্থায় ফলের রং ধূসর-সবুজ হলেও পাকলে উজ্জ্বল হলুদ বর্ণ ধারণ করে। এর খোসা কিছুটা তেলতেলে এবং খোসা ছাড়ালে একটি স্বতন্ত্র গন্ধ পাওয়া যায়। ভেতরের শাঁস কমলা-হলুদ রঙের, রসালো এবং টক-মিষ্টি স্বাদের।
কাউ ফল খাওয়ার নিজস্ব একটি মজাও রয়েছে। অনেকেই ফলের শাঁসের সঙ্গে লবণ ও মরিচ মিশিয়ে খেতে পছন্দ করেন। আবার কেউ কেউ কাউ দিয়ে চাটনি, আচার, জ্যাম কিংবা জেলি তৈরি করেন। এর ব্যতিক্রমী স্বাদ খাবারে নতুন মাত্রা যোগ করে।
স্বাদের পাশাপাশি পুষ্টিগুণেও সমৃদ্ধ কাউ। এতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন-সি রয়েছে, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করে। পাশাপাশি এতে ফাইবার, অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, থিয়ামিন, নিয়াসিন এবং ভিটামিন বি-কমপ্লেক্সসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান বিদ্যমান। এসব উপাদান শরীরের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বিকাশে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি অপুষ্টিজনিত সমস্যা দূর করতেও সহায়ক।
ভেষজ গুণেও কাউ ফলের বেশ কদর রয়েছে। লোকজ চিকিৎসায় দীর্ঘদিন ধরে এটি সর্দি-কাশি, ঠান্ডা ও জ্বরের উপশমে ব্যবহার হয়ে আসছে। এছাড়া গাছের ছাল আমাশয়, মাথাব্যথা এবং খিচুনির মতো সমস্যায় উপকারী বলে মনে করা হয়। অনেক এলাকায় কাউ গাছের পাতার রস চুলের খুশকি দূর করার ঘরোয়া উপাদান হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশীয় ফলের প্রতি আগ্রহ বাড়ানোর পাশাপাশি কাউসহ বিলুপ্তপ্রায় ফলের গাছ সংরক্ষণে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। কারণ এসব ফল শুধু আমাদের খাদ্যসংস্কৃতির অংশই নয়, বরং পুষ্টি ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বর্ষার মৌসুমে বাজারে কিংবা গ্রামীণ পরিবেশে কাউ ফলের দেখা মিললে স্বাদ নেওয়ার পাশাপাশি এর গাছ সংরক্ষণেও সচেতন হওয়া জরুরি। হারিয়ে যেতে বসা এই দেশীয় ফল ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছেও পরিচিত করে তোলার দায়িত্ব আমাদের সবার।