শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণ করি, বাসযোগ্য শহর গড়ি
নিজস্ব প্রতিনিধি
শব্দদূষণ একটি নীরব ঘাতক| ঢাকা শহরে ক্রমবর্ধমান শব্দের মাত্রার ফলে মানুষ দিন দিন তার শ্রবণ শক্তি হারিয়ে ফেলছে। শব্দদূষণ থেকে বধিরতা ছাড়াও নানা জটিল রোগের সৃষ্টি হতে পারে । বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’র তথ্যানুযায়ী ৩০টি কঠিন রোগের কারণ ১২ রকমের পরিবেশ দূষণ, যার মধ্যে শব্দদূষণ অন্যতম। শব্দদূষণের কারণে হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, মাথা ব্যাথা, খিটখিটে মেজাজ, অমনোযোগ, ঘুমে ব্যাঘাত, স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা হ্রাসসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়| শব্দদূষণের প্রভাবে সর্বস্তরের জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তবে ছাত্র-ছাত্রী, শিশু, হাসপাতালের রোগী, ট্রাফিক পুলিশ, পথচারী এবং গাড়ির চালকরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
শব্দ দূষণের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে আমেরিকার সেন্টার ফর হিয়ারিং এ্যান্ড কমিউনিকেশন (সিএইচসি) কর্তৃক ১৯৯৬ সাল থেকে প্রতিবছর এপ্রিল মাসের চতুর্থ সপ্তাহের বুধবারে আন্তর্জাতিক শব্দ সচেতনতা দিবস পালিত হয়| ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ (ডাব্লিউবিবি) ট্রাস্ট এর উদ্যোগে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন এর ৭, ৩৩, এবং ৩৪ ওয়ার্ডের নয়টি স্কুল (ঢাকা আইডিয়াল ক্যাডেট স্কুল, ধানমন্ডি কচিকন্ঠ হাই স্কুল, লোটাস ন্যাশনাল স্কুল, লরেল ইন্টারন্যাশনাল স্কুল এন্ড কলেজ, ইম্পেরিয়াল ইন্টারন্যাশনাল স্কুল এন্ড কলেজ, শের-ই-বাংলা আইডিয়াল স্কুল, স্কুল অফ লাইফ, আলফা বাংলা হাই স্কুল, বেঙ্গলী মিডিয়াম হাই স্কুল) এবং একটি হাউজিং সোসাইটিতে মাসব্যাপী সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইনের আয়োজন করা হয়।
ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ ট্রাস্ট এর পৃষ্ঠপোষকতায় ইনস্টিটিউট অব ওয়েলবীইং বাংলাদেশ এর করা গবেষণা থেকে দেখা যায় যে, ঢাকার বিভিন্ন স্থানে শব্দ দূষণের মাত্রা অত্যন্ত বেশী, যা স্বাভাবিক শব্দ ডেসিবেলের হিসেবে ১২০ থেকে ১৩২ এর মাঝে ওঠা-নামা করে । ঢাকার এই শব্দ দূষণের অনেকগুলো কারণ আছে । যান্ত্রিক যানের হর্ন এর মাঝে অন্যতম। আমরা প্রতিনিয়ত রাস্তায় চলার সময় অপ্রয়োজনে হর্ন দিয়ে থাকি। বিশেষ করে যখন যানজটে দীর্ঘ সময় বসে থাকি তখন অনেকেই অহেতুক হর্ন দেন। এর পাশাপাশি কলকারখানার শব্দ, নির্মান কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রের শব্দ এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত মাইক বা লাউড স্পিকার শব্দ দূষণ করে থাকে। শব্দ দূষণের কারণে আমাদের নানা ধরণের শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়- মানসিক চাপ, উৎকন্ঠা, ঘুমের স্বল্পতা এবং কাজে অমনোযোগ ইত্যাদি।
শব্দ দূষণ যেমন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের জন্য ক্ষতিকর তেমনি শিশুদের জন্যও অত্যন্ত মারাত্মক প্রভাব বিস্তার করে থাকে। অতিমাত্রায় শব্দ শিশুদের শারীরিক বিকাশে বাঁধা গ্রস্থ করতে পারে। শব্দদুষণ অন্যতম কারন হচ্ছে গাড়ির হর্ণ, এছাড়া ইটভাঙ্গার মেশিন, জেনারেটর,কলকারখানার সৃষ্ট শব্দ, ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্রের শব্দ। শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০০৬ অনুযায়ী, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রশাসনিক এলাকা ইত্যাদি নীরব এলাকা। তা সত্বেও এসকল এলাকায় মানমাত্রার থেকে দ্বিগুণের বেশি শব্দ উৎপন্ন হচ্ছে। যানবাহনজনিত শব্দদূষণ হ্রাসে গাড়িচালকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির কোন বিকল্প নেই।
গত ২৪ নভেম্বর ২০২৫ পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় নতুন শব্দ দূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০২৫ প্রকাশ করেছে। এতে পুরনো বিধিমালা বাতিল করে এলাকাভিত্তিক শব্দসীমা, হর্ন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা, শিল্প ও বাণিজ্যিক স্থাপনার দায়বদ্ধতা এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থা কঠোর করা হয়েছে। শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণে আইন, সচেতনতা ও নাগরিক অংশগ্রহণের সম্মিলিত প্রয়াস জরুরি।
ক্যাম্পেইন থেকে শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা ২০২৫ এর কঠোর বাস্তবায়ন, সকল লাইসেন্সপ্রাপ্ত ড্রাইভারকে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক প্রশিক্ষণের আওতায় আনা, সকল স্কুলে শিক্ষার্থীদের ক্লাসে শব্দদূষণের ক্ষতিকারক দিক এবং শব্দ সচেতনতা সম্পর্কে দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রত্যেকটি মোড়ে মোড়ে হর্ন বাজানো নিষেধ সাইন স্থাপন করা, অযথা হর্ন বাজানোর কারণে ট্রাফিক পুলিশ দ্বারা সরাসরি উচ্চ হারে জরিমানা আদায়, হাইড্রোলিক হর্ণ ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধকরণ, মাইক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা, শব্দদূষণের স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, ব্যক্তিগত ও নিজের প্রতিষ্ঠানের গাড়ি চালকদের যথাসম্ভব হর্ন কম বাজিয়ে গাড়ি চালানোর ব্যাপারে উৎসাহিত করার আহ্বান জানানো হয়।