বাঁশ খাওয়ার উপকারিতা
বাঁশ শব্দটির সঙ্গে পরিচিত নন, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। দৈনন্দিন কথাবার্তায় ‘বাঁশ’ শব্দটি অনেক সময় ব্যঙ্গ বা নেতিবাচক অর্থে ব্যবহার করা হলেও, খাবার হিসেবে বাঁশ বেশ পরিচিত।
বাঁশের মাটির নিচ থেকে বের হওয়া নরম ও কচি অংশকে বলা হয় বাঁশ কোঁড়ল। হালকা স্বাদ, কম চর্বি ও খাদ্য আঁশের উপস্থিতির কারণে এটি পুষ্টিকর সবজি হিসেবে পরিচিত। চীনসহ পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বাঁশ কোঁড়ল রান্না করে খাওয়ার প্রচলন রয়েছে। বাংলাদেশেও পাহাড়ি অঞ্চলে বাঁশকোঁড়ল দিয়ে তৈরি হয় নানা ধরনের সুস্বাদু খাবার।
কেমব্রিজের অ্যাংলিয়া রাস্কিন ইউনিভার্সিটির জনস্বাস্থ্য বিষয়ের অধ্যাপক লি স্মিথ সম্প্রতি বাঁশের পুষ্টিগুণ নিয়ে কাজ করছেন। তার মতে, অনেক দিন ধরেই এশিয়ার বিভিন্ন অংশে বাঁশ খাওয়া হয়। সারা বিশ্বে স্বাস্থ্যকর খাবার হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার যোগ্যতা রয়েছে বাঁশের।
কিন্তু সঠিক ভাবে রান্না করা দরকার। নয়তো হিতে বিপরীত হতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, বাঁশ কোঁড়লে প্রোটিন, খাদ্য আঁশ, বিভিন্ন ভিটামিন ও খনিজ উপাদানের পাশাপাশি ফেনলিক যৌগ ও ফাইটোস্টেরলের মতো জৈব সক্রিয় উপাদানও রয়েছে। কম চর্বি ও খাদ্য আঁশের উপস্থিতির কারণে পুষ্টির দিক থেকেও এটি বেশ আকর্ষণীয় একটি খাবার।
কচি বাঁশ বা বাঁশ কোঁড়লের পুষ্টিগুণ
কচি বাঁশ বা বাঁশ কোঁড়লের পুষ্টিমান প্রজাতি, বয়স ও চাষের পরিবেশের ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হতে পারে। সাধারণভাবে এতে পানির পরিমাণ বেশি এবং চর্বির পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম। ওয়েব এমডি’র প্রতিবেদন অনুযায়ী বাঁশের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে জানা যায়, বাঁশের কোড়লে ৮৮ থেকে ৯৩ শতাংশ পানি, ১.৫ থেকে ৪ শতাংশ প্রোটিন, ০.২৫ থেকে ০.৯৫ শতাংশ চর্বি, ০.৭৮ থেকে ৫.৮৬ শতাংশ চিনি, ০.৬০ থেকে ১.৩৪ শতাংশ সেলুলোজ এবং ১.১শতাংশ খনিজ পদার্থসহ পর্যাপ্ত পরিমাণ ভিটামিনও রয়েছে।
ভারতীয় পুষ্টিবিদ লাভনীত বাত্রার মতে, স্বাস্থ্যকর খাবার হিসেবে বাঁশের কচি ডগার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এতে প্রচুর প্রোটিন, অ্যামিনো অ্যাসিড, কার্বোহাইড্রেট, প্রয়োজনীয় বিভিন্ন খনিজ ও ভিটামিন রয়েছে। পাশাপাশি এতে চর্বির পরিমাণও খুব কম। এসব পুষ্টি উপাদান শরীরের সুস্থতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।’
কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে
কচি বাঁশ বা বাঁশ কোঁড়লে থাকা খাদ্য আঁশ ও ফাইটোস্টেরলের কারণে এটি হৃদস্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে। গবেষণায় বাঁশকোঁড়লের সম্ভাব্য রক্তের চর্বি নিয়ন্ত্রণকারী বা কোলেস্টেরল কমাতে পারে।
ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে
কচি বাঁশ বা বাঁশ কোঁড়লে চর্বি কম এবং খাদ্য আঁশ থাকে। আঁশযুক্ত খাবার তুলনামূলকভাবে বেশি সময় পেট ভরা রাখতে সাহায্য করতে পারে। তাই পরিমিত পরিমাণে বাঁশ কোঁড়ল সুষম খাদ্যতালিকার অংশ হিসেবে ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে।
মার্কিন ফ্যামিলি মেডিসিন চিকিৎসক ডাঃ অ্যান্থনি পুওপোলোর মতে, বাঁশের কচি ডগা সামুদ্রিক শৈবালের মতো কম ক্যালোরিযুক্ত খাবারের সঙ্গে তুলনীয়। ওজন কমানোর চেষ্টা করছেন এমন ব্যক্তিদের খাদ্যতালিকায় এটি ভালো একটি খাবার হিসেবে জায়গা করে নিতে পারে। কারণ বাঁশের কচি ডগায় চর্বির পরিমাণ কম, পাশাপাশি বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান রয়েছে ।
হৃদস্বাস্থ্যের জন্য উপকারী খাদ্য হতে পারে
কচি বাঁশ বা বাঁশ কোঁড়লে থাকা পটাশিয়াম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। সঙ্গে এতে ফ্যাট ও এলডিএল অর্থাৎ ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের পরিমাণ কম হওয়ায় হার্টের উপর চাপ পড়ে না। নিয়মিত পরিমিত পরিমাণে বাঁশ কোড়ল সুষম খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে।
হজমে সাহায্য করবে
কচি বাঁশ বা বাঁশ কোঁড়লে খাদ্য আঁশ হজমপ্রক্রিয়ায় সহায়তা করতে পারে এবং পর্যাপ্ত পানি ও অন্যান্য আঁশযুক্ত খাবারের সঙ্গে এটি কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতে সাহায্য করে।
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখে
কচি বাঁশ বা বাঁশ কোঁড়লে অঙ্কুরে থাকে প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট, ফাইবার ও খনিজ। কচি বাঁশে খুব কম চর্বি ও চিনি থাকে, ফলে এটি ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য হতে পারে একটি আদর্শ খাবার। এছাড়া কচি বাঁশে থাকে নিউট্রাসিউটিক্যালস নামক ফাইবার, যা অন্ত্রের সমস্যা কমাতে সাহায্য করে।
অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান রয়েছে
কচি বাঁশে ফেনলিক যৌগসহ বিভিন্ন জৈব সক্রিয় উপাদান পাওয়া যায়, যেগুলোর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কার্যকারিতা নিয়ে গবেষণা হয়েছে। এসব উপাদান শরীরের অক্সিডেটিভ স্ট্রেস মোকাবিলায় ভূমিকা রাখতে সাহায্য্য করে। কচি বাঁশে আরও আছে অ্যান্টি-ক্যানসার, অ্যান্টি বায়োটিক ও অ্যান্টি-ভাইরাল বৈশিষ্ট্য রয়েছে।
প্রয়োজনীয় খনিজের উৎস
কচি বাঁশে বা বাঁশ কোঁড়লে পটাশিয়াম, ফসফরাসসহ বিভিন্ন খনিজ পাওয়া যায়। এসব খনিজ শরীরের স্বাভাবিক বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়
কচি বাঁশে বা বাঁশ কোঁড়লে থাকা ভিটামিন ও খনিজ উপাদান শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতেও সাহায্য করে। ভাইরাল ও ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ থেকে দূরে থাকতে বর্ষা ও শীতের শুরুতে কচি বাঁশ খেলে উপকার মিলবে। এছাড়া কচি বাঁশে থাকা স্বাস্থ্যকর উপাদানগুলো মস্তিষ্কের কার্যকারিতা বাড়ায় ও নিউরোডিজেনারেটিভ রোগের ঝুঁকি প্রতিরোধ করে।
ত্বকের জন্যও কি উপকারী?
ভারতীয় পুষ্টিবিদ লাভনীত বাত্রার মতে, বাঁশের কচি ডগা সিলিকা সমৃদ্ধ। জিঙ্ক ও আয়রনের পর সিলিকাকে মানবদেহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
সিলিকা হাইড্রোক্সিপ্রোলিনের টিস্যু মাত্রা বাড়াতে সাহায্য করে। হাইড্রোক্সিপ্রোলিন হলো একটি গুরুত্বপূর্ণ অ্যামিনো অ্যাসিড, যা কোলাজেন ও ইলাস্টিন তৈরির সঙ্গে যুক্ত। ফলে বাঁশকোঁড়লের এই উপাদানগুলো ত্বকের স্বাভাবিক গঠন ও স্থিতিস্থাপকতা বজায় রাখতে ভূমিকা রাখতে পারে। ত্বকের যত্নে বাঁশের এই গুণের কারণেই বিভিন্ন প্রসাধনী ও সৌন্দর্যপণ্যে বাঁশজাত উপাদানের ব্যবহার দেখা যায়।
কচি বাঁশ বা বাঁশ কোঁড়ল খাওয়া যাবে না কেন?
বাঁশকোঁড়লের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এর নিরাপদ প্রস্তুতপ্রণালি। কাঁচা বা অপর্যাপ্তভাবে প্রক্রিয়াজাত বাঁশকোঁড়লে সায়ানোজেনিক গ্লাইকোসাইড থাকতে পারে। এর মধ্যে ট্যাক্সিফাইলিন অন্যতম। শরীরে এই যৌগ ভেঙে বিষাক্ত সায়ানাইড তৈরি করতে পারে। তাই তাজা বাঁশকোঁড়ল সরাসরি কাঁচা খাওয়া নিরাপদ নয়।
রান্নার আগে যা করবেন
বাঁশকোঁড়ল খাওয়ার আগে খোসা ছাড়িয়ে ভালোভাবে পরিষ্কার করে কেটে যথাযথভাবে সিদ্ধ বা অন্য স্বীকৃত প্রক্রিয়ায় রান্না করা জরুরি। ভিজিয়ে রাখা, সেদ্ধ করা, ব্লাঞ্চিং, ফারমেন্টেশনসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় বাঁশকোঁড়লের সায়ানোজেনিক যৌগের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, যথাযথ তাপ প্রয়োগে ট্যাক্সিফাইলিন ভেঙে যায় এবং বিষাক্ত উপাদানের মাত্রা কমে।
অপর্যাপ্তভাবে প্রস্তুত কচি বাঁশ বা বাঁশ কোঁড়ল খেলে সায়ানাইড বিষক্রিয়ার কারণে মাথা ঘোরা, মাথাব্যথা, বমি, পেটব্যথা, দুর্বলতা, দ্রুত শ্বাস নেওয়া বা রক্তচাপ কমে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে খিঁচুনি ও প্রাণঘাতী জটিলতাও হতে পারে। তাই কচি বাঁশ বা বাঁশ কোঁড়ল যতই পুষ্টিকর হোক, সঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাত না করে খাওয়া উচিত নয়।
বাঁশ কোঁড়ল বা কচি বাঁশ হতে পারে খাদ্য আঁশ, কিছু খনিজ, প্রোটিন ও বিভিন্ন জৈব সক্রিয় উপাদানের একটি ভালো উৎস। তবে এর উপকার পেতে হলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-কাঁচা না খেয়ে নিরাপদ ও সঠিক পদ্ধতিতে প্রস্তুত করে পরিমিত পরিমাণে খাওয়া।
