বুধবার, ৩ জুন, ২০২৬, ১০:৪৩ অপরাহ্ণ

অভিযোজন অর্থায়নে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বাংলাদেশের সক্ষমতা জোরদার

নিজস্ব প্রতিবেদন

জলবায়ু অভিযোজন অর্থায়নে জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) এবং গ্লোবাল সেন্টার অন অ্যাডাপটেশন (জিসিএ)-এর যৌথ উদ্যোগে ঢাকায় পাঁচ দিনব্যাপী একটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।

“জেন্ডার-রেসপনসিভ মাস্টারক্লাস অন অ্যাডাপটেশন ফাইন্যান্স: জলবায়ু অর্থায়নে প্রবেশাধিকার বৃদ্ধির জন্য জাতীয় সক্ষমতা উন্নয়ন” শীর্ষক এই কর্মসূচি ১৮–২২ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে বিআইবিএম ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিআইবিএম, বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) থেকে মোট ৩০ জন প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন।

এই মাস্টারক্লাসের মূল লক্ষ্য ছিল আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় জলবায়ু অভিযোজন বিষয়ক বিবেচনাগুলো অন্তর্ভুক্ত করে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা জোরদার করা। বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিআইবিএম-এর অভিজ্ঞ শিক্ষকবৃন্দ এবং ব্যাংকিং খাতের জ্যেষ্ঠ পেশাজীবীরা প্রশিক্ষণ প্রদান করেন।

উল্লেখ্য, এই উদ্যোগটি ২০২৪ সালের নভেম্বরে অনুষ্ঠিত ট্রেনিং অব ট্রেইনার্স (ToT) কর্মসূচির ধারাবাহিকতা। জিসিএ-এর সহায়তায় এবং জ্ঞান সহযোগী হিসেবে ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুল অব ফাইন্যান্স অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট জাতীয় প্রশিক্ষকদের অভিযোজন অর্থায়ন বিষয়ে দক্ষ করে তোলার লক্ষ্যে ওই ToT পরিচালিত হয়, যাতে এ ধরনের প্রশিক্ষণ দীর্ঘমেয়াদে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে চালু রাখা যায়।

সমাপনী ও সনদ বিতরণ অনুষ্ঠানে জিসিএ-এর অ্যাডাপটেশন ফাইন্যান্স বিভাগের সিনিয়র প্রোগ্রাম অফিসার এম. মোসলেহ উদ্দিন প্রশিক্ষণের অর্জন ও শিক্ষণীয় বিষয়গুলো তুলে ধরেন। তিনি আর্থিক ব্যবস্থাপনায় জলবায়ু ঝুঁকি ও সহনশীলতা অন্তর্ভুক্ত করার গুরুত্বের ওপর আলোকপাত করেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর নুরুন নাহার জলবায়ু অর্থায়নে প্রবেশাধিকার বৃদ্ধির জন্য সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। তিনি উল্লেখ করেন, টেকসই অভিযোজন নিশ্চিত করতে সুপরিকল্পিত ও পর্যাপ্ত অর্থায়ন কৌশল অপরিহার্য, যা নীতিনির্ধারক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী এবং জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে বাস্তবায়ন সম্ভব।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) অতিরিক্ত সচিব ও উইং প্রধান এ.কে.এম. সোহেল বলেন, জলবায়ু অভিযোজন এখন আর কেবল পরিবেশগত ইস্যু নয়, বরং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাংকিং ও বিনিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়। তিনি সতর্ক করেন, জলবায়ু দৃষ্টিভঙ্গি উপেক্ষা করলে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ সুযোগ হারাতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের টেকসই অর্থায়ন বিভাগের পরিচালক চৌধুরী লিয়াকত আলী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন আর্থিক খাতের জন্য একটি বাস্তব ও তাৎপর্যপূর্ণ ঝুঁকি। জলবায়ুজনিত ধাক্কা ঋণঝুঁকি বাড়ায়, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত করে এবং কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা (এমএসএমই) ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। এ কারণে অভিযোজন অর্থায়ন সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এ সময় জিসিএ-এর অ্যাডাপটেশন ফাইন্যান্স টিমের গ্লোবাল লিড (ইনফ্রাস্ট্রাকচার ও নেচার-বেসড সল্যুশনস) অ্যাডেল ক্যাডারিও অভিযোজন অর্থায়নকে একটি অর্থনৈতিক সুযোগ হিসেবে দেখার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, জিসিএ আর্থিক প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন ব্যাংক এবং বেসরকারি খাতের সঙ্গে কাজ করে অভিযোজনকে দাতব্য নয়, বরং অর্থনৈতিক সহনশীলতা বৃদ্ধির একটি সম্ভাবনাময় বাজার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়।

সমাপনী বক্তব্যে জিসিএ বাংলাদেশের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ রিটা লোহানি জাতীয় অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, বাস্তবভিত্তিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা উন্নয়ন উদ্যোগে বাংলাদেশের পাশে থাকার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিআইবিএম-এর মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, বাংলাদেশের জন্য জলবায়ু অভিযোজন একটি জরুরি উন্নয়ন প্রয়োজন। জলবায়ু লক্ষ্যকে বাস্তব বিনিয়োগে রূপান্তর এবং ঋণ মূল্যায়ন, বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত ও পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপনায় জলবায়ু ঝুঁকি ও অভিযোজন অন্তর্ভুক্ত করতে আর্থিক খাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সফল পাইলট কার্যক্রমের পর বিআইবিএম দেশের বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য এই মাস্টারক্লাস নিয়মিত ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পরিচালনার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে জলবায়ুজনিত ভৌত ঝুঁকি সম্পর্কে গভীর ধারণা তৈরি এবং ব্যাংকযোগ্য অভিযোজন বিনিয়োগ চিহ্নিত ও কাঠামোবদ্ধ করার সক্ষমতা বাড়বে, যা জাতীয় অভিযোজন অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে।

আরো