ডোমারে মানষিক ভারসাম্যহীন ময়নুলের রাত কাটে কবরস্থানে টিনের চালায়
রতন কুমার রায়,ডোমার(নীলফামারী)প্রতিনিধি:
একজন মানুষের জীবনের সবচেয়ে ভরসাস্থল হচ্ছে তার স্বজনরা। বিপদ যখন আসে তখন স্বজনরাই হয় জীবনের অনুপ্রেরনা ও শেষ আশ্রয়স্থল। কিন্তু নীলফামারীর ডোমার উপজেলার পূর্ব চিকনমাটি হুজুরপাড়া এলাকার ময়নুল ইসলামের জীবনে ঘটেছে তার বিপরীত। আপন চাচার বিশ্বাসঘাতকতা ও সম্পদের লালসার বলি হয়ে এক সময়ের সচ্ছল ময়নুল ইসলাম এখন নিঃস্ব গৃহহীন যাযাবর।
জানা যায়,কয়েক বছর আগেও ময়নুল ইসলামের জীবনটা ছিল সুন্দর স্বাভাবিক। পূর্ব চিকনমাটি হুজুর পাড়ায় তাঁর সাজানো আঙিনায় ছিল সুখের হাসি। নিজস্ব আবাদি জমি আর স্ত্রী সন্তানকে নিয়ে গড়ে উঠা সেই সংসারে ভালোবাসার কোনো কমতি ছিল না। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাসে খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে তাঁর স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে যায়। সেই শোকের দাহ কাটতে না কাটতেই মাথার ওপর থেকে সরে গেল বটবৃক্ষের মতো ছায়া দেওয়া জন্মদাত্রী মা। টানা দু’টি ঘটনার আঘাত সইবার মতো শক্তি ময়নুলের ছিল না। শোকের পাহাড় মনের ওপর ভেঙে পড়ায় ময়নুল ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলে তাঁর মানসিক ভারসাম্য। হাসিখুশি প্রাণবন্দ মানুষটি নিমিষেই সমাজের চোখে হয়ে পড়ে ‘মানসিক প্রতিবন্ধী’।
ময়নুলের এই ঘোরতর অসহায়ত্বে যেখানে স্বজনদের মনে করুণা জাগানোর কথা ছিল, সেখানে তাঁর আপন চাচা বাবুর্চি কছির উদ্দিন একে লুফে নিয়েছে লালসা চরিতার্থ করার অস্ত্র হিসেবে। অভিযোগ উঠেছে, ময়নুল যখন মানসিকভাবে অপ্রকৃতিস্থ, সেই সুযোগে জালিয়াতি ও প্রতারণার মাধ্যমে তাঁর বসতভিটাসহ সব জমিজমা নিজের নামে লিখে নেন।
উল্লেখ্য, কছির উদ্দিন ফায়ার সার্ভিসে বাবুর্চি হিসেবে কর্মরত একজন সরকারি কর্মচারী। একজন সরকারি চাকুরীজীবি হয়েও নিজের আপন ভাইয়ের ছেলের ভিটেমাটি লিখে নেন। শুধু জমিই লিখে নিয়ে ক্ষান্ত হননি। ময়নুলকে তাঁর পৈতৃক ভিটা থেকে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়ে দখল করে নিয়েছেন সবকিছু।
সবকিছু হারিয়ে ময়নুলের এখন ঠিকানা হয়েছে স্থানীয় একটি কবরস্থানে।এলাকার কিছু সুহৃদ যুবক তাঁর কষ্টের কথা চিন্তা করে সেখানে টিনের চালা ও বেড়া দিয়ে একটি অস্থায়ী মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দিয়েছে। কিন্তু অমানবিকতার সীমা ছাড়িয়ে সেই ত্যানা-বিছানা এবং বেড়া রাতের আঁধারে লুট করে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে কছির উদ্দিনের ছেলে ও উপ সরকারি কৃষি কর্মকর্তা আঃ ছালামের বিরুদ্ধে।
বর্তমানে স্থানীয় দুই যুবক সুমন ও মশিয়ারের ব্যক্তিগত উদ্যোগে পলিথিন কিনে ময়নুলের অস্থায়ী ঘরটি ঢেকে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া এলাকার অনেক সাধারণ মানুষই যে যখন পারছে, ময়নুলের দিকে মানবিকতার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে। সমাজের এই সম্মিলিত মানবিকতাই ময়নুলকে এখনও বাঁচিয়ে রেখেছে।
এলাকাবাসীর দাবী,তদন্ত সাপেক্ষে ময়নুলের পৈতৃক সমস্ত সম্পত্তি অবিলম্বে ফিরিয়ে দিতে হবে। অভিযুক্ত কছির ও তার ছেলের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
ইউপি চেয়ারম্যান মাসুম আহম্মেদ ও ইউপি সদস্য জাহিনুর ইসলাম সুজন ময়নুলের জমি জবরদখলের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। অত্র এলাকার মসজিদের ইমাম এই কাজকে ‘জঘন্য’ বলে অভিহিত করেছে।
ডোমার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শায়লা সাঈদ তন্বী বলেন, অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে দ্রুত কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে, অভিযুক্ত কছির উদ্দিন ও ছালাম এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।