বিএটির রাজস্ব ফাঁকি, নোটিশ এলটিইউর
বাজেট ঘোষণার আগে মজুদ করা সিগারেট পরবর্তী সময়ে বাড়তি দামে বিক্রি করে ৮ কোটি ৩ লাখ ১১ হাজার ৭৮৪ টাকা রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ উঠেছে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ লিমিটেডের (বিএটি) বিরুদ্ধে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বৃহৎ করদাতা ইউনিটের (এলটিইউ) মূল্য সংযোজন কর (মূসক) শাখার যাচাইয়ে এ তথ্য উঠে এসেছে।
এলটিইউর হিসাবে, বিএটি ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন ওয়্যারহাউজে বাজেট ঘোষণার আগে মজুদ করা মোট ১ কোটি ৬৭ লাখ ৭৩ হাজার ৬৯৭ প্যাকেট সিগারেট বাজেটের পর বাড়তি দামে বিক্রি করেছে। এসব সিগারেটের বাড়তি মূল্যের ওপর প্রযোজ্য মূসক, সম্পূরক শুল্ক ও সারচার্জ পরিশোধ করা হয়নি বলে অভিযোগ।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ১১ জুন ঘোষণা করা হয়। বাজেটের আগে বেনসন গোল্ড ব্র্যান্ডের ২০ শলাকার প্যাকেটের দাম ছিল ৩৭০ টাকা। বাজেটের পর তা বেড়ে ৪২০ টাকা হয়। একইভাবে বিএটির বেনসন স্পেশাল ফিল্টার, বেনসন সুইচ, জন প্লেয়ার গোল্ডলিফ, ক্যাপস্টানসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সিগারেটের দাম বাড়ানো হয়।
এলটিইউ সূত্র জানায়, বাজেট ঘোষণার আগে বিএটির বিভিন্ন ওয়্যারহাউজে মজুদ থাকা সিগারেট পরবর্তী সময়ে নতুন নির্ধারিত দামে বাজারজাত করা হয়েছে। ফলে বাড়তি মূল্যের ওপর প্রযোজ্য রাজস্ব সরকারের কোষাগারে জমা হওয়ার কথা থাকলেও তা পরিশোধ করা হয়নি বলে যাচাইয়ে উঠে এসেছে।
এ বিষয়ে তদন্তে গত ৯ জুন এলটিইউ একটি কমিটি গঠন করে। কমিটির সদস্যরা ওই দিন ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিএটির ১১টি ওয়্যারহাউজ বা ডিপোর মজুদের তথ্য সংগ্রহ করেন। পরদিন ১০ জুন তারা সাভারে বিএটির সিগারেট কারখানা পরিদর্শন করেন।
পরে ২২ জুন বিএটিকে ই-ভ্যাট সিস্টেমের মূসক-২.১ ফরমে ওয়্যারহাউজে সংরক্ষিত সিগারেটের মজুদসংক্রান্ত তথ্য দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটি ৩০ দিন সময় চাইলেও সাত দিন সময় দেওয়া হয়। ৭ জুলাই বিএটি একটি হিসাব বিবরণী জমা দেয়। তবে ডিলার বা ডিস্ট্রিবিউটরের কাছে কী দামে সিগারেট সরবরাহ করা হয়েছে এবং এর বিপরীতে কত রাজস্ব পরিশোধ করা হয়েছে, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়া হয়নি বলে এলটিইউর সূত্র জানিয়েছে।
এনবিআরের ২০১৯ সালের এসআরও-১৮১ অনুযায়ী, নির্ধারিত সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যের অতিরিক্ত কোনো সিগারেটের মূল্য নির্ধারণের সুযোগ নেই। একই বিধিমালায় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে উৎপাদনস্থল থেকে সরবরাহের সময় সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যের ওপর প্রযোজ্য মূসক, সম্পূরক শুল্ক ও সারচার্জ পরিশোধের বিধান রয়েছে।
এ ছাড়া ২০২৬ সালের ৭ জুন জারি করা এসআরও-১২৯ অনুযায়ী, সিগারেটের স্থানীয় সরবরাহ পর্যায়ে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যের ওপর উৎপাদনস্থল থেকে সরবরাহের সময় মূসক ও সম্পূরক শুল্ক পরিশোধ করতে হবে। নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে কোনো পর্যায়েই সিগারেট বিক্রির সুযোগ নেই।
এলটিইউর যাচাই অনুযায়ী, ঢাকার এফজি ওয়্যারহাউজে ২৩ লাখ ৯৬ হাজার ৭৫০ প্যাকেট সিগারেট বাড়তি দামে বিক্রি করা হয়েছে। এতে মূসক, সম্পূরক শুল্ক ও সারচার্জ বাবদ রাজস্ব ফাঁকির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৩ লাখ ১ হাজার ৩২৯ টাকা।
কুষ্টিয়া ওয়্যারহাউজে ৯ লাখ ৩৭ হাজার ২১০ প্যাকেট সিগারেটের বিপরীতে রাজস্ব ফাঁকির পরিমাণ ১০ লাখ ৬ হাজার ১৭৫ টাকা। খুলনায় ৫ লাখ ৮১ হাজার ৫৬০ প্যাকেট সিগারেটে ১১ লাখ ৫৫ হাজার ৩২৬ টাকা এবং বগুড়ায় ১৬ লাখ ১৬ হাজার ১০৩ প্যাকেট সিগারেটে ২৫ লাখ ২১ হাজার ৮০৫ টাকা রাজস্ব ফাঁকির হিসাব পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া রংপুরে ৭ লাখ ৩৪ হাজার ৭২৫ প্যাকেট সিগারেটে ১৪ লাখ ৫১ হাজার ৩৫৪ টাকা, সিলেটে ৭ লাখ ১০ হাজার ৬৯০ প্যাকেটে ১৪ লাখ ৪৭ হাজার ৩৫৪ টাকা এবং চট্টগ্রামে ৯ লাখ ৯৩ হাজার ১০০ প্যাকেট সিগারেটে ১ কোটি ১৪ লাখ ৮১ হাজার ২৩২ টাকা রাজস্ব ফাঁকির হিসাব করা হয়েছে।
কুমিল্লা ওয়্যারহাউজে ৯ লাখ ৩৫ হাজার ৩০০ প্যাকেট সিগারেটে ১৮ লাখ ৮ হাজার ৬১৯ টাকা, মীর আশুলিয়ায় ৪৩ লাখ ৬৩ হাজার ৮৫০ প্যাকেটে ১ কোটি ৫৩ লাখ ৫৯ হাজার ৭৬৩ টাকা, তেজগাঁওয়ে ২৬ লাখ ৯২ হাজার ৩৮৯ প্যাকেটে ২ কোটি ৬৭২ টাকা এবং জয়দেবপুরে ৮ লাখ ১২ হাজার ২০ প্যাকেটে ৭১ লাখ ৬ হাজার ৬৭৫ টাকা রাজস্ব ফাঁকির হিসাব পাওয়া গেছে।
সব মিলিয়ে বিএটির ১ কোটি ৬৭ লাখ ৭৩ হাজার ৬৯৭ প্যাকেট সিগারেট বাড়তি দামে বিক্রির ঘটনায় ৮ কোটি ৩ লাখ ১১ হাজার ৭৮৪ টাকা মূসক, সম্পূরক শুল্ক ও সারচার্জ ফাঁকির হিসাব করেছে এলটিইউ।
এলটিইউ সূত্র জানায়, ফাঁকি দেওয়া রাজস্ব আদায়ে বিএটিকে সম্প্রতি দাবিনামাসংবলিত কারণ দর্শানো নোটিশ জারি করা হয়েছে।
এদিকে অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে বিএটির ব্যবস্থাপক (এক্সটার্নাল কমিউনিকেশনস) বায়েজিদ জোয়ার্দারের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে বক্তব্য জানতে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি তা দেখেছেন, কিন্তু কোনো জবাব দেননি।
